×

মেলা

চলচ্চিত্র ও থিয়েটারে ‘নজরুল সাহিত্য’

Icon

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চলচ্চিত্র ও থিয়েটারে  ‘নজরুল সাহিত্য’

কাজী নজরুল ইসলাম নিজেও ছিলেন চলচ্চিত্রকার। অথচ তার সাহিত্যকর্ম থেকে বলার মতো ছবির সংখ্যা কম। নির্বাক যুগে অবিভক্ত বাংলায় তার সাহিত্য থেকে ছবি হয়েছে বেশকিছু। স্বাধীন বাংলাদেশে এসে ভাটা পড়ে কাজের ধারায়।

নজরুলের উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’ এবং গল্প ‘ব্যথার দান’ ও ‘পদ্মগোখরা’ অবলম্বনে ছবি নির্মিত হয়েছে। নজরুলের অন্যতম সেরা গল্প ‘পদ্মগোখরা’ অবলম্বনে নির্মিত ‘সুখ-দুঃখ’। একই কাহিনি নিয়ে ‘মায়ার বাঁধন’ নামে অপর একটি ছবি তৈরি হয়। এরপর লম্বা বিরতি। কোথাও নজরুলের দেখা মেলে না। টিভিতে ও মঞ্চে নজরুল থাকলেও সেলুলয়েডে একেবারে হাহাকার লেগে যায়। ২০০৬ সালে খরা কাটে। নজরুলের ‘মেহেরনেগার’ আসে সেলুলয়েডে। ছবিটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন মুশফিকুর রহমান গুলজার ও মৌসুমী। চলচ্চিত্রে প্রধান দুই চরিত্র কাশ্মিরের তরুণী মেহেরনেগারের চরিত্রে মৌসুমী এবং আফগান যুবক ইউসুফের ভূমিকায় ফেরদৌস অভিনয় করেন। এতে অভিনয়ের জন্য মৌসুমী কলকাতা থেকে পান শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর কালাকার অ্যাওয়ার্ড। ছবিটি প্রযোজনা করে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম। একই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের আরেকটি ছবি নির্মিত হয় নজরুলের গল্প ‘রাক্ষুসী’ অবলম্বনে। ‘রাক্ষুসী’ ছবির পরিচালক মতিন রহমান। তিনটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন রোজিনা, পূর্ণিমা ও ফেরদৌস। এ ছবির মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর অভিনয়ে ফেরেন অভিনেত্রী রোজিনা। সর্বশেষ ২০১৪ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম নির্মাণ করে নজরুলের ‘অতৃপ্ত কামনা’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’। এ ছবির মাধ্যমে পরিচিতি পান এর পরিচালক গীতালী হাসান। অভিনেত্রী সায়লা সাবি সেরা নাচিয়ে প্রতিযোগিতা থেকে আসেন সিনেমায়। এ ছবিতে গান গাওয়ার জন্য শ্রেষ্ঠ গায়িকার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান রুনা লায়লা। উপরোক্ত তিনটি ছবির কোনোটিই বড় পরিসরে নির্মিত হয়নি। স্বল্প বাজেটে নির্মিত ছবিগুলো শুধু টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়েছে। ইমপ্রেসের ছবিগুলো বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছতে পারেনি। অথচ দাবি ছিল, নজরুলের গল্প দেশজুড়ে সিনেমা হলে হলে ছড়িয়ে দেয়ার। ছবিগুলোর কপালে খুব বেশি প্রশংসাও জোটেনি। নামকাওয়াস্তে নজরুল এসেছেন সাম্প্রতিক সিনেমায়। এতে সিনেমাপ্রেমীরা আশাহত হয়েছেন। ছবির বাইরে নজরুলের গান বা গানের অংশবিশেষ উঠে এসেছে সাম্প্রতিক সিনেমায়। ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের ‘চন্দ্রকথা’, তৌকীর আহমেদের ‘দারুচিনি দ্বীপ’, শিহাব শাহীনের ‘ছুঁয়ে দিলে মন’ ও সানিয়াত হোসেনের ‘অল্প অল্প প্রেমের গল্প’। বছর ১৭ আগে আগুনের গাওয়া ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ গানটির জনপ্রিয়তাকে কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। এই গানটি বেশ শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। বাণিজ্যিক ছবিতে ব্যবহৃত হয়েও নজরুলের গান শ্রোতাদের মন জয় করে।

নজরুল সাহিত্য নিয়ে শুধু সিনেমাই নয়, ঢাকার নাট্যমঞ্চেও বেশ কিছু সাহিত্যনির্ভর নাটক মঞ্চায়িত হয়েছে। তবে সাহিত্যনির্ভর নাট্যচর্চায় নজরুলের সাহিত্য যেন কিছুটা অবহেলিত। কাজী নজরুল ইসলামের ‘রাক্ষুসী’ সারাদেশে সর্বাধিক মঞ্চায়িত নাটক হলেও শিল্পমান বিচারে নজরুলের উল্লেখযোগ্য নাটকের সংখ্যা খুবই কম। দেশের বিভিন্ন নাট্যসংগঠন নজরুলের কবিতা-গল্প অবলম্বনে নাটক মঞ্চে এনেছে। এর মধ্যে প্রাঙ্গণেমোর প্রযোজিত ‘দ্রোহ প্রেম নারী’ ও সাম্প্রতিক সময়ে মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনায় মঞ্চে আসা ‘নীলাখ্যান’ নাটকটি প্রশংসা কুড়িয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের গীতিনাট্য ‘আলেয়া’ অবলম্বনে ২০১০ সালের ১৭ জুন প্রাঙ্গণেমোর মঞ্চে আনে নাটক ‘দ্রোহ প্রেম নারী’। রাজা মীনকেতু আর অন্য দেশের রানী জয়ন্তীকে নিয়েই গড়ে উঠেছে ‘দ্রোহ প্রেম নারী’ কাহিনি। মীনকেতু ফুল ও হৃদয় দলন করতে ভালোবাসে। জয়ন্তী চায় মীনকেতুর রাজ্য ও হৃদয় জয় করতে। এই যুদ্ধ, এই ভালোবাসা নিয়েই গড়ে ওঠে কাহিনি। তিনটি পুরুষ ও তিনটি নারীর হৃদয়ের জটিল ধারায় চলাচলের বয়ান এই নাটক। নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন রামিজ রাজু। এটিই এই নির্দেশকের প্রথম নির্দেশিত নাটক।

নাটকটিতে অভিনয় করছেন অনন্ত হিরা, নূনা আফরোজ, সরোয়ার সৈকত, শুভেচ্ছা, অনিন্দ্র কিশোর, ইষ্টের সুমী, নিজাম লিটন, রিগ্যান, মনির, চৈতী, সীমান্ত, বিপ্লব, লিটু, সুজন, আশা, উষা, সুজয়, সেলিম ও মিথুন। জেনেসিস থিয়েটার মঞ্চে এনেছে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের জীবনীভিত্তিক নাটক ‘দামাল ছেলে নজরুল’। ২০১১ সালে এটি মঞ্চে আসে। এটি লিখেছেন মাহমুদ উল্যাহ। নির্দেশনা দিয়েছেন নূর হোসেন। নাটকে দেখা যায়, ছেলেবেলায় বাবাকে হারিয়ে ছোট বোন আর মাকে নিয়ে কষ্টের জীবন শুরু নজরুলের। লেটোর দলে গান, রুটির দোকানে চাকরি, রানীগঞ্জে শিয়ারশোল স্কুলে ভর্তি, ইংরেজদের বিরুদ্ধে হাবিলদার নজরুল। বাঙালি পল্টন ভেঙে দেয়ার পর অন্যায়ের বিরুদ্ধে ‘কলম’ নামের অস্ত্র হাতে নিয়ে সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় কালজয়ী ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশ- এসব নিয়ে নাটকটির কাহিনি এগিয়ে যায়। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন নিথর মাহবুব, ইমন, শাওন, ইকবাল, তাহের, রনি, ফারজানা, সচি, সাকিব, সাবা, কাঁকন প্রমুখ। ঢাকার মঞ্চে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত হয়েছে নাটক ‘নীলাখ্যান’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাপুড়ে’ গল্প অবলম্বনে নাটকটি লিখেছেন আনন জামান। মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনায় নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন ইউসুফ হাসান অর্ক। প্রথম প্রদর্শনীতেই নাটকটি নাট্যজনদের কাছে প্রশংসা কুড়ায়।

‘নীলাখ্যান’-এ অভিনয় করছেন পলি বিশ্বাস, মনামী ইসলাম কনক, লিঠু মণ্ডল, জেরিন তাসনীম এশা, কোনাল আলী, চৈতী সাথী, তনু ঘোষ, আমিনুল আশরাফ, আসাদুজ্জামান রাফিন, মোহাম্মদ আহাদ, শিবলী সরকার, শাহরিয়ার হোসেন পলিন, ইয়াছির আরাফাত, তৌহিদুল রহমান শিশির, ইকবাল চৌধুরী, জাহিদুল কামাল চৌধুরী দিপু ও মো. শাহনেওয়াজ।

নাটকটির নির্দেশক ইউসুফ হাসান অর্ক বলেন, নাটকের কাহিনিটির প্রেক্ষাপট বেদে বহর হলেও কবি নজরুলের অন্তভ্রোতে এমন একটি সর্বজনীন বীজ ভাসিয়ে দিয়েছেন, যা স্পষ্টতই গোটা মানবজাতির সর্বকালকে ছুঁয়ে যায়। ‘নীলাখ্যান’ প্রযোজনাতেও সেই প্রয়াস রয়েছে। ঢাকার মঞ্চে সাহিত্যনির্ভর নাটকে নজরুল নিয়ে কিছু কাজ হলেও সেগুলো মানের বিচারে অপ্রতুল। নজরুলের লিচু চোর কবিতা নিয়ে একাধিক শিশু-কিশোর নাট্যসংগঠন মঞ্চনাটক করেছে। তবে নজরুলের অনেক কবিতা, গল্প রয়েছে যেগুলো মঞ্চনাটক হিসেবে সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু নাট্যমঞ্চে নজরুল কিছুটা কমই চর্চিত হয়েছে।

:: মেলা প্রতিবেদক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App