×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

রক্ষক ভক্ষক হওয়ার উৎস বন্ধ করুন

Icon

মমতাজ লতিফ

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রক্ষক ভক্ষক হওয়ার উৎস বন্ধ করুন

দেশের চতুর্দিকে লোভীদের আগ্রাসী লোভ এবং এক শ্রেণির অনলাইনভিত্তিক হৃদয়হীন প্রতারকের অমানবিক নির্মম আচরণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেখে সেই ’৭১-কে বড় বেশি মনে পড়ছে। আফসোস হয় আজ এই ছোট্ট ভূমির দেশটির যে জনমানুষের স্বাধীন জাতি হিসেবে যে নেতা এবং তার সহকর্মী, তাদের অনুগামী তরুণ ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক একবারও নিজেদের প্রাণ রক্ষার কথা না ভেবে নেতার একটি ডাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ছুটে গিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল, তারা কী ভাবছেন! যে বাঙালি ছেঁড়া কাপড় পরে দিনের পর দিন অভুক্ত থেকে সশস্ত্র যুদ্ধ করেছিল তারা কি পঞ্চাশ বছর পরের এই আগ্রাসী, ভূমি, নদী, হাওর, বন, খাল, পরের পুকুর-দীঘি দখল করার এক তুমুল প্রতিযোগিতায় একদিন নামবে- সেটি তাদের কাছে কতটা মর্মঘাতী তা আমাদের কল্পনার অতীত।

সন্দেহ নেই, আমাদের দেশের জনসংখ্যা ভূমির তুলনায় বিশাল। সে কারণে একদল নিরক্ষর ও অল্প শিক্ষিত তরুণ বিদেশে শ্রমিকের কাজ করতে এবং ভালো আয় করতে, পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্য আনতে প্রায় ৩০-৪০ বছর নানা দৈহিক শ্রমভিত্তিক কাজে প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে সৎ পথে আয়-উপার্জন করছিল। বর্তমানে এই প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে যাদের আমরা ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ নামকরণ করেছি। তারাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক এবং সৎ কাজে শ্রম দিয়ে দেশের মানসম্মান রেখে চলেছে। এদের পাশে অতি ধনী বেনজীর বা বেসিক ব্যাংকের বাচ্চুরা তুচ্ছ, নগণ্য একেকজন দেশদ্রোহী। এরা তো বিদেশে টাকা পাচার করে বিদেশে বাস করার জন্য অর্থাৎ ওরা বিদেশপ্রেমী! দেশের দরিদ্রের উপকার করার বদলে ক্ষমতা দ্বারা এরা গরিব, সমাজের নিম্নস্তরের অসহায় মানুষ, সংখ্যালঘু, আদিবাসী বা কৃষকের জমি দখল করে রিসোর্ট, পার্ক ইত্যাদি নির্মাণ করে কৃষি জমির যেমন ক্ষতি করেছে, তেমনি গরিব পরিবারের বার্ষিক ধান-চাল-সবজি-ফল ইত্যাদি উৎপাদনের সুযোগ ও অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করেছে। মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুর উক্তি- ‘বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত, শাসক আর শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে’! এরই পাশে, দেখা যায় একদল বিশাল প্রতারক শ্রেণির উত্থান ঘটেছে। এদের অনেকেই প্রবাসী শ্রমিক হতে পারত এবং সৎ পথে আয় উপার্জন করতে পারত। কিন্তু তারা হয়ে উঠল প্রচণ্ড নির্যাতক। প্রবাসী শ্রমিক হতে যাওয়া তরুণদের প্রতারণার মাধ্যমে বন্দি করে স্বজনদের কাছে তাদের ওপর নির্যাতনের আর্ত চিৎকার শুনিয়ে লাখ লাখ টাকা দাবি করে! এসব ঘটনা বঙ্গবন্ধু বা তাদের সহকর্মী রাজনীতিক বা তাদের অনুগামী মুক্তিযোদ্ধারা ছাত্র-কৃষক কি কখনো কল্পনা করেছেন?

এর পাশে আছে আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোর প্রশাসনিক ও আইনগত দুর্বলতা।

প্রথমত, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস করতে আরো কঠোর নীতি প্রণয়ন করতে হবে। জনসংখ্যা সীমিত হলে দলে দলে গ্রামের তরুণরা বিদেশে যেতে ভিটা জমি বিক্রি করত না। প্রতারকের হাতে জিম্মি হতো না, বা ভূমধ্যসাগরে ডিঙ্গি নৌকায় পার হতে গিয়ে ডুবে প্রাণ হারাত না। চীন তার এক সন্তান নীতির কঠোর বাস্তবায়নের ফলে এখন উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ গ্রহণ-পরিশোধের নিয়মগুলো আরো কঠোর করতে হবে। সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে ব্যাংকের বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সততা, নিষ্ঠা, ব্যাংকের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রতি। এ গুণগুলো কিছুদিনের কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অসততার প্রমাণ পেলে সে চেয়ারম্যান, সদস্যকে শুধু সরিয়ে দেয়া নয়, জরিমানা বা অন্য কোনো শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এমন ব্যাংকিং আইন বাস্তবায়ন জরুরি।

তৃতীয়ত, আমলা, প্রকল্প পরিচালক, সরকারি সংস্থার অনেক কর্মকর্তা, কর্মচারীর নানা আয়বহির্ভূত সম্পদের-জমি-ফ্ল্যাট-রিসোর্টের মালিকানার খবর প্রায়ই প্রকাশ পাচ্ছে। এ জায়গায় আমার মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুর সময়ে ’৭২-সালের শেষে চাকরি পেয়ে প্রতি বছর কঠোরভাবে কলেজের অ্যাকাউন্ট্যান্ট আমাদের আয়কর রিটার্ন ট্যাক্স ফরম পূরণ, সম্পদের বার্ষিক হিসাব আমাদের কাছ থেকে করিয়ে নিতেন। এমনকি কয় ভরি স্বর্ণ আছে, আসবাবপত্রের আনুমানিক মূল্য ওই সম্পদের রিটার্ন ফরমে লিখতে হতো! তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর ওই সাড়ে তিন বছরে বেতন ফরমের ওপর আমাদের লিখতে হতো- ‘আমি সরকারি বাড়িতে থাকি না’, সেজন্য বাড়ি ভাড়া প্রাপ্য, অথবা ‘আমি সরকারি বাড়িতে থাকি’, তাদের বাড়ি ভাড়া বাদ থাকত। বর্তমানে দুর্নীতিতে নোবেল পাওয়ার মতো যে নামগুলো মিডিয়ায় উঠে আসছে- তার মধ্যে নিঃসন্দেহে প্রাক্তন র‌্যাব ও প্রাক্তন পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমদ ও তার স্ত্রী কন্যারা প্রধান। এছাড়া রেভেন্যু অফিসার মতিউরের নামও উঠে এসেছে! এখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- এই ব্যক্তি বেনজীর তো সরকারি উচ্চ কর্মকর্তা ছিলেন। অন্তত বিগত চার-পাঁচ বছরে তার সম্পদ কী হারে, কীভাবে অতিকায় রূপ পেল, তা সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো সচিব, উপসচিব অথবা পুলিশের অধস্তন কর্মকর্তারা জানবেন না- এটা বিশ্বাস হয় না। এ সম্পদ তো অদৃশ্য নয়, মাঠে-ঘাটে আছে। সরকারের উচ্চ মহলে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের চারিত্রিক স্খলন, সম্পদ বৃদ্ধি, অসদুপায়ের দরিদ্রের ভূমি দখল করে রিসোর্ট তৈরি- এসবের খবর কি পৌঁছত না? একই প্রশ্ন মতিয়ার রহমানের সম্পর্কে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের ঊর্ধ্বতন-রহমাতুল মুনিম বা অন্য কেউ কি সে যে একই পদে দীর্ঘকাল থেকেছিল, দুবার ট্রান্সফার বন্ধ করেছে, সে খবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুর্নীতি দেখভালের কর্মকর্তারা কেউই জানত না- এটি দেশের মানুষ আর বিশ্বাস করছে না। প্রধানমন্ত্রীর কানে এসব খবর কেন ডিবির মাধ্যমে পৌঁছল না?

এ ক্ষেত্রে প্রথমত বঙ্গবন্ধুর আমলের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী ফরম পূরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। দুর্নীতিকে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখাতে হলে বেনজীর, মতিউরদের মতো ব্যক্তিদের অসৎ কর্ম করার সময় হাতে নাতে ধরার এমন কোনো ব্যবস্থা দেশে নেই? বিশ্বাস হয় না। ডিবির কাজ কি তাহলে সাংবাদিকরাই করবেন? সে কি নিজে থেকে দুর্নীতির তথ্য বের করবে না? তাকে দুদক বলবে তারপর সে কাজ করবে?

প্রধানমন্ত্রী জানেন, বোঝেন- এভাবে কাজ হবে না, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ হাস্যকর বক্তব্য হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর আমলা, রাজনীতিবিদ, সংস্থার কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি, সবার সম্পদের বার্ষিক তথ্য বিবরণী জমা নিতে হবে। একটা প্রশ্ন- সরকারের তৈরি বাড়ি অনেক সরকারি কর্মকর্তা কিনেছেন। কিন্তু তারা কী করে রাজউকের প্লট পায়? এটা আর যাই হোক একটি বড় দুর্নীতি। এক ব্যক্তি দুটি সরকারি সুবিধা পেতে পারে না। যে সরকারি কর্মকর্তা কম মূল্যে বড় বা মাঝারি ফ্ল্যাট কিনল, সে কেন আবার রাজউকের পূর্বাচল, বা বসুন্ধরায় প্লট কেনার সুযোগ পাবে? অন্যদিকে অন্যরা কিছুই পাবে না এটা কি বৈষম্যহীন বঙ্গবন্ধুর দেশে হতে পারে? যাদের এরকম দু’জায়গায় ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে, তাদের একটি ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিতে হবে। এসব বিষয়ে কঠোর নীতি অবলম্বন করতে হবে। আমরা জেনে খুশি হয়েছিলাম সংসদ সদস্যদের বিনা শুল্কে গাড়ি আনা বন্ধ করা হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে এটাতে যারা অসন্তুষ্ট তারা নিশ্চয় প্রধানমন্ত্রীকে ধরেছেন এত বড় সিদ্ধান্ত সাধারণত মন্ত্রীরা নেন না বলে শুনেছি। তাহলে প্রশ্ন- কোথায় আমাদের বৈষম্যহীন ডিজিটাল, স্মার্ট সোনার বাংলা? গরিবের বাঁচার জমি দখল নেয় যারা, তারা কীভাবে নির্ভয়ে এতকাল ধরে এসব অন্যায় দুর্নীতি করে বিদেশে পালাচ্ছে? এরা আর চৌধুরী মঈনুদ্দীনের মধ্যে কোনো তফাৎ আছে কী? ওরা দেশদ্রোহী খুনি, যুদ্ধাপরাধী, আর এরা দেশদ্রোহী গরিবের ধন চোর। শেষ পর্যন্ত আমাদের আশা-ভরসা কেবল একজন শেখ হাসিনা। ওনাকেই কঠোর হতে হবে। নতুবা ‘জিরো টলারেন্স’ হাস্যকর অলিক বস্তু হয়ে থাকবে, যা দেখে বঙ্গবন্ধু অনেক কষ্ট পেতেন, হয়তো বলতেন- এ বাংলাদেশ আমি চাই না, চাইনি।

মমতাজ লতিফ : কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App