×

প্রথম পাতা

তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেড

Icon

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেড
দেব দুলাল মিত্র : একদিকে প্রচণ্ড তাপদাহ, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ে মানুষ অতিষ্ঠ। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না বিদ্যুৎ বিভাগ। অর্থের অভাবে জ¦ালানি সংকট বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যেই আবার তাপদাহ বেড়ে যাওয়ায় গত এক সপ্তাহে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে ৩ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে। চলতি গরমে এই চাহিদা ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তবে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ায় কয়েকশ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে লোডশেডিং নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মানুষ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছেন, প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে। এই চাহিদা গত এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ। এবারের গরমে এই চাহিদা ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত হতে পারে। আমরা উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি। নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা করছি। উপায় না থাকায় সামান্য কিছু লোডশেডিং করতে হচ্ছে। আগামী সপ্তাহে গরম একটু কমলে লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন হবে না। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ¦ালানির প্রয়োজন রয়েছে। কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। আবার কেউ কেউ স্বল্প পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। মোটকথা আমরা অর্থের অভাবে জ¦ালানি কিনতে না পারায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছি না, তবে চেষ্টা চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এখনো টাকা ছাড় করেনি। আমাদের পাওয়ার প্ল্যান্ট ও ট্রান্সমিশন লাইন আছে। জ্বালানির বকেয়া ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই টাকা পেলেই উৎপাদন বাড়াতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৬ হাজার মেগাওয়াট। সরকারি হিসেবে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু দিনে উৎপাদন হচ্ছে ১২ হাজার ও সন্ধ্যায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। যদিও বেসরকারি হিসাবে এই ঘাটতি আরো বেশি। এ কারণে সারাদেশেই বেড়েছে লোডশেডিং। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকে পল্লী বিদ্যুৎকে পর্যাপ্ত সরবরাহ করতে না পারায় গ্রামের গ্রাহকদের লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, গরম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হতো; কিন্তু তারা নেয়নি। এভাবে গাফিলতির কারণে বিদ্যুৎ খাতে অনেক অযৌক্তিক ব্যয় বেড়েছে। এই ব্যয় কমিয়ে আনা হলে এখন এত অর্থের সংকট হতো না। ২৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা কাজে আসছে না। এই সক্ষমতার বিপরীতে সাধারণ মানুষকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট গুণতে হয়। তারপরও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়া অন্যায়। এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদনের ঘটতি এবং জনগণের ভোগান্তি কখনোই কমানো সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি না। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জ¦ালানির সংকটের পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে বেশ কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন আগের চেয়ে কমে গেছে। বিদ্যুৎ ঘাটতির এটা একটি অন্যতম কারণ। বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে ১১ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট। এখন বিদ্যুৎ পাচ্ছে ৫ হাজার ৫১৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে গ্যাস থেকে। পিডিবি সাধারণত তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এক্ষেত্রে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রাধান্য পায়। কিন্তু জ¦ালানি সংকটের কারণে এবং অর্থের অভাবে উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। এছাড়া ২৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে এখন মাত্র ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কাপ্তাই লেকের পানি কমে যাওয়ায় ২১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। চলতি মাসের শুরুতে প্রতিদিন ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে, এখন হচ্ছে ৩০ মেগাওয়াট। কাপ্তাই হ্রদে ৮০ দশমিক ৭ মিনস সি লেভেল (এমএসএল) পানি আছে। যদিও হ্রদে স্বাভাবিক নিয়মে পানির থাকার কথা ৮৮ দশমিক ৫১ এমএসএল। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের চারটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বাড়বে না। চাঁদপুরের ১৫০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে। জেনারেটর বেয়ারিংয়ে ওয়েল লিকেজ থেকে ছোট আকারের অগ্নিকান্ডের ঘটনায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল হওয়া যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন না হওয়ায় উৎপাদনে যাওয়া যাচ্ছে না। মে মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। ভোলায় সাড়ে ৩৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টটির উৎপাদন কয়েক মাস ধরেই বন্ধ রয়েছে। ভোলায় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ফর ডিস্ট্রিবিউশন (ওজোপাডিকো) কোম্পানি লিমিটেড ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় জেলায় পাঁচ লাখের বেশি গ্রাহক রয়েছে। সাতটি উপজেলায় ওজোপাডিকো বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে জনগণকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App