×

এই জনপদ

নড়াইল

ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

Icon

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শুভ সরকার, নড়াইল থেকে : নড়াইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় জেলার ৪৮২টি কেন্দ্রের শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। উৎকোচ না দেয়ার কারণে গত এক বছরে ৪৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। যেসব কেন্দ্রের শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে শূন্যপদের বিপরীতে অর্থের বিনিময়ে নতুন করে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষকরা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি শুনানির জন্য ভুক্তভোগী শিক্ষক এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক মিজানুর রহমানকে আগামী ৭ মে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সরাসরি উপস্থিত হতে বলা হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের লিখিত অভিযোগে জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে নড়াইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম বেশ সুনামের সঙ্গে চলে আসছে। ২০২৩ সালের ১ মার্চ বর্তমান উপপরিচালক মিজানুর রহমান যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়ম শুরু হয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে বিভিন্ন অঙ্কের ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে। ঘুষ দিতে না পারায় ৪৫ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এদিকে শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। প্রতিটি পদে ৫০ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে উপপরিচালক মিজানুর রহমান এবং সুপারভাইজার ফাইজার রহমানসহ অফিসসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। নিয়োগ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অফিস থেকে সম্প্রতি মোবাইলে দেড় লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। যার কলরেকর্ডিং ভুক্তভোগীর কাছে সংরক্ষিত আছে। কালিয়া উপজেলার বাবরা মধ্যপাড়ার সোনিয়া পারভীন বলেন, প্রায় আট মাসে আগে ইসলামিক ফাউন্ডেশন অফিস থেকে আমার কাছে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়। আমি নিয়মিত কেন্দ্র পরিচালনা করলেও ঘুষের ৩০ হাজার টাকা দিতে না পারায় আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে সম্মানির পাঁচ হাজার টাকা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের ‘ঘুষ দিলে চাকরি থাকে, না দিলে থাকে না’। অপর ভুক্তভোগী শহরের ভওয়াখালী এলাকার খাজিদা খানম বলেন, আমাকে অফিসে ডেকে নিয়ে সাদা কাগজে সই নিয়েছে। পরে জানতে পারি, আমার চাকরি নেই। ঘুষের টাকা দিতে না পারায় আমার চাকরি হারাতে হয়েছে।’ লোহাগড়া উপজেলার মাকড়াইল খানপাড়া কেন্দ্রের শিক্ষক সানজিদা খানম বলেন, আমি অসহায় বিধবা। এই চাকরি আমার সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতনে আমি কোনো রকম সংসার চালাতাম। একদিন সকাল সাড়ে ৭টায় অফিস থেকে আমার কেন্দ্রে পরিদর্শনে গিয়ে কোনো ছাত্রছাত্রী না দেখে বিনা নোটিসে আমাকে চাকরি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অথচ আমার কেন্দ্রে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা সকাল সাড়ে ৯টায়। তাহলে সকাল সাড়ে ৭টায় দিয়ে কীভাবে ছাত্রছাত্রী দেখতে পাবে? চাকরিচ্যুত করায় আমি মানবেতর জীবনযাপন করছি। এদিকে ২০২৩ সালে ৪৮২ জন শিক্ষকের কাছ থেকে জাকাতের কথা বলে জোরপূর্বক জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে মোট ৪ লাখ ৮২ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। একই কথা বলে চলতি বছরে জনপ্রতি দুই হাজার টাকা করে মোট নয় লাখ ৬৪ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী অনেকের অভিযোগ, সমাজ থেকে আমরাই জাকাত পাওয়ার যোগ্য। অথচ আমাদের কাছ থেকে জাকাতের নামে বর্তমান উপপরিচালক মিজানুর রহমানের সময়ে অবৈধ টাকা তোলা হয়েছে। বিগত উপপরিচালকদের সময়ে এমন ঘটনার নজির নেই। অপরদিকে, ২০২৩ সালের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর ইমাম সম্মেলনে নড়াইল থেকে ৫০০ ইমাম ঢাকায় যোগদান করায় সম্মানি বাবদ প্রত্যেক ইমামকে এক হাজার ২০০ টাকা দেয়ার কথা থাকলেও তাদের কোনো টাকাই দেয়া হয়নি। বিভিন্ন এলাকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আয়োজনে জনসচেতনতামূলক উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও শিক্ষকদের কোনো সম্মানি দেয়া হয়নি। এ ব্যাপারে নড়াইল সদরের কমলাপুর কেন্দ্রের শিক্ষক মাওলানা ক্বারি ইদ্রীস আলী বলেন, আমার উঠান বৈঠকে ৪০ জনের বেশি উপস্থিত ছিল। আমাকে সম্মানি বাবদ ১৫০০ টাকা দেয়ার কথা থাকলেও আমি আজো কোনো টাকা পাইনি। সুপারভাইজার ফাইজার রহমানের কাছে টাকা চাইলে তিনি আমাকে বলেন, আমি টাকা কাকে দেব না-দেব, সেটা আমার বিষয়। এই টাকার ভাগ উপপরিচালক মিজানুর রহমানকে দেয়া লাগে। অভিযোগ করে কোনো লাভ হবে না। ভুক্তভোগী শিক্ষক ক্বারি ইদ্রীস আলী ঘটনটি উপপরিচালক মিজানুর রহমানকে জানালে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি দেখছি। জানা গেছে, উপপরিচালক মিজানুর রহমানের বাড়ি বাগেরহাট জেলায়। বিয়ে করেছেন নড়াইলের মহাজন এলাকায়। নিজ জেলা বাগেরহাট ও শ্বশুরবাড়ি মহাজন এলাকায় অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অফিসের এক কর্মচারী বলেন, মিজানুর রহমান স্যার আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। প্রায় আট বছরের চাকরিজীবনে কয়েকটি ট্রাক, মাটিকাটা ভেকুমেশিনসহ রয়েছে কোটি টাকার বিভিন্ন ব্যবসা। নিজ জেলা ও শ্বশুরবাড়ি এলাকায় ঘেরসহ কয়েক কোটি টাকার জমির মালিক তিনি। অভিযোগের বিষয়ে ফিল্ড সুপারভাইজার ফাইজার রহমান বলেন, চাকরির জন্য কারো কাছে কোনো প্রকার টাকা দাবি করিনি। উঠান বৈঠকের টাকাও আত্মসাতের প্রশ্নই উঠে না। কারো চাকরি খাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এ ব্যাপারে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে তা সঠিক নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে আমার একার কোনো হাত নেই। অফিসিয়াল নিয়মানুযায়ী চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ইমাম সম্মেলনে ইমামদের সম্মানির টাকা যাতায়াত ও খাওয়া খরচ বাবদ ব্যয় করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে জাকাত বাবদ ২০২৩ সালে এক হাজার ও ২০২৪ সালে দুই হাজার টাকা করে নেয়া হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এম এম আরাফাত হোসেন বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App