×

প্রথম পাতা

পরিবহন ধর্মঘট

চট্টগ্রামবাসীর দুর্ভোগের ১২ ঘণ্টা

Icon

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম অফিস : বাসের ধাক্কায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) দুই শিক্ষার্থী নিহতের জেরে গাড়ি পোড়ানোর প্রতিবাদে বৃহত্তর গণপরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ডাকা ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। দিনভর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ শেষে ১২ ঘণ্টা পর বৃহত্তর চট্টগ্রামে ডাকা এই পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলো। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক শেষে গতকাল ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানায় সংগঠনটি। এ সময় সংগঠনের চার দফা দাবিও বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। গতকাল রবিবার বিকালে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সভায় এই সিদ্ধান্তের কথা জানান সংগঠনের নেতারা। কিন্তু গতকাল ভোর ৬টা থেকে চট্টগ্রাম মহানগরী ও পাঁচ জেলায় শুরু হওয়া পরিবহন ধর্মঘটের কারণে তীব্র ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ মানুষকে। নগরী থেকে জেলা-উপজেলায় গণপরিবহন এবং দূরপাল্লার গণপরিবহন প্রায় ১২ ঘণ্টা চলাচল বন্ধ ছিল। একইভাবে জেলা-উপজেলা থেকেও কোনো গণপরিবহন নগরীতে ঢুকতে পারেনি। এতে কার্যত চট্টগ্রাম অঞ্চল সড়ক পথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গাড়ির অভাবে কর্মস্থল ও গন্তব্যে যাওয়ার জন্য শত শত মানুষকে তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। অনেকে গণপরিবহন না পেয়ে ট্রাকে করে গন্তব্যে ছুটেন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ খোলার প্রথম দিনে দুর্ভোগে পড়েন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। সড়কে নিয়মিত চলা গণপরিবহনগুলো বন্ধ হওয়ার সুযোগে বাড়তি ভাড়া হাতিয়ে নেন রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চালকরা। যাত্রীরা বলছেন, গরমে মানুষের পথচলা দায়। রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। গণপরিবহন সংকটে কষ্ট বেড়েছে। সরকারের উচিত এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপে যাওয়া, সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা চিন্তা করা। এদিকে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এই ধরনের পরিবহণ ধর্মঘট বর্বরতার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতারা। গতকাল সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ক্যাব নেতারা বলেন, ‘গণপরিবহণ শ্রমিক ও মালিকরা দেশের আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বারবার দেশের জনগণকে জিম্মি করে দাবি আদায় করার কারণে তারা বেপরোয়া হয়ে লাইসেন্স, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যা করবে। আর তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চাইলেই মানুষকে জিম্মি করে ঘর্মঘট ডাকবে, এটা নিছক বর্বরতা ছাড়া কিছুই নয়। তারা যদি আইনের শাসনে বিশ্বাসী হয়, তাহলে আইনিভাবেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিকার চাইতে পারত।’ বিবৃতিতে ক্যাবের নেতারা নিরাপদ গণপরিবহনের দাবিতে চুয়েট শিক্ষার্থীদের ১০ দফা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। নেতারা আরও বলেন, ‘বৃহত্তর চট্টগ্রাম গণপরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ বিভিন্ন সময়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দাবি আদায়ের জন্য জনগণকে বারবার জিম্মি করে- যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার দলীয় নেতাকর্মী হিসেবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে তাদের বিরত থাকা উচিত।’ গতকাল বিকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে ধর্মঘট আহ্বানকারী বৃহত্তর গণপরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খল বাহিনীর সদস্যদের বৈঠক হয়। বৈঠকে ধর্মঘট ডাকা সংগঠনের পক্ষ থেকে কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়কে গাড়ি চলাচলে নিরাপত্তা প্রদান, গাড়ি পোড়ানোর বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ক্ষতিপূরণ প্রদান, অবৈধ গাড়ির বিষয়ে ব্যবস্থা, শ্রমিকের ওপর অকারণে মামলা না করা- এই চারটি দাবি তোলা হয়। বৈঠকের পর চট্টগ্রাম গণপরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী বলেন, জেলা প্রশাসকের অনুরোধে এবং জনস্বার্থে আমাদের ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘট আমরা প্রত্যাহার করে নিচ্ছি। জেলা প্রশাসক আমাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। কাপ্তাই সড়কে পুলিশ পাহারায় গাড়ি চলার কথা জানিয়ে পরিবহন শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ মুছা বলেন, ‘আপাতত আমরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছি। কিন্তু আমরা চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে আমাদের নিরাপত্তা চাই। যদি সড়কে আমাদের আর কোনো গাড়িতে হামলা চালানো হয়; তাহলে আবার ধর্মঘট ডাকা হবে।’ বৈঠক শেষে ধর্মঘটকারীদের দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে যে তিনটি প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেগুলোর বিষয়ে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সড়ক সংস্কার, হতাহত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণসহ সড়কের শৃঙ্খলার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে, মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। তদন্ত সাপেক্ষেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। গাড়ি পোড়ানোর বিষয়ে যদি মামলা হয়ে থাকে সেটিও আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা হবে। এছাড়া সড়কে কোনো চাঁদাবাজি করা যাবে না। নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের সহায়তাও থাকবে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানের সভাপতিত্বে বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম গোলাম মোর্শেদ খান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধি অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নোবেল চাকমা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও রাউজান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের প্রতিনিধি, বিআরটিসির সহকারী পরিচালক রায়হানা আক্তার উর্থি প্রমুখ। প্রসঙ্গত, গত ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে বাসের ধাক্কায় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। এতে আহত হন আরো এক শিক্ষার্থী। এ ঘটনার প্রতিবাদে টানা চারদিন সড়ক অবরোধ করেন চুয়েট শিক্ষার্থীরা। ওই সময় ৩টি বাস পুড়িয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল রবিবার সকাল ৬টা থেকে ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট পালনের ডাক দেয় বৃহত্তর গণপরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App