×

প্রথম পাতা

প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা

উষ্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারে ঢাকা-ব্যাংকক

Icon

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 উষ্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক  জোরদারে ঢাকা-ব্যাংকক
** ৫ দ্বিপক্ষীয় নথি একটি চুক্তি ও ৩ এমওইউ সই ** কাগজ প্রতিবেদক : বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও ৫২ বছরে বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের এটিই প্রথম সফর, তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বরণে সবকিছুতেই উষ্ণ আন্তরিকতার ছোঁয়া থাইল্যান্ডের। থাই প্রধানমন্ত্রী শ্রেথা থাভিসিনের অভ্যর্থনা, থাই কুহ ফাহ ভবনের সামনের উন্মুক্ত স্থানে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, বৈঠকে নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে গতিশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে গতিশীল সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় করার উদ্যোগ- সবই দুই দেশের আন্তরিকতার নির্দশন। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে নজর দিয়েছেন উভয় দেশের নেতারা। সই হয়েছে যোগাযোগ খাত, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, পর্যটন- এসব ক্ষেত্রে গভীর সম্পর্ক এবং দ্বিপক্ষীয় উন্নয়নে পাঁচটি দ্বিপক্ষীয় নথি, একটি চুক্তি, তিনটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও একটি লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই)। থাই প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বুধবার ছয় দিনের সরকারি সফরে থাইল্যান্ডে পৌঁছান শেখ হাসিনা। গতকাল শুক্রবার গভর্নমেন্ট হাউজে দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন তারা। বৈঠক শেষে দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পাঁচটি দ্বিপক্ষীয় নথি, একটি চুক্তি, তিনটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও একটি লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) সই করা হয়। শেখ হাসিনা গভর্নমেন্ট হাউসের অতিথি বইয়ে সই করেন। থাই প্রধানমন্ত্রী শ্রেথা থাভিসিন তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের শেখ হাসিনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। গভর্নমেন্ট হাউস ত্যাগের আগে সেখানে আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেন শেখ হাসিনা। উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বন্ধুত্বে গুরুত্ব : বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, খাদ্য নিরাপত্তা, পর্যটন, জনস্বাস্থ্য, জ্বালানি এবং আইসিটির ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে ঢাকা-ব্যাংকক। থাই প্রধানমন্ত্রী শ্রেথা থাভিসিন আয়োজিত আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্ন ভোজসভায় ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, খাদ্য নিরাপত্তা, পর্যটন, জনস্বাস্থ্য, জ্বালানি, আইসিটি, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ সংযোগ এবং বিমসটেকের অধীনে আমাদের সহযোগিতা জোরদার করার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশী হিসেবে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের বন্ধুত্ব ঐতিহাসিক, ভাষাগত এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত। আমাদের দুই বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের মধ্যে উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, টেকসই উন্নয়ন, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ এবং সংযোগসহ বহুমুখী সহযোগিতার ক্ষেত্র ক্রমবর্ধমান রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জানান, থাই প্রধানমন্ত্রী থাভিসিন এবং তিনি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে এবং দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে মিথস্ক্রিয়াকে আরও উৎসাহিত করার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাতে সম্মত হয়েছি। ঢাকা ও ব্যাংকক আজ যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে তা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়াতে একটি দৃঢ় কাঠামো দাঁড় করানোর সুযোগ করে দেবে। তার সফর সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ সফর প্রতিবেশী নীতির ওপর বৃহত্তর ফোকাসের অংশ, যা দুই দেশের জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিকে আরো নবায়ন করার একটি চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই সফর আমাদের দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর করে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই সফর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পূর্ণ সম্ভাবনার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় গতি আনবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, এই সরকারি সফর আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি আমাদের দুই দেশের মধ্যে ফলপ্রসূ অংশীদারিত্বের একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে। আমাদের জনগণ ও দেশের পারস্পরিক সুবিধার জন্য আমাদের সম্পর্কের নতুন গতিকে ধরে রাখতে হবে। মধ্যাহ্ন ভোজসভায় যোগ দেয়ার আগে শেখ হাসিনা গভর্নমেন্ট হাউজে একটি থাই হস্তশিল্প প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন তার ছোট বোন শেখ রেহানা এবং বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক। বাংলাদেশে চিকিৎসা খাতে থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী : থাইল্যান্ডকে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং হাইটেক পার্কে বিনিয়োগের পাশাপাশি হাসপাতাল ও চিকিৎসা খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা বাংলাদেশি চিকিৎসা কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমি থাই প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসা সুবিধায় বিনিয়োগের সম্ভাবনা অন্বেষণ করার প্রস্তাবও দিয়েছি। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই নেতা পারস্পরিক বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রাণবন্ত অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে আমরা থাইল্যান্ডকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গতিশীল অংশীদার হিসেবে দেখছি। বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয়ে তারা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বর্তমান আয়তন বাড়ানোর জন্য দীর্ঘ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং শক্তিশালী দ্বিমুখী প্রবৃদ্ধি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, আমি থাই প্রধানমন্ত্রীকে (থাভিসিন) বাংলাদেশে বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং ব্যবসা সহজ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছি। আমি থাই পক্ষকে আমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং হাইটেক পার্কগুলোতে থাইল্যান্ডের বিনিয়োগের এবং বিশেষভাবে একটি এসইজেড নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছি। দুই পক্ষ ২০২৪ সালের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রীরা এই বিষয়ে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন (এলওআই)। থাই এবং বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মধ্যে সহজ যোগাযোগের সুবিধার্থে ঢাকা এবং ব্যাংকক অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা ছাড় সংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে ইতোমধ্যে কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের জন্য একটি চুক্তি রয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, বাংলাদেশের জন্য থাইল্যান্ড জ্বালানি সহযোগিতায় নিয়োজিত একটি সম্ভাব্য অংশীদার। জ্বালানি সহযোগিতার সম্ভাবনা অন্বেষণ করতে, শক্তি সহযোগিতা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই এখানে স্বাক্ষরিত দ্বিতীয় নথি। শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তার বিষয়ে তৃতীয় সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, থাই জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সেরা পর্যটন অনুশীলন থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আমরা পর্যটন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি। তিনি বলেন, জনগণের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই পক্ষ কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা অন্বেষণ করেছে। সামুদ্রিক যোগাযোগের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, রনং বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সরাসরি শিপিং লাইন নিয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করেছে। থাইল্যান্ডের সঙ্গে ফ্ল্যাগশিপ ল্যান্ডব্রিজ প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ আগ্রহী। তিনি বলেন, আমি থাই পক্ষকে দুই দেশের মধ্যে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছি। দুই প্রধানমন্ত্রী বিমসটেক কাঠামোর অধীনে আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা করেছেন। চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শীর্ষ সম্মেলনে বর্তমান সভাপতি ও আয়োজক হিসেবে থাইল্যান্ড বাংলাদেশের কাছে সভাপতিত্ব হস্তান্তর করবে। তিনি বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- বিমসটেক মোট ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন জনসংখ্যার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধান অর্জনের জন্য বাংলাদেশ থাইল্যান্ডের সমর্থন চেয়েছে। ব্যাংককের গভর্নমেন্ট হাউজে শেখ হাসিনাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা : থাইল্যান্ড সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী শ্রেথা থাভিসিনের কার্যালয় গভর্নমেন্ট হাউজে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেয়া হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দিতে সফরসঙ্গীদের নিয়ে স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে ব্যাংককে থাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছান শেখ হাসিনা। গভর্নমেন্ট হাউজে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে থাই প্রধানমন্ত্রী এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাগত জানান। পৌঁছনোর পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে থাই প্রধানমন্ত্রী শ্রেথা থাভিসিন অভ্যর্থনা জানান। এরপর সেখানে থাই কুহ ফাহ ভবনের সামনের উন্মুক্ত স্থানে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে থাই সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেয়। এ সময় তিনি গার্ড পরিদর্শন করেন। দুই নেতা এখানে একান্ত বৈঠকও করেন। প্রধানমন্ত্রী থাভিসিনকে বাংলাদেশে সফরেরও আমন্ত্রণ জানান শেখ হাসিনা। প্রসঙ্গত. থাই প্রধানমন্ত্রী শ্রেথা থাভিসিনের আমন্ত্রণে গত বুধবার (২৪ এপ্রিল) ছয় দিনের সরকারি সফরে থাইল্যান্ডে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App