×

প্রথম পাতা

স্বপ্নসাগর পাড়ির অভিযান মরণযাত্রায় শেষ পরিণতি

Icon

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বপ্নসাগর পাড়ির অভিযান মরণযাত্রায় শেষ পরিণতি
কাগজ প্রতিবেদক : অভাবের সংসারে পরিবারের মুখে একটু হাসি ফোটাতে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে দালাল ও প্রতারকচক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন অনেকেই। সাগরে ডুবে হচ্ছে সলিল সমাধি। তবুও কমছে না স্বপ্নসাগর পাড়ির নামে এই মৃত্যুযাত্রা। ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাতে গিয়ে প্রতারিত মানুষের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। পাচারের পর তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করে সেই ভিডিও দেশে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে দাবি করা হচ্ছে টাকা। দাবিকৃত টাকা না পাওয়া পর্যন্ত নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) এ নিয়ে নিয়মিত অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। অনেক ঘটনায় মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। আবার পাচারচক্রের হোতারা বিদেশে অবস্থান করায় তারা থেকে যাচ্ছে অধরা। মানবপাচারচক্রের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত শ্রমবাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। ইতালি ও লিবিয়ায় উচ্চ বেতনের লোভের ফাঁদে পা দিয়ে বৈধ চ্যানেলের বাইরে বিদেশযাত্রার কারণে অনেক দেশে সংকুচিত হয়ে আসছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ দপ্তরের (ইউনিডক) মানবপাচারবিষয়ক এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকরা বিশ্বের অন্তত ৪০টি দেশে মানবপাচারের শিকার হয়। এ প্রসঙ্গে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দা রোজানা রশীদ বলেন, মানবপাচার ও শ্রমবাজার হচ্ছে দুই জিনিস। একটার সঙ্গে আরেকটার সম্পর্ক নেই। শ্রমবাজার হচ্ছে একটি বৈধ চ্যানেল। আর পাচারের সংজ্ঞা বা ধরন অনেক। অনেকে স্বেচ্ছায় গিয়ে প্রতারিত হয়। অনেকে ফাঁদে পা দিয়ে প্রতারিত হয়। আবার অনেক লোক যাওয়ার পর তাদের বিদেশে আটকে নির্যাতন করে মুক্তিপণ দাবি ও আদায় করা হয়। তাই পাচার ও শ্রমবাজার দুটি বিষয় একসঙ্গে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, মানবপাচারে কোনো ভালো রিক্রুটিং এজেন্সি জড়িত হয় না। মানুষ স্বেচ্ছায় জেনে-বুঝে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ পথে পা বাড়ায়। অনেকের আত্মীয় বা পরিচিতজন এভাবে গিয়ে কাজ করে খাচ্ছেন এমন খবর শুনে হুজুগে পা বাড়ায় অনেকে। তিনি বলেন, লিবিয়া ও ইতালিতে যারা চুক্তিতে যাচ্ছেন তারা দালালের মাধ্যমে যাচ্ছেন। এভাবে গিয়ে টিকে থাকার ঘটনা কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ সচেতন না হলে এ বিপজ্জনক যাত্রা থামবে না। তবে নিয়মিত শ্রমবাজারে এর প্রভাব পড়বে না বলেও মনে করেন তিনি। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার সদ্য সাবেক পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানিয়েছেন, মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে র‌্যাব সব সময় অভিযান চালিয়ে আসছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। এ ধরনের অপরাধ করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) গণমাধ্যম শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) আজাদ রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, সিআইডিপ্রধানের সার্বিক নির্দেশনায় পাচারের মামলাগুলো আমরা সবসময়ই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে থাকি। বিদেশে নেয়ার নামে লিবিয়ায় নিয়ে মুক্তিপণ আদায় চক্রের অনেক সদস্যকেই আমরা অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছি। তবে প্রায়ই দেখা যায়, জীবনের ঝুঁকিসহ নানা সমস্যা আছে জেনেও মানুষ সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশমুখী হচ্ছেন। এক্ষেত্রে মানুষের সচেতন হওয়া প্রয়োজন রয়েছে। জানা গেছে, কয়েক বছর আগে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা মানবপাচারসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠালে সেখানে মানবপাচারকারীদের তালিকা ও তথ্য উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সারাদেশে মানবপাচার চক্রে জড়িত ৪৭০ জন। শুধু ঢাকা বিভাগের নয়টি জেলায়ই রয়েছে তালিকাভুক্ত ৯৪ জন মানবপাচারকারী। এ সিন্ডিকেটে জনপ্রতিনিধি ছাড়াও রয়েছেন একাধিক নারী। কিছু প্রতিষ্ঠানও এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত। পাচারে জড়িত বাহকরা ধরা পড়লেও নেপথ্য নায়করা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের প্রায় সবাই দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের আইনের আওতায় আনতে পারছে না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত ৭ জানুয়ারি অভিযান চালিয়ে ‘আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও জিম্মিকারী চক্রের’ ১৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র?্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র?্যাব)-৩। ওই ১৫ জনের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক পাসপোর্ট, ভিসার ফটোকপি ও অর্থ জব্দ করা হয়। মানবপাচার রোধে র‌্যাবের ১৫৩টি অভিযানে পাচারকারী চক্রের ৪৪৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় ৭০২ ভুক্তভোগীকে। ৭ জানুয়ারি চক্রের মূলহোতা মো. সেলিমুজ্জামান (৪১), তার সঙ্গী শহীদুল ইসলাম (৪৭) ও মাসুম আহমেদকে (৩৬) আটক করা হয়। এর পর তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বাকি ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ১১ জন হলেন- আনোয়ারুল আজিম (৩৮), আল আমিন (৪০), আমির হোসেন (৫৭), কাওছার উদ্দিন (৩৯), রাশেদ খান (৩৯), রায়হান খান (৩০), সাইফুল ইসলাম ওরফে আলম (৩০), জাহিদ হোসেন ওরফে মইনুল (৩৪), এ এস এম মাহমুদুল হাসান ওরফে সুজন (৩৮), জসিম উদ্দিন (৩২) ও রাসেল খান (৩২)। এরপর ১৭ জানুয়ারি অপর এক অভিযানে রাজধানীর শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে লিবিয়ায় পাচারের সময় ১০ জনকে উদ্ধার করে র?্যাব। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী সাহিদা বেগম (৩২) নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে সেলিমুজ্জামান প্রথমে একটি স্কুলের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। অনেকের কাছে তিনি ‘সেলিম মাস্টার’ নামে পরিচিত। এদিকে লিবিয়ায় হাত-পা বেঁধে ও মুখে কাপড় গুঁজে বাংলাদেশি কয়েকজন যুবককে নির্যাতন করে সেই ভিডিও পাঠিয়ে ১০ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় মামলা হয়েছে। গত ১ এপ্রিল লিবিয়ায় নির্যাতনের শিকার শামীম হোসেনের বাবা আফজাল হোসেন বাদী হয়ে মানবপাচার আইনে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর থানায় মামলা করেন। নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশি দুই যুবকের স্বজনদের অভিযোগ, এই চক্রের মূলহোতা মিজানুর রহমান। তার সঙ্গে লিবিয়ায় থাকা আরো চার-পাঁচজন বাংলাদেশি এ কাজে যুক্ত। দেশে থেকে মিজানুর রহমানকে তার স্ত্রী ও ছোট ভাই এ কাজে সহায়তা করেন। মামলায় জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার তেমারিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান, তার স্ত্রী রোজিনা ও ছোট ভাই শাহিনুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ এ মামলার আসামিদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। মামলার এজাহারে লিবিয়ায় থাকা মিজানুরের বিরুদ্ধে শামীমকে আটকে রেখে নির্যাতন করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ করা হয়। শামীমের বাবা আফজাল হোসেন বলেন, ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। ছেলে কেমন আছে, জানি না। আমরা সবাই ছেলের চিন্তায় ভেঙে পড়েছি। এসব ঘটনার পেছনে আছে মিজানুর রহমান। লিবিয়ায় ১০-১২ জনকে নির্যাতন করা হয়েছে। তাদের সবাইকে মিজানুর ভালো বেতন ও কর্মঘণ্টার কথা বলে নিয়ে গিয়েছিল। অপরদিকে লিবিয়া হয়ে ইতালি নেয়ার কথা বলে নির্যাতনের ঘটনায় মানবপাচার মামলায় ফরিদপুরের সালথা উপজেলার শাকিল হোসাইন (২৮) নামে এক ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ২৯ মার্চ সকাল ১০টার দিকে উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের নকুলহাটি বাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার শাকিল হোসাইন সালথা উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের বিভাগদী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি সালথা উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি। মানবপাচার দলের প্রধান অভিযুক্ত মুকুল ঠাকুরের জামাতা তিনি। সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মাদ ফায়েজুর রহমান জানান, মুক্তিপণের দাবিতে লিবিয়ায় শাকিল মিয়াকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে। এ ঘটনায় শাকিল মিয়ার বাবা টিটুল মিয়া বাদী হয়ে মানবপাচার দমন আইনে সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। শাকিল হোসাইন এই মামলার প্রধান আসামি মুকুল ঠাকুরের জামাতা। জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল অনেক তথ্য দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, সাধারণত জোর করে আটকে রেখে শ্রম, যৌনদাসত্ব বা ব্যবসায়িক যৌনশোষণমূলক কাজে নিয়োজিত রাখতে সংঘটিত অবৈধ বাণিজ্যকে ‘মানবপাচার’ বলা হয়। মানবপাচারকে অনেকে ‘আধুনিক দাসত্ব’ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। এটি একটি ট্রান্স-ন্যাশনাল ক্রাইম।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App