×

প্রথম পাতা

কেন্দ্রের নির্দেশের তোয়াক্কা করছে না বিএনপির তৃণমূল

Icon

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কেন্দ্রের নির্দেশের তোয়াক্কা  করছে না বিএনপির তৃণমূল
রুমানা জামান : ভোটমাঠ থেকে তৃণমূল নেতাদের ফেরাতে ভিডিও কনফারেন্সে শীর্ষ নেতৃত্বের রুদ্ধদ্বার বৈঠক, সিনিয়র নেতাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, এমনকি সাংগঠনিকভাবে সর্বোচ্চ শাস্তির হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও উপজেলা নির্বাচনে ভোটমুখী তৃণমূল নেতাকর্মীদের ঠেকাতে পারছে না বিএনপি। দলটির একটি বড় অংশ প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদের ভোটে থাকছেন। শুধু চেয়ারম্যান পদেই ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ৩৮ নেতা। এছাড়াও দ্বিতীয় ধাপে ভোটে লড়তে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন কমপক্ষে ৩৫ জন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদেও লড়ছেন বিএনপির মাঠের নেতারা। নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত অনড় থাকবেন জানিয়ে ভোটে অংশ নেয়া তৃণমূল নেতারা বলছেন- ‘নির্বাচন করা ছাড়া স্থানীয় রাজনীতিতে ঠিকে থাকা কঠিন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে; নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ভোটে যাওয়া ছাড়া এখন বিকল্প পথ নেই’। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির কেন্দ্র তার তৃণমূলকে বুঝতে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। বছরের পর বছর জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে মাঠের কর্মীদের অংশ নিতে না দেয়ার কারণে দল হিসেবে দুর্বল হয়ে পড়ছে বিএনপি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মনে করেন, বিএনপি তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। কোনো রাজনৈতিক দল যদি দীর্ঘসময় জনবিচ্ছিন্ন থাকে; তাহলে মাঠে তার কোনো অস্তিত্ব থাকে না। সেটা ফিরিয়ে আনতেও সময় লাগে। ফলে বিএনপির উচিত তৃণমূল কী চায় সেটার খোঁজ রাখা। বিএনপির কয়েকজন প্রার্থী গতকাল বুধবার ভোরের কাগজকে বলেন, জাতীয় আর স্থানীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাদের জনপ্রিয়তা তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকবেন। এতে বিএনপির অনেক নেতার সম্ভাবনা আছে জেতার। এ কারণে দল থেকে অব্যাহতি নিয়েও অনেকে শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকতে চান। এসব নেতাদের যুক্তি- দ্বাদশ নির্বাচনের আগে আন্দোলন চলাকালে তৃণমূলের বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। বহুকষ্টে তাদের জামিন নেয়া গেলেও কোর্ট থেকে এমন একজন জামিনদার চাওয়া হয় যিনি সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি। এক্ষেত্রে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বেশি গুরত্ব দেয়া হয়। অথচ, বেশ কয়েক বছর দল নির্বাচনের বাইরে থাকার কারণে দলের বা দলসমর্থিত গণ্যমান্য পর্যায়ের এমন কোনো ব্যক্তি নেই যারা তৃণমূল কর্মীদের দুঃসময়ে সাপোর্ট দিতে পারেন। মাঠের এসব নেতাদের মতে, এই মুহূর্তে সরকারের জুলুম অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া, ব্যক্তিগত ইমেজ ধরে রাখা, পারিবারিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিকতার হিসাব-নিকাশ, দীর্ঘদিনের জনবিচ্ছিন্নতা কাটানো এবং আগামীর আন্দোলন সংগ্রাম ধরে রাখতে ভোটে যাওয়া জরুরি। তবে এ নির্বাচনকে ‘ফাঁদ’ মনে করে বিএনপির হাইকামান্ড। তাদের মতে, বিএনপিকে এ নির্বাচনে গেলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে; সেখান থেকে অনেকটাই উতরে যাবে সরকার। একই সঙ্গে দলের দিকে বিভিন্ন মহলের আঙুল উঠবে- জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিয়ে মস্ত ভুল করছে বিএনপি। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, ভোটের পরিবেশ না থাকা, জনগণের মাঝে দলের নৈতিক অবস্থান ও আস্থা সুদৃঢ় রাখা এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য অটুট রাখতে উপজেলা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এরপরও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শেষ পর্যন্ত কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমনকি আজীবন বহিষ্কারও করা হতে পারে। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, দলের পদধারী ১৮ জন নেতাসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের যে ৩৮ জন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি; তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হচ্ছে। নোটিসের জবাব সন্তোষজনক না হলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের কাছে নোটিস পাঠানো শুরু হয়েছে। কারণ দর্শানোর নোটিসে বলা হয়েছে, ‘দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপজেলা নির্বাচন বর্জন করেছে বিএনপি। দল থেকে বারবার তাগাদা দেয়ার পরও আপনারা (প্রার্থী) মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। তাই আগামী তিন দিনের মধ্যে এর জবাব দেয়ার অনুরোধ করা হলো।’ জানতে চাইলে, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী ভোরের কাগজকে বলেন, বর্তমান সরকারের সাজানো নির্বাচনে বিএনপি যাবে না, এটা দলীয় সিদ্ধান্ত। তা সত্ত্বেও যারা প্রার্থী হয়েছেন বা হচ্ছেন; বুঝতে হবে তারা দলের নীতি-আদর্শে বিশ্বাসী নন। পাশাপাশি তারা ক্ষমতাসীন দলের কোনো প্রলোভনে এবং ফাঁদে পা দিয়েছেন। তিনি বলেন, দলের সিদ্ধান্ত অমান্যকারী নেতাদের কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হচ্ছে। নোটিসের জবাব দেখে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে নোটিস পাঠানোর আগেই সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিন প্রার্থীকে কেন্দ্র থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। গতকাল বুধবার বিএনপির পক্ষ থেকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার আড়িয়ল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জু শেখ ফারুখকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর আগে গত ২১ এপ্রিল পটুয়াখালী জেলার সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনির রহমান এবং কক্সবাজার জেলার ঈদগাহ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর তাজ জনিকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ভোটে যেতে তৃণমূল নেতাদের এতো আগ্রহ থাকার পরও কেন্দ্র কেন অনড় প্রশ্নে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে দেশের মানুষ বিএনপির ডাকে ৭ জানুয়ারি ভোট বর্জন করেছিল। জনগণের সেই দাবি এখনো পূরণ হয়নি। এ কারণে বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনও বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাচন বর্জনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যেও রয়েছে অসন্তুষ্টি। অনেকেই নিজ এলাকায় তৃণমূল কর্মীদের অবস্থান পোক্ত করতে ভোটে অংশ নেয়ার পক্ষে ছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির কয়েকজন নেতা প্রায় একই সুরে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর মাঠে সরকারবিরোধী তেমন কোনো আন্দোলন কর্মসূচি নেই। এখন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অলস বসে কী করবেন? আর উপজেলা নির্বাচন করলে নেতাকর্মীরা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারবেন। এসব নেতাদের ভাষ্য- জাতীয় রাজনীতি ও স্থানীয় রাজনীতির মধ্যে তফাত আছে। বাস্তবতাও ভিন্ন। মাঠের নেতারা আর কত মার খাবে! তাদের রক্ষা করতে হলেও বিএনপির উচিত ছিল কৌশলে তাদের ভোটের অনুমতি দেয়া। উপজেলা নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, এ নির্বাচনকে ঘিরে কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে দ্ব›দ্ব এবং দূরত্ব দুটিই বাড়ছে। মাঠের নেতাদের নির্বাচন থেকে ফেরানো নিয়ে বেশ অস্বস্তি রয়েছে দলের ভেতরে। প্রথম ধাপের নির্বাচনে প্রার্থীদের ফেরানো না গেলে পরের ধাপগুলোতে প্রার্থীর সংখ্যা আরো বাড়বে, আর তাতে দলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। এই নেতার ভাষ্য- ‘শঙ্কা হচ্ছে শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল নেতাদের ধরে রাখা না কঠিন হয়ে পড়ে’! অনড় অবস্থানে তৃণমূল : কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বিএনপির আহ্বায়ক রমিজ উদ্দীন (লন্ডনি) বলেন, আমি জেনে-বুঝেই চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছি। রাজনীতি করতে করতে বুড়ো হয়ে গেছি। আমার এমপি হওয়ার সুযোগ নেই। ১৮ বছর ধরে বিএনপি নির্বাচন করে না। আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে। আমরা নির্বাচনে না গেলে তৃণমূল নেতাকর্মীকে কীভাবে ধরে রাখব? চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হলে তো নেতাকর্মীরা কিছুটা সুবিধা ও স্বস্তি পাবেন। তাদের স্বার্থেই নির্বাচন করছি। আমি জয়ী হলে তাদের জন্য হবে বিরাট সান্ত¡না। ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও রাজশাহীর কয়েকজন চেয়ারম্যান প্রার্থী বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্জন করলেও এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে নানা ধরনের নাগরিক সুবিধার জন্য যেতেই হয়। জন্ম বা মৃত্যু সনদসহ স্থানীয় পর্যায়ের অনেক প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ না নেয়ার যুক্তি নেই। বিএনপি উপজেলা নির্বাচন দলীয়ভাবে বর্জন করলেও স্বতন্ত্রভাবে কেউ অংশ নিয়ে জয়ী হলে স্থানীয় নেতাকর্মীরা লাভবান হবেন। সরাইল উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সরাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন মাস্টার বলেন, আমি আগে বিএনপির কমিটিতে ছিলাম, এখন কোনো পদে নেই। জনগণ চাচ্ছে আমি যেন নির্বাচন করি। তাই আমি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত লড়াই করব। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় বিএনপির চার নেতা প্রার্থী হয়েছেন। তারা হলেন- জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ সুহেল আহমদ চৌধুরী, উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গৌছ খান, যুক্তরাজ্য বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. সেবুল মিয়া, যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতা সফিক উদ্দিন। তাদের মধ্যে গৌছ খান বলেন, আমি নির্বাচনী মাঠে এখনো আছি। আমার অবস্থানও ভালো। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল মান্নান ও ময়দান দীঘি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফেরদৌস আল আমিন। আব্দুল মান্নান বলেন, স্থানীয় নেতাকর্মীদের পরামর্শেই স্বতন্ত্রভাবে চেয়ারম্যান প্রার্থী হয়েছি। দল কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা দলের বিষয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App