×

এই জনপদ

ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা : দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বরিশালের পান

Icon

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা : দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি  হচ্ছে বরিশালের পান
এম কে রানা, বরিশাল : পান চাষের ভরা মৌসুমে ব্যস্ত সময় পার করছেন বরিশালের পান চাষিরা। পাশাপাশি পান ব্যবসায়ীরাও এখন ছুটছেন পান চাষিদের কাছে। এ অঞ্চলের পান অনেক সুস্বাদু হওয়ায় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও যাচ্ছে। বিদেশে রপ্তানির সুযোগ থাকায় এ খাত থেকে অর্জিত একটি বড় অংশ অর্থনৈতিকভাবে জিডিপিতে যুক্ত হতে পারে বলে মনে করেন বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে পান রপ্তানি না করলে লাভের চেয়ে লোকসানের ঝুঁকি বেশি থাকে বলেন তারা। এদিকে স্থানীয় পান চাষিদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হলেও পানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না তারা। এমনকি কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও পাচ্ছেন না কোনো সহযোগিতা কিংবা পরামর্শ। আর কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট প্রকল্প না থাকায় চাষিদের আর্থিক সহযোগিতা কিংবা প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে কৃষকদের পান চাষে সফল হওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের। সরজমিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, পানের বরজগুলোতে চলছে পরিচর্যার কাজ। পান চাষিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। অনেকে আবার বরজ সংস্কারকাজেও ব্যস্ত। বাঁশ ও বাঁশের শলা দিয়ে মাচা তৈরি করে খড়-কুটা দিয়ে ছাউনি করে সুপারি গাছের পাতা ও কলা পাতা দিয়ে ঘিরে তৈরি করা হচ্ছে পানের বরজ। উজিরপুর উপজেলার পূর্ব মুন্ডপাশা গ্রামের পান চাষি সাহেব আলী আকন বলেন, পূর্ব পুরুষদের আমল থেকেই তিনি পান চাষ করছেন। তবে গত কয়েক বছর ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে তার বরজ সংখ্যা কমেছে। বর্তমানে ১৫ শতাংশ জমিতে তার ৩০০ বরজ রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কৃষি অফিস থেকে তাদের কোনো সহযোগিতা কিংবা পরামর্শ দেয়া হয় না। আরেক পান চাষি মিলন খলিফা বলেন, বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা কমে গেছে। তাই ধান, গম, তিলসহ অন্যান্য ফসল এখন তেমন একটা উৎপাদন হচ্ছে না। তাই পানে চাষে ঝুঁকছেন তিনি। ভালোভাবে যতœ করলে পানের উৎপাদনও বেশি হয়। প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগ বেশি হলেও একটি বরজ করলে একটানা ১৫-২০ বছর পান বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করা সম্ভব বলেও জানান তিনি। গৌরনদী উপজেলার শরিকল গ্রামের পান চাষি বিপ্লব ঢালী বলেন, ৩০ শতাংশ জমিতে তার প্রায় ৬০০ পানের বরজ রয়েছে। গত বছর ভালো উৎপাদন হওয়ায় এবার বরজের সংখ্যা বাড়িয়েছেন তিনি। অতিরিক্ত গরম পড়লে বরজে পানি দিতে হয়। এতে তাদের পরিশ্রম এবং অর্থ দুটোই বেশি খরচ হয়। কিন্তু সে অনুযায়ী পানের মূল্য তারা পান না বলেন তিনি। টরকী বন্দরের পানের আড়তদার রমনী সোম বলেন, বৈশাখ থেকে আশ্বিন-কার্তিক মাস পর্যন্ত পানের ভরা মৌসুম। এ সময়ে নিলামের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পান ব্যবসায়ীরা পান কিনে নেয়। ঢাকার ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চল থেকে পান নিয়ে সৌদি আরব, দুবাই, আবুধাবি, সুইজারল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পান রপ্তানি করছেন। তবে বর্তমানে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন হাটবাজার থেকে পান সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাচ্ছেন দাবি করে তিনি বলেন, এতে একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পান চাষিরা। অপরদিকে পানের গুণগত মান ঠিক না থাকায় বিশ্বে দেশের পানের সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিতে পানের বরজ রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলার ১০ উপজেলায় ২১ হাজার ১৬ মেট্রিক টন পান উৎপাদন হয়েছে। যার মূল্য প্রায় ১শ কোটি টাকার বেশি। জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে বরিশাল জেলার ১০ উপজেলায় ২ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল সদর উপজেলায় ৫০ হেক্টর, বাবুগঞ্জ উপজেলায় ১৩৫ হেক্টর, উজিরপুর উপজেলায় ৩১৮ হেক্টর, বাকেরগঞ্জ উপজেলায় ৫৫০ হেক্টর, গৌরনদী উপজেলায় ১ হাজার ৫০ হেক্টর, আগৈলঝাড়ায় উপজেলায় ২৪০ হেক্টর, মুলাদি উপজেলায় ১৫২ হেক্টর, হিজলা উপজেলায় ১৬০ হেক্টর, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় ২০০ হেক্টর, বানারীপাড়া উপজেলায় ১০৫ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়। উজিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার কপিল বিশ্বাস বলেন, বর্তমান পানভিত্তিক কোনো প্রকল্প না থাকায় চাষিদের আর্থিক সহযোগিতা কিংবা প্রশিক্ষণ দেয়া যাচ্ছে না। গৌরনদী উপজেলা কৃষি অফিসার মো. সেকান্দার শেখ বলেন, স্থানীয় পান চাষিদের প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছেন তারা। যাতে পানের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং চাষিরা লাভবান হয়। তবে বরিশাল অঞ্চলের পান বিদেশে রপ্তানি হয় এ বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান। বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপপরিচালক মো. মুরাদুল হাসান জানান, পান চাষে কীটনাশক বা সার স্প্রে না করার জন্য চাষিদের বলা হয় এবং নিরাপদ পান উৎপাদনের জন্য তাদের বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে সারা বছরই পানের চাহিদা রয়েছে এবং সঠিক দামও পাচ্ছেন পান চাষিরা। এ কারণে অনেক কৃষকই পান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তাছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের পান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির সুযোগ থাকায় এ থেকে অর্জিত একটি বড় অংশ অর্থনৈতিকভাবে জিডিপিতে যুক্ত হতে পারে বলে মনে করেন এ কর্মকর্তা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App