×

এই জনপদ

কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে দূষিত হালদা, ঝুঁকিতে মা-মাছ

Icon

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে দূষিত  হালদা, ঝুঁকিতে মা-মাছ

এম. রমজান আলী রাউজান (চট্টগ্রাম) থেকে : প্রজনন মৌসুমেই দূষিত হচ্ছে এশিয়ার অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হালদা নদী। চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার পাঁচটি খালের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন কলকারখানা ও গৃহস্থালি বর্জ্য এসে হালদায় পড়ছে। নদীটিকে সরকার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ এখানে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলা দূরে থাক, নদীর পানি দূষিত হয় এমন কোনো তৎপরতা চালানো যাবে না। কিন্তু দুই সপ্তাহ ধরে দূষণ প্রকট হলেও এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো উদ্যোগ নেই। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, নদীর দূষণ ঠেকানো না গেলে নদীর মা মাছ ও বিপন্ন প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিনের অস্থিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ের বাহির সিগন্যাল এলাকায় জুতা, প্যাকেজিং কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানা গড়ে উঠেছে। আর এসব কারখানার বর্জ্য সরাসরি এসে ফেলা হচ্ছে খালে। এছাড়া নগরের অক্সিজেন, চান্দগাঁও, কুলগাঁও এলাকার কারখানার বর্জ্য এবং আবাসিক এলাকার গৃহস্থালি বর্জ্যও পড়ছে এ নদীতে। হালদার যেসব জায়গায় বর্জ্য পানিতে গিয়ে মিশেছে, সেখানকার পানি পরীক্ষা করে গবেষকেরা দেখেছেন, তা কোনো প্রাণীর বেঁচে থাকার জন্য উপযুক্ত নয়। কারখানার বিষাক্ত, তৈলাক্ত ও উৎকট দুর্গন্ধময় বর্জ্যে নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়াই স্বাভাবিক। শুধু তা-ই নয়, দূষণের কারণে কৃষিকাজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো কাজই করতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দা। এতে অন্তত তিন হাজার জেলের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রায় এক হাজার একর জমির চাষাবাদ। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে হালদার পারে। এখন হালদা নদীতে মাছের প্রজনন মৌসুম চলছে আর এ সময়েই প্রকট হয়ে উঠেছে দূষণ। অথচ এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো উদ্যোগ নেই। হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে, কর্তৃপক্ষটির কর্তারা নতুন করে হালদায় বর্জ্য মিশে যাওয়ার বিষয়টিই অবগত ছিলেন না। তবে তারা বলছেন, কোনো কোনো কারখানা বা কারা এই দূষণের সঙ্গে জড়িত, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ বি এম মসিউজ্জামান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সরজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, হালদা নদীর বর্তমান দূষণের অন্যতম কারণ, খালগুলো দিয়ে বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এটা বন্ধ করা না গেলে নদীটি দূষিত হতেই থাকবে। এই দূষণের জন্য দায়ী কলকারখানাগুলোকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে হবে। গত ২৫ জুন বড় আকারের মৃত ডলফিন উদ্ধারের একদিন পর ২৬ জুন (বুধবার) নদীতে ভেসে উঠেছে ১০ কেজি ওজনের একটি মৃত রুই মা মাছ। স্থানীয়রা জানান, কিছুদিন আগেও নদী থেকে আরো একটি মৃত মাছ ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। নদীতে একের পর এক মৃত ডলফিন ও মাছ ভেসে উঠায় নদীর বাস্তুতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন হালদা বিশেষজ্ঞরা। উরকিরচর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কাওছার আলম জানান, ১০ কেজি ওজনের রুই মা মাছটি নদীতে মরে ভেসে উঠলে এক মৎস্যজীবী উদ্ধার করে নদীর পাড়ে নিয়ে আসেন। মাছটি পচে যাওয়ার কারণের সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। তাই নদীর পাড়েই মাটিচাপা দেয়া হয়। নদীর পানি দূষণের কারণে মা মাছটি মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

হালদা নদীর দূষণের কারণ ও প্রতিকার খুঁজে বের করতে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে একটি কমিটি করা হয়েছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বামনশাহী খালে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকার শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি খালে গিয়ে পড়ছে। পরে তা কুয়াইশ ও চন্দ্র বিল নামের বিল এবং নালা-নর্দমার ভেতর প্রবাহিত হয়ে কুয়াইশ, খন্দকিয়া ও কৃষ্ণ খালের মধ্য দিয়ে হালদা নদীতে ঢুকছে।

এ বিষয়ে হালদা গবেষক ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মনুষ্যসৃষ্ট ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে হালদা নদীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। বিভিন্ন উৎস থেকে শাখাখালের মাধ্যমে পোল্ট্রি, গৃহস্থালি, মানববর্জ্য, শিল্প কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য প্রতিনিয়ত হালদা নদীতে পড়ছে। এতে হালদা নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্রের পানির বিভিন্ন ভৌত-রাসায়নিক গুণাবলি পরিবর্তন হয়ে দূষিত করছে হালদার জলজ পরিবেশকে। এভাবে ডলফিন ও মাছের মৃত্যু হালদা বাস্তুতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। হালদা বাস্তুতন্ত্রকে মাছ ও ডলফিনের নিরাপদ আবাসস্থল করতে দূষণসহ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App