×

প্রথম পাতা

তীব্র তাপপ্রবাহ খুলনাসহ সাত অঞ্চলে

Icon

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজ প্রতিবেদক : ভোরের সোনালি আলোকচ্ছটা নিমিষেই মিলিয়ে যাচ্ছে। সূর্য কিরণ ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই প্রখর রোদে অত্যন্ত তপ্ত হয়ে যাচ্ছে আবহাওয়া। দীর্ঘস্থায়ী এ অসহনীয় উত্তাপ দেশবাসী আর কখনো দেখেনি। শুধু ঢাকা মহানগরী নয়, গোটা দেশের নগর-শহর এমনকি গ্রামেও একই অবস্থা। এ সময়টাতে ঘরের বাইরে বের হওয়া নিয়ে দ্ব›েদ্ব পড়ে মানুষ। অসহনীয় গরমে গ্রাম থেকে শহরে রিকশাওয়ালা-দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ শ্রমজীবীদের নাজেহাল দশা। হিটস্ট্রোকে মানুষের মৃত্যুর খবর আরো শঙ্কিত করছে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় গরমের তাপমাত্রা এরই মধ্যে রেকর্ড ছাড়িয়েছে। দুই দফায় জারি করা হয়েছে হিট অ্যালার্ট বা তাপপ্রবাহ সতর্কবার্তা। এপ্রিলের শুরু থেকে সারাদেশে বয়ে যাওয়া তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। গতকাল সর্বোচ্চ তামপাত্রা ছিল মোংলায় ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খুলনা বিভাগসহ কয়েক অঞ্চলের ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। সবুজায়ন ও জলাধারের অভাব এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে দেশে বছর বছর বাড়ছে এই অসহ্যকর উষ্ণতা। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিরূপ প্রভাব তো পড়ছেই প্রকৃতির ওপর। তার সঙ্গে রয়েছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর দেদার কার্বন নিঃসরণ। মানবসৃষ্ট এ দুর্যোগ থেকে একমাত্র মুক্তির উপায় সবুজায়ন, জলাধার সংরক্ষণ করা এবং কার্বন নিঃসরণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ বলে মনে করছেন আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা খুলনায় : আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, গতকাল বুধবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল খুলনা বিভাগে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মোংলায় ৪১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যশোর ও চুয়াডঙ্গায় তাপমাত্রা ছিল ৪১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কুমারখালীতে ৪০ দশমিক ৮, খুলনায় ৪০ দশমিক ২, সাতক্ষীরায় ৩৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস উঠেছিল তাপমাত্রা। ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি। বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ২৯ শতাংশ। আর ঢাকা বিভাগের ফরিদপুরে ৪০ দশমিক ৪, গোপালগঞ্জে ৪০, টাঙ্গাইলে তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল। রাজশাহীতে তাপমাত্রা ছিল ৪১ দশমিক ৩, ঈশ্বরদীতে ৪১ দশমিক ২, দিনাজপুরে ৪০ দশমিক ৫, সৈয়দপুরে ৪০, বরিশালে ৩৮ দশমিক ১, রংপুরে ৩৭ দশমিক ৮, ময়মনসিংহে ৩৭ দশমিক ৩, সিলেটে ৩৩ দশমিক ৩, চট্টগ্রামে ৩৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়ার পূর্বাভাস : খুলনা বিভাগসহ দিনাজপুর, নীলফামারী, রাজশাহী, পাবনা, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজার, রাঙামাটি, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও বান্দরবান জেলাসহ বরিশাল বিভাগ এবং রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের অবশিষ্টাংশের উপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে বলা হয়, সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে এবং সেসঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। বর্ধিত ৫ দিনের আবহাওয়ার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তাপমাত্রা বাড়ছে কয়েক দশক ধরে : আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরেই তাপমাত্রা বাড়ার নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। গত বছরের ১৭ এপ্রিল ঈশ্বরদীতে রেকর্ড করা হয় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২১ সালের এপ্রিলে যশোরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয় ৪১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৪ সালের ২৪ এপ্রিল যশোরেই দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওই বছর চুয়াডাঙায় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি ও ঢাকায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল। এর পরের বছরগুলোয় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে যায়নি। ঢাকার তাপমাত্রা ৩৯ দশমিক ৫-এর নিচে ছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ৪৭ বছর পর গত বছর দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ওঠে ঈশ্বরদীতে ৪৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর এ বছর এরই মধ্যে মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। ২০ এপ্রিল সেখানে তাপমাত্রা ছিল ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ দিন একসঙ্গে দেশের অনেক জায়গায় ৪০ ডিগ্রি বা তার বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। তাপমাত্রা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে দেশের ওপর দিয়ে। বাড়া-কমার মধ্য দিয়ে এ তাপপ্রবাহ মে মাসজুড়ে অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা। আবহাওয়াবিদ নাজমুল হক বলেন, অতীতে মে মাসেও বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের রেকর্ড আছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মে মাসেও তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এপ্রিল মাসেও কাক্সিক্ষত বৃষ্টিপাত হয়নি। আবার মে মাসেও যদি স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম থাকে, তাহলে তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান পরিবেশবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার ভোরের কাগজকে বলেন, একদিনে আবহাওয়ার উষ্ণতার এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। ফলে খুব দ্রুত এ অবস্থা থেকে উত্তরণেরও কোনো উপায় নেই। তাপমাত্রা থেকে রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। ব্যাপক হারে গাছ লাগাতে হবে। গাছ কাটায় জিরো টলারেন্স যেতে হবে। সবুজায়ন করার কমিটমেন্ট থাকতে হবে। এছাড়া জলাধার সংরক্ষণ ও দখল-দূষণ থেকে রক্ষা করা এবং নতুন জলাধার সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি কাঁচের ভবনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ইটের ব্যবহার ও জীবাষ্ম জ¦ালানি বন্ধ করে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির ব্যবহার বাড়াতে পারলে উষ্ণতা সহনশীল রাখা সম্ভব হবে। আবহাওয়াবিদ নাজমুল হক বলেন, জলবায়ু সহনশীল রাখতে ২৫ শতাংশ বনায়নের বিকল্প নেই। কিন্তু অপরিহার্য হলেও সেই অনুযায়ী বনায়ন নেই। আবার পরিবেশের কথা উপেক্ষা করেই বর্তমানে আমাদের রাস্তা-ঘাট তৈরি হচ্ছে। যেমন পিচের রাস্তা করলে সেখানে পর্যাপ্ত গাছপালা থাকা দরকার। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এছাড়া আমরা নগরায়ন ঠিকই করছি, কিন্তু সবুজায়ন করছি না। তিনি আরো বলেন, দেশের যানবাহনগুলোর কালো ধোঁয়াও দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার পেছনে দায়ী। গাড়ির কালো ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে মিশে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে শিল্পোন্নত দেশগুলো অধিক পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ করে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের ফলে আমাদের দেশের জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব পড়ছে। এসব কারণে আবহাওয়া পরিস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের নানামুখী প্রভাব পড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় থাকা দেশের মধ্যে একটি বাংলাদেশ। কিন্তু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার দিক থেকে বাংলাদেশের খুব বেশি কিছু করার নেই। কারণ সমস্যাটা বৈশ্বিক। তা সমাধানের জন্য উন্নত দেশগুলোর দিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে বাংলাদেশকে। যুক্তরাষ্ট্র, চীনের মতো দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ না কমালে, পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর পক্ষে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বৈশ্বিক জলবায়ুর এ পরিবর্তনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বরাবরই উন্নত দেশগুলোকেই এর জন্য দায়ী করা হলেও কোনো কিছুতেই কর্ণপাত করে না শিল্পোন্নত দেশগুলো। প্রতিনিয়তই ইউরোপ-আমেরিকা বা চীনের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে পৃথিবীকে। মানবসৃষ্ট প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের সমস্যা সমাধানের উপায় থাকলেও সমন্বিত উদ্যোগ নেয় না কেউই।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App