×

এই জনপদ

সাটুরিয়ায় কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি, হুমকিতে পরিবেশ

Icon

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সাটুরিয়ায় কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি, হুমকিতে পরিবেশ

মো. হোসেন জয়, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) থেকে : সাটুরিয়ার দিঘুলিয়া ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামে অবৈধভাবে গাছের গুঁড়ি ও কাঠ পুড়িয়ে কৃত্রিমভাবে কয়লা তৈরি হচ্ছে। তাই হুমকিতে ওই এলাকার পরিবেশ। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র দূরের কথা, কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হচ্ছে কয়লা। আর কারখানার চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, নষ্ট হচ্ছে ফসল। এছাড়া আশপাশের এলাকার মানুষ কাশিসহ নানা সমস্যায় ভুগছে এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর।

সরজমিন দেখা যায়, দিঘুলিয়া ইউনিয়নটি ধলেশ্বরী নদী বেষ্টিত ইউনিয়ন। আর এই ইউনিয়নের জালশুকার গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে ইট দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে কয়লা কারখানার চুল্লি তৈরি করা হয়েছে। চারদিকে বিভিন্ন ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ি। নদীঘেঁষা কারখানায় প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে বিভিন্ন বনদ ও ফলদ গাছ কেটে নিয়ে কয়লা কারখানায় পোড়ানো হচ্ছে। আর কারখানার চুল্লি থেকে নির্গত ধোঁয়ায় পরিবেশ ও নদীর জীববৈচিত্র্যের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য এবং কমে যাচ্ছে জমির উর্বরতা। ইট দিয়ে চুল্লি বানিয়ে মাটির প্রলেপ দেয়া হয়েছে। চুল্লির চারদিকে রাখা গাছের গুঁড়ি ও শুকনা কাঠ-লাকড়ি। ২টি দুটি চুল্লিতে আগুন দিলে কালো ধোঁয়ায় চারদিক ছেয়ে যায়। প্রতিটি চুল্লিতে ১৫০-২০০ মণ কাঠ ফেলে আগুন দেয়া হয়।

কারখানার শ্রমিক ফারুক বলেন, ইট দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে চুল্লি তৈরি করা হয়েছে। প্রথমে সাটুরিয়ার বিভিন্ন গ্রাম থেকে কাঠ সংগ্রহ করা হয়। চুল্লির মধ্যে সারিবদ্ধভাবে কাঠ সাজিয়ে একটি মুখ খোলা রেখে অন্য মুখগুলো মাটি ও ইট দিয়ে বন্ধ করে দেই। এই প্রক্রিয়ায় ২-৩ দিন লাগে প্রতিটি চুল্লিতে সাজাতে। বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে ৫-৭ দিন সময় নিয়ে কাঠ পুড়াই। তখন কাঠ থেকে কয়লা হয়ে যায়। আগুন নিভানোর ৩ দিন পর চুল্লি থেকে কয়লা বের করি। প্রতিটি চুল্লিতে প্রতিবার ২০০ থেকে ৩০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়। পরে এই কয়লা ঠাণ্ডা করার পর পরিষ্কার করে ওজন দিয়ে বস্তায় ভরা হয়। পরে মহাজন এসে কয়লা নিয়ে যায়। আমাদের এসব কয়লা বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁর মালিকরা কিনে নেন। হোটেল মালিকরা এ কয়লা দিয়ে রুটি ও নান রুটি তৈরিতে ব্যবহার করে। প্রতি কেজি কয়লা ৩০-৫০ টাকায় বিক্রি করা হয় বলেও জানান তিনি।

সবুজ পরিবেশ আন্দোলনের জেলা কমিটির সভাপতি রাজ্জাক হোসেন রাজ বলেন, এমনিতেই গাছ কাটা ও তা জ¦ালানি হিসেবে পোড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। উপরন্তু কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে বনজ সম্পদ, অন্যদিকে কয়লার কালো ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। স্থানীয়রা বলেন, জালশুকা গ্রামের বাসিন্দা আবুল হোসেন কৃত্তিমভাবে কয়লা তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছেন। এখানে গাছের গুঁড়ি ও কাঠ দিয়ে কয়লা তৈরি হচ্ছে। কারখানায় রয়েছে দুটি চুল্লি। পাবনা জেলা থেকে শ্রমিক নিয়ে এসে কাজ করা হচ্ছে। ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে এ অবৈধ কয়লার কারখানা।

দিঘুলিয়া ইউনিয়নের পূলশুরা গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল রানা বলেন, চারপাশে বাড়িঘর আর ফসলি জমি ও পাশেই ধলেশ্বরী নদী। কিভাবে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশের ক্ষতি করে কয়লা তৈরির কারখানা চলছে, সবসময় কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। কয়লার ধোঁয়ায় শিশুরা থেকে শুরু করে, তরুণ ও বয়স্করা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন। কয়লা কারখানার চুল্লি পর্যাপ্ত উঁচু না থাকায় কালো ধোঁয়ায় বিভিন্ন ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

কারখানার মালিক আবুল হোসেন বলেন, কারখানায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেই। ভাই ব্যবসা করে খাইতেছি। কারো কোনো ক্ষতি করছি না। দিঘুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শফিউল আলম জুয়েল বলেন, কয়লা কারখানার চুল্লির কারণে এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এলাকাবাসী শতশত ব্যক্তির স্বাক্ষর নিয়ে লিখিত অভিযোগ আমাকে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় একাধিকবার আলোচনা করার পরেও কয়লা কারখানা বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শান্তা রহমান বলেন, দিঘুলিয়া ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামে কাঠ দিয়ে কয়লা তৈরির বিষয়টি মৌখিকভাবে শুনেছি। বিষয়টি দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে ওই কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিব।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App