×

প্রথম পাতা

তিউনিসিয়ায় নিহতদের স্বজনের শোকের মাতম

Icon

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 তিউনিসিয়ায় নিহতদের স্বজনের শোকের মাতম
কাগজ ডেস্ক : ‘আমার বাবার স্বপ্ন ছিল বড় ঘর দিবে, ছোট বোনকে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়ে পরে নিজে বিয়ে করবে। আমাগো সবাইরে ভালো রাখবে। আমার বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ হইল না। আমার বাবারে ওরা মাইরে ফেলছে’। তিউনিসিয়ায় ভূমধ্যসাগরে দালালদের নির্যাতনে নিহত রাসেল শেখের মা শিল্পী বেগম এ কথা বলে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। রাসেলের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার দিগনগর ইউনিয়নের ফতেপট্টি গ্রামে। ভূমধ্যসাগরে নৌকায় দালালদের নির্যাতনে নিহত ৮ বাংলাদেশির ৫ জনের বাড়ি মাদারীপুরের রাজৈরে, বাকি ৩ জনের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে। নিহতরা হলেন- সজীব কাজী (১৯), মামুন শেখ (২২), সজল বৈরাগী (২২), নয়ন বিশ্বাস (২৪), কাওসার (২২), রিফাদ (২১), মো. রাসেল শেখ (২০) এবং ইসরুল কায়েস আপন (২২)। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের সুন্দরদী গ্রামের মোশারফ কাজী। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন পার্শ্ববর্তী গজারিয়া গ্রামের রহিম শেখ। তারা আশপাশের গ্রামে তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাঠানোর নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। গতকাল নিজ বাড়িতে লাশ পৌঁছার পর এক শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। রাজৈর উপজেলার পশ্চিম স্বরমঙ্গল গ্রামের নিহত মামুন শেখের (২২) মা আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমার বাজানে আমাগো ভালো রাখতে চাইছিল। আমাগো জন্য নতুন ঘর বানাইয়া দিব। লাখ লাখ টাকা আয় করব। আমার বাজানের বুক ভরা কত স্বপ্ন ছিল। সব কিছু শেষ হইয়া গেল। বাজানের স্বপ্ন লাশ হইয়া ফিরা আইলো। হায়রে কপাল আমার!’ রাজৈর উপজেলার সেনদিয়া গ্রামের সজল বৈরাগীর (২২) মা সুক্ক বৈরাগী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলছিলেন, ‘আমার পোলাডা কেন যে বিদ্যাশে গেল। দ্যাশেই ক্ষেতখামারে কাম কইরা আমরা ভালো ছিলাম। এখন আমার পোলাডাও গেল, লক্ষ লক্ষ ট্যাকাও জলে গেল।’ নিহত সজীব কাজীর (১৯) বাবা মিজানুর রহমান কাজী বলেন, ‘ছেলে মারা গেছে ফেব্রুয়ারি মাসে, এখন মে মাস। লাশ দেশে এলো দেরি করে তারপরও ভোগান্তি। কখন আমার ছেলের মুখটা দেখতে পাব, সবাই লাশের জন্য অপেক্ষা করছি।’ স্বজন, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জানুয়ারি মাদারীপুরের রাজৈর ও গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বেশ কয়েকজন যুবক ইতালির উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন। প্রথমে তারা দুবাই হয়ে আকাশপথে লিবিয়া পৌঁছান। পরে ১৪ ফেব্রুয়ারি লিবিয়া থেকে দালালদের মাধ্যমে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইতালির উদ্দেশে রওনা হন। মাঝপথে তিউনিসিয়ায় ভূমধ্যসাগরে নৌকায় তাদের নির্যাতন করা হয়। এতে সজীব কাজী, মামুন শেখ, সজল বৈরাগী, নয়ন বিশ্বাস, কাওসার, রিফাদ, রাসেল এবং আপনের মৃত্যু হয়। এছাড়া এক পাকিস্তানি নাগরিকও মারা যান। খবর পেয়ে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করে স্থানীয় কোস্ট গার্ড। নিহতদের স্বজনেরা গতকাল ঢাকার বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, ৩০ জন যেতে পারবে এমন একটি ছোট্ট নৌকায় ৫২ জনকে নিয়েছিল দালালরা। যে ৮ জন মারা গেছেন, তাদের নৌকার পাটাতনের নিচে জোর করে রাখা হয়েছিল। তারা অক্সিজেন সংকটের কারণে পাটাতন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু দালালেরা তাদের মারধর করে আবার সেখানে পাঠান। এভাবে নির্যাতন ও অক্সিজেন সংকটের কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের গজারিয়া গ্রামে রহিম শেখ ও সুন্দরদী গ্রামের মোশারফ কাজী প্রলোভন দেখিয়ে প্রত্যেকের থেকে ১০-১৫ লাখ টাকা নেন। ঘটনার পর থেকেই দালাল চক্রের সদস্যরা আত্মগোপনে রয়েছেন। রাজৈর থানার ওসি মো. আসাদুজ্জামান হাওলাদার বলেন, তিউনিসিয়ায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আইনগত সহযোগিতা চাইলে করা হবে। এরই মধ্যে সরকারিভাবে লাশগুলো দেশে এসেছে। পরিবারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App