×

প্রথম পাতা

মানবতার দোহাই দিয়ে মিল্টনের অজস্র কুকর্ম!

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মানবতার দোহাই দিয়ে মিল্টনের অজস্র কুকর্ম!
  • জাল মৃত্যু সনদ, প্রত্যঙ্গ বিক্রি, মানবপাচারের অভিযোগ

‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ খ্যাতি পাওয়া মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে অভিযোগের যেন শেষ নেই। জাল মৃত্যু সনদ দেয়া, মানবপাচার, আশ্রমের টর্চার সেলে নির্যাতন, জমি দখল, কিডনিসহ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চুরির মতো গা শিউরে ওঠা গুরুতর সব অভিযোগের নতুন নতুন ঘটনা সামনে আসছে। এছাড়া তার আশ্রমে আশ্রয়ে থাকা নারী, পুরুষ ও শিশুদের অসহায়ত্ব তুলে ধরে ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে প্রতি মাসে কোটি টাকারও বেশি সংগ্রহ করতেন। যার ব্যয়ের হিসাবও স্পষ্ট নয়। ফলে অসহায়-দুস্থ মানুষের সেবার কথা বলে গড়ে তোলা ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’ নামের একটি বৃদ্ধাশ্রম ঘিরে তার অপকর্মের ফিরিস্তি এখন আলোচনার শীর্ষে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মিরপুর বিভাগ গত বুধবার তাকে গ্রেপ্তারের পর থেকে তার আরো ভয়ংকর অপরাধের তথ্য সামনে আসছে। ইতোমধ্যে একদিনেই তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ও পুলিশ। 

গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুর মডেল থানায় এসব মামলা দায়ের করা হয়েছে। ডিবি পুলিশও বলছে, মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে অজস্র অভিযোগ। তাকে রিমান্ডে নিয়ে এসব অপকর্ম বের করা হবে। এসব অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে আদালতের মাধ্যমে তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি। অভিযুক্ত মিল্টন সমাদ্দারের ফেসবুক পেজ ঘেঁটে দেখা যায়, আশ্রমে সব সময় আড়াইশ থেকে তিনশ রোগী থাকেন বলে ফেসবুকে প্রচার করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাস্তায় যারা মারা যান, তাদের দাফন করেন মিল্টন। আবার তার আশ্রমে অবস্থানকালেও অনেকে মারা যান। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মরদেহ দাফন করেছেন বলে মিল্টন দাবি করেন। যাদের দাফন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৬০০ জন তার আশ্রমে মারা গেছেন। আর বাকি ৩০০ মরদেহ রাস্তা থেকে এনে তিনি দাফন করেছেন। এসব মরদেহ রাজধানীর মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান ও আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে বলে দাবি তার। 

তবে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মিল্টন সমাদ্দারের প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে সেখানে সব মিলিয়ে ৫০টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। আরো অভিযোগ রয়েছে, এসব মরদেহের ডেথ সার্টিফিকেটও জাল। এছাড়া ঢাকার দক্ষিণ পাইকপাড়ায় মিল্টন সমাদ্দারের বৃদ্ধাশ্রমের কাছেই বায়তুল সালাম জামে মসজিদ। বৃদ্ধাশ্রমে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের একসময় এ মসজিদেই বিনামূল্যে গোসল করানো হতো। তার মানবিক কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে মসজিদ কর্তৃপক্ষ তাকে এ সুবিধা দিয়েছিল। তবে গোসল করানোর সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রায় প্রতিটি মরদেহের বিভিন্ন স্থানে কাটাছেঁড়ার দাগ শনাক্ত করেন। এ বিষয়ে মিল্টন সমাদ্দারকে প্রশ্ন করে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এরপর তিনি ওই মসজিদে মরদেহ পাঠানো বন্ধ করে দেন। 

মিল্টনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে আশ্রমে যেসব ভবঘুরে, পরিত্যক্ত, অসহায় মানুষ থাকতেন, তাদের বিষয়ে জিম্মাদার বা অভিভাবকদের পরবর্তী সময়ে আর কোনো তথ্য দিতেন না। এমনকি জিম্মাদার খোঁজ নিতে গেলে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়। মিল্টনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে ডেথ সার্টিফিকেট জালিয়াতিরও। যে চিকিৎসকের সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়, এ বিষয়ে ওই চিকিৎসক কিছুই জানেন না। মিল্টনের বাড়ি বরিশালের উজিরপুরে। সেখানেও জালিয়াতি করে চার্চের ওপর প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আশ্রমের আরেকটি শাখা খোলা হয়েছে সাভারে। সেখানেও রয়েছে জমি দখলের অভিযোগ। 

মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুন্সী ছাব্বির আহমেদ জানান, চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার আশ্রমের চেয়ারম্যান মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত তিনটি মামলা রুজু হয়েছে। জাল মৃত্যু সনদ তৈরি করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি রুজু হয়। এরপর তার আশ্রমের টর্চার সেলে মানুষকে মারধর করার অভিযোগে আরো একটি মামলা রুজু হয়। সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে আরো একটি মামলা রুজু হয়। তৃতীয় মামলার বাদী হলেন রাজধানীর জিগাতলার বাসিন্দা এম রাকিব (৩৫)।

জাল মৃত্যু সনদ দেয়ার অভিযোগ এনে ডিবি মিরপুর বিভাগের মিরপুর জোনাল টিমের উপপরিদর্শক (এসআই) কামাল পাশা বাদী হয়ে মিল্টনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন। এজাহারে তিনি অভিযোগ করে বলেন, চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার আশ্রমের বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। এসব সংবাদের তথ্য যাচাই-বাছাই করতে ডিবি মিরপুর বিভাগের একটি দল বুধবার সন্ধ্যায় চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার আশ্রমে যায়। এ সময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর সময় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মিল্টন সমাদ্দারকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

পুলিশকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিল্টন সমাদ্দার জানান, তিনি কোনো নিবন্ধিত ডাক্তার নন এবং তার প্রতিষ্ঠানেও নিবন্ধিত কোনো চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হয়নি। তিনি চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার নামে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নিজে ডাক্তার সেজে সেখানে থাকা রোগীদের চিকিৎসা দিতেন। এছাড়া এজাহারনামীয় পলাতক আসামি কিশোর বালার (২৬) সঙ্গে পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণামূলকভাবে বিভিন্ন চিকিৎসা এবং সেবা দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করতেন। এসব কনটেন্ট ফেসবুক, হোয়াটসআপ ও ইমোর মাধ্যমে মিল্টন সমাদ্দারের ১ কোটি ২০ লাখ ফ্রেন্ড ফলোয়ারদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে প্রতারণামূলকভাবে অর্থ উপার্জন করতেন। 

এজাহারে আরো বলা হয়, চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার আশ্রমের অভিযানে সেখানে বিভিন্ন কাগজপত্রসহ ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। এছাড়া সেখানে দুটি স্ট্যাম্প সিল পাওয়া যায়। যার মধ্যে একটিতে ইংরেজিতে লিখা ছিল এমডি মুহিদ খান ও অন্যটিতে বাংলায় লিখা মিল্টন সমাদ্দার। ডেথ সার্টিফিকেটগুলোতে নিজে ডাক্তার সেজে স্বাক্ষর করতেন মিল্টন সমাদ্দার। ভুয়া ডাক্তারের স্বাক্ষর ও সিল এবং নিজে ডাক্তার সেজে স্বাক্ষর ও সিল দিয়ে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজনের কাছে মৃত্যু সনদ দিতেন মিল্টন। দীর্ঘদিন ধরে মানবতার সেবা ও চিকিৎসার নামে বিভিন্ন বয়স্ক ও শিশুকে নিয়ে শারীরিক, মানসিক নির্যাতন করে কখনো কখনো তাদের সুচিকিৎসার নাম করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে মিল্টনের বিরুদ্ধে। এছাড়া মিল্টন একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার না হয়েও সেবার নামে অজ্ঞাত, ওয়ারিশবিহীন ব্যক্তিদের চিকিৎসা না দিয়ে খাবারের যথাযথমান বজায় না রেখে তাদের মৃত্যু ঘটিয়েছেন। তিন দীর্ঘদিন ধরে জালজালিয়াতির মাধ্যমে ৫০টি ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এমন গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার মিল্টনকে রিমান্ডে নিয়ে সব অপকর্ম বের করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবি প্রধান বলেন, মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। কেউ মারা গেলে মরদেহ দাফনের পর চিকিৎসা ও সিটি করপোরেশনের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে মৃত সনদ দিতেন মিল্টন। সেই সিলগুলো উদ্ধার করা হয়েছে। মিল্টনকে রিমান্ডে নিয়ে তার স্ত্রীকেও ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আর যদি কেউ তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে তাহলে তার স্ত্রীকেও গ্রেপ্তার করা হবে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেগুলো সে অস্বীকার করতে পারেননি। 

এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় মিরপুর থেকে মিল্টনকে গ্রেপ্তারের পর ডিবি প্রধান জানান, মিল্টনের বাবাকে পেটানোর কারণে এলাকাবাসী তাকে গ্রামের বাড়ি ছাড়া করে। এরপর ঢাকায় চলে আসেন। শাহবাগের ফার্মেসিতে কাজ করতেন। সেখানে ওষুধ চুরি করে বিক্রির কারণে তাকে বের করে দেয়া হয়। এরপর একজন নার্সকে বিয়ে করে। বিয়ের পর ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’ স্থাপনের জন্য স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন। সেখানে কেউ মারা গেলে, তাদের বেশির ভাগ লাশ মিল্টন রাতে দাফন করতেন। তাকে এসব জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে মিল্টন জানান, রাতে লাশ দাফন না করলে মানুষ তাকে প্রশ্ন করে। 

হারুন অর রশীদ বলেন, ৩০-৩৫ লাখ টাকা মিল্টন মাসে খরচ করেন; কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে বৃদ্ধদের সেবা দেন না বলে অভিযোগ ওঠেছে। এমনকি মৃত্যু সনদ তিনি নিজ হাতে জাল করে লিখেন বলে মিডিয়াতে স্বীকার করেছেন। ৯০০ লাশ দাফনের গরমিলের হিসাব দেখাতে পারেননি মিল্টন। অপারেশন থিয়েটার থেকে রোগীদের কিডনি বিক্রির অভিযোগও ওঠেছে। মৃত ব্যক্তিদের জাল সনদ দেয়ার অভিযোগে করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার মিল্টনকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন ডিবি পুলিশের এসআই কামাল হোসেন। শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেন তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। 

পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ধৃত আসামি দীর্ঘদিন ধরে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ৫০টি মৃত সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তিনি চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার সেন্টার নামে চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান খুলে মানবতার ফেরিওয়ালা পরিচয় দিয়ে অজ্ঞাত, ওয়ারিশবিহীন ব্যক্তি, শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের নিয়ে চিকিৎসা ও সেবা না দিয়ে তাদের মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিয়েছেন। মৃত্য সংক্রান্ত সঠিক তথ্য উদঘাটনের জন্য ও এতে ধৃত আসামির অন্য কোনো উদ্দেশ আছে কিনা তা তদন্তে পুলিশ রিমান্ড আবেদন করে। ধৃত আসামি নিজেকে ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দিতেন। আদৌ তার ডাক্তারি সনদ আছে কিনা তা যাচাইয়ের লক্ষ্যে, সহযোগী অন্য আসামিদের শনাক্তসহ নাম, ঠিকানা সংগ্রহ এবং গ্রেপ্তার, চিকিৎসাসেবার নাম করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে কোনো ভিকটিমকে হত্যা, অজ্ঞাত শিশুদের আইনানুগ অভিভাবকদের অজ্ঞাতে পাচার করেছেন কিনা, তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করেছেন কিনা সেই তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশ রিমান্ড আবেদন করে। কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিল্টন সমাদ্দারের এমন ভয়ংকর অপরাধের তথ্য তুলে ধরা হয়। তবে বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন মিল্টন। এরপর বিষয়টি ডিএমপি ও সমাজসেবা অধিদপ্তরকে তদন্তের নির্দেশ দেন মানবাধিকার কমিশন। এরপর বুধবার তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App