×

প্রথম পাতা

লু হাওয়া ঢুকে উত্তপ্ত হচ্ছে দেশ, ফের ৩ দিনের হিট অ্যালার্ট জারি

দীর্ঘস্থায়ী হবে তাপপ্রবাহ

Icon

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘস্থায়ী হবে তাপপ্রবাহ
হরলাল রায় সাগর : ভারতীয় মহাদেশীয় লু হাওয়া বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের গেটওয়ে দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দেশে তাপমাত্রায় উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। এ কারণে উত্তপ্ত হচ্ছে গোটা দেশ। দেশজুড়ে এ বছর তাপপ্রবাহও তুলনামূলক দীর্ঘস্থায়ী হবে। মে মাসজুড়ে তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকবে। আর এ সময়ে বাড়বে তাপমাত্রার হারও। তাপমাত্রা ওঠানামা করলেও উত্তাপ কমছে না। তবে তাপপ্রবাহের ব্যাপ্তিকাল দীর্ঘ হলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ৪৫টির বেশি জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে দিনের গড় তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেছে। ফলে তীব্র গরম অনুভূত হওয়ায় সারাদেশেই জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতাকাল সোমবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল খুলনা, যশোর ও চুয়াডাঙ্গায়- ৪০ দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ অবস্থার মধ্যেই গতকাল নতুন করে ৭২ ঘণ্টার হিট অ্যালার্ট বা তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর আগে শনিবার থেকে দ্বিতীয় দফায় ৭২ ঘণ্টার হিট অ্যালার্ট জারি করেছিল সংস্থাটি। গেটওয়ে দিয়ে ঢুকছে লু হাওয়া : আবহাওয়া অধিদপ্তরের গত কয়েকদিনের পূর্বাভাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিামঞ্চলের জেলাগুলো যেমন- সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, ঈশ্বরদী ও রাজশাহীতে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করছে। এর কারণ হিসেবে আবহাওয়াবিদ ড. মুহম্মদ আবুল কালাম মল্লিক ভোরের কাগজকে বলেন, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ভৌগলিক অবস্থান এবং ওই এলাকার জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যগুলো এমন- তাপমাত্রা বেশি থাকে। কারণ বঙ্গোপসাগরের কাছের ওই অঞ্চলগুলো হলো তাপপ্রবাহের গেটওয়ে। অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে যে বাতাস প্রবাহিত হয়, তা একটু উত্তপ্ত। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারতের দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের তাপমাত্রা গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের তুলনায় বেশি থাকে। ৪২ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করে। তাপমাত্রার বৈশিষ্ট্য হলো উচ্চ তাপমাত্রা থেকে নি¤œ তাপমাত্রার দিকে ধাবিত হওয়া। বাংলাদেশের তাপমাত্রা তুলনামূলক কম। সুতরাং উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে যে বাতাস আসে, এ উত্তপ্ত বাতাস বা উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে বাতাস পরিবহন করে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এটাকে বলে টেম্পারেচার এডভেকশন। এর কারণে আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের গেটওয়ে দিয়ে বাংলাদেশে লু হাওয়া বা অত্যন্ত উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হয়। স্থানীয়ভাবে দেশের অভ্যন্তরে সূর্যের ৮-১০ ঘণ্টার কিরণে তাপ ছড়াচ্ছে। এ স্থানীয় উত্তপ্ত তাপমাত্রার সঙ্গে লু হাওয়ার সংমিশ্রণে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল আরো বেশি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। গোটা দেশে এর বিরূপ প্রভাব পড়ে বলে মন্তব্য করেন আবুল কালাম মল্লিক। এ আন্তঃমহাদেশীয় বাতাসের চলাচল ও স্থানীয় পর্যায়েও তাপমাত্রা বাড়ার কারণে দেশব্যাপী এ বছর তাপপ্রবাহ তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। তিনি বলেন, বিগত বছরের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এটা প্রতীয়মান হচ্ছে যে ২০২৪ সাল উত্তপ্ত বছর হিসেবে যাবে। আমরা এ বছর তাপপ্রবাহের দিন এবং হার বেশি পেতে যাচ্ছি। এর কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তন উল্লেখ করে আবুল কালাম বলেন, বাংলাদেশের তাপমাত্রার ঊর্ধ্বগতিতে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ছোঁয়া লেগেছে। এছাড়া বনভূমির পরিমাণ কমে যাওয়া, সবুজায়ন কমে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং শিল্পায়ন ও নগরায়ন বেড়ে যাওয়ার কারণেও সার্বিকভাবে তাপমাত্রা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা। হিট অ্যালার্ট : তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা না থাকায় গতকাল সোমবার সারাদেশে আবারো তিন দিনের জন্য ‘হিট অ্যালার্ট’ বা তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সাধারণত কয়েকটি এলাকায় তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে এবং তা অব্যাহত থাকলে সতর্কবার্তা জারি করা হয়। চলতি মাসে এ নিয়ে টানা তৃতীয় দফায় ‘হিট অ্যালার্ট’ জারি করা হলো। এই সময়ে সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা বাড়তে পারে বলে জানানো হয়েছে। এ সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য থাকবে। ফলে গরমের অস্বস্তি কিছুটা বাড়তে পারে বলে পূর্বভাসে বলা হয়েছে। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহেও নতুন হিট অ্যালার্ট জারি করতে হতে পারে বলে ধারণা করছেন আবহাওয়াবিদরা। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই কিছু জেলায় তাপপ্রবাহ বইতে শুরু করে। এরপর গত দুই সপ্তাহে তাপপ্রবাহ প্রায় সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই যশোরে চলতি বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া রবিবার চুয়াডাঙ্গায় ৪২ দশমিক দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। আর ঢাকায় এ বছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রবিবার ৪০ দশমিক চার ডিগ্রি সেলসিয়াস। দীর্ঘস্থায়ী হবে তাপপ্রবাহ : আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই এপ্রিল মাসে গড়ে সাধারণত দুই-তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ এবং এক থেকে দুটি তীব্র থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। তীব্র তাপপ্রবাহ চলাকালে ১ ডিগ্রি কম বেশি হলেও তাপ কমে না। এছাড়া এ বছরের তাপপ্রবাহের ব্যাপ্তিকাল বিগত বছরগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। সামনে গড় তাপমাত্রা আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে এটি বাংলাদেশের উষ্ণতম বছরও হতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক। পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে এ বছর এপ্রিলে গড় তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। তবে ভারি বৃষ্টিপাত হলেই গরম কেটে যাবে জানিয়ে তিনি বলেন, জুন মাস নাগাদ বৃষ্টি হতে পারে। বঙ্গোপসাগর থেকে মৌসুমি বায়ু না আসায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। তিনি বলেন, অনেকদিন ধরে তাপপ্রবাহ চলতে থাকলে কোনো কোনো এলাকার বায়ুর চাপ কমে যায়। বায়ুর চাপ কমলে সাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্প বাতাসের কোথাও জড়ো হতে শুরু করে এবং তখন সেখানে বজ্রমেঘ তৈরি হয়। পরবর্তীতে সেই মেঘ বৃষ্টিপাত ঘটায়। মানবসৃষ্ট দুর্যোগ : দেশের এ তাপমাত্রা পরিস্থিতিকে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ আখ্যা দিয়েছেন বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও পরিবেশবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি আক্ষেপ করে ভোরের কাগজকে বলেন, তাপমাত্রা বাড়লেই আমরা এপ্রিল মাসে গাছ লাগানোর রোমান্টিজম দেখাচ্ছি। গাছ লাগানোর জন্য জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ততদিনে তাপমাত্রা কমে যাবে। আমরা এখন যে ইমোশন দেখাচ্ছি তা আর গবেষক, নীতিনির্ধারক, সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যম কারোরই মনে থাকবে না; বরাবরের মতো গরমের এ সময় চলে গেলেই সবাই বেমালুম ভুলে যাব। তিনি বলেন, ভুলে যাওয়া চলবে না। গাছ লাগানো বা সবুজায়নকে জনগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। গাছ লাগাতে হবে। জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে। সারাদেশে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। প্রকৃতি-পরিবেশকে কোনোভাবেই রক্ষা করতে পারছি না। পরিবেশ যারা রক্ষা করছে, তাদেরও রক্ষা করতে পারছি না। এ ব্যর্থতা-গøানি নিয়েই আমাদের নতুন করে শুরু করতে হবে। আমাদেরকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়- ‘লও এ নগর, দাও ফিরিয়ে অরণ্য’ জায়গায় যেতে হবে। তাপমাত্রা : আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল সোমবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল- খুলনা, যশোর ও চুয়াডাঙ্গায়। এ তিন জেলায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪০ দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপরই ছিল মোংলায় ৪০ দশমিক ১, কুমারখালীতে ৪০, সাতক্ষীরায় ৩৯ দশমিক ৩, ফরিদপুরে ৩৯, টাঙ্গাইলে ৩৯ দশমিক ২, গোপালগঞ্জে ৩৯ দশমিক ১, ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ৭, রাজশাহীতে ৪০, ঈশ্বরদীতে ৪০ দশমিক ৪, ময়মনসিংহে ৩৬ দশমিক ৩, সিলেটে ২৩ দশমিক ২, চট্টগ্রামে ৩৪ দশমিক ২, রংপুরে ৩৬, বরিশালে ৩৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এসব এলাকায় গত রবিবারে চেয়ে তাপমাত্রা কমেছে। পূর্বাভাস : গতকাল সন্ধ্যায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে- রাজশাহী, পাবনা, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ময়মনসিংহ, মৌলভীবাজার ও রাঙ্গামাটি জেলাসমূহ এবং রাজশাহী, খুলনা বিভাগের অবশিষ্টাংশ এবং ঢাকা, রংপুর ও বরিশাল বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা বিস্তার লাভ করতে পারে। সারাদেশের দিনের তাপমাত্রা সামন্য বাড়তে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। গতকাল সিলেটে বৃষ্টি হয়েছে। ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে বলা হয়, এছাড়া সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলা বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App