×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

ছাগলকাণ্ডের সূত্র ধরে পাগল হলো দেশ

Icon

ড. মাহবুব হাসান

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ছাগলকাণ্ডের সূত্র ধরে পাগল হলো দেশ

আমার কেবল মনে হচ্ছিল আবু মাহমুদ ফয়সালের (যদি পত্রিকার রিপোর্ট সত্য হয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান যদি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে) দূরসম্পর্কের আত্মীয় হতে পারলেও, কিংবা তাদের পরিবারের কারোর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকলেও আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কয়েক কোটি টাকা জমা হতো এবং আমি সেই টাকা দিয়ে একটি অ্যাগ্রো ফার্মসহ স্বয়ংক্রিয় দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারতাম। আমার স্বপ্নের ইচ্ছা পূরণ হতো। এবং আমাদের দেশের দুগ্ধজাত খাদ্যের ঘাটতি পূরণে বিশেষ অবদান রাখতে পারতাম। এমনকি ওই উন্নয়নের জন্য সরকারপ্রধানের কাছ থেকে সোনার মেডেলও আমার গলায় ঝুলিয়ে পাড়ায় পাড়ায়, ঘরে ঘরে বলতে পারতাম, কবিতা শিল্প আমাদের যা দিতে পারেনি, কোনোদিন যা পারবেও না, তাই দিয়েছে অবৈধ উৎসের টাকায় গড়ে তোলা এই সবুজ ফার্ম।

না, স্বপ্ন কখনো সত্য হয় না সবার জন্য। কারো কারো জন্য হয়তো হয়।

এটি একটিমাত্র ঘটনা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আরো তো অনেক কর্মকর্তা আছেন, তারা সবাই কি আবুর মতো অর্থসন্ত্রাসী? যিনি বা যারা ঘুষের টাকা নিয়ে সরকারকে ঠকিয়ে অবৈধ অর্থ উপার্জন করে তারা কেবল সন্ত্রাসীই নয়, সরকারি কর্মকর্তার পদ ব্যবহার করে জাতিকেও ফাঁকি দিচ্ছেন। না, কেবল আবু মাহমুদ ফয়সালই নন, ছাগলকাণ্ডের সেই ছেলেটির বাবা এনবিআরের একজন সদস্যও তো কোটি কোটি টাকা অবৈধপথে রোজগার করেছেন। দেশের পত্রপত্রিকা আর সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে এসব কাণ্ড পড়ে আমাদের মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়।

পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীরের একটি বক্তব্য শুনে সেই তখনই কেঁপে উঠেছিলাম। তিনি রাজনৈতিক ব্যক্তির মতো বলছিলেন- এই সরকারের বিরুদ্ধে যারা কথা বলবে, তাদের একটা একটা করে পাতাল থেকে হলেও ধরে আনা হবে।

তিনি তখন আইজিপি। তাই লিখতে পারিনি। এবং কেউই লিখতে পারেননি। লিখলে কী হতো? যারা পলিটিক্যাল মানুষ, যারা গুম হয়ে গেছেন, যারা খুন হয়েছেন, আয়না ঘরের শিকার হয়েছেন, তারা জানেন কী ঘটতে পারত।

ডক্টোরাল প্রোগ্রামটি যে ছুটিতে না গিয়েও করা যায় সরকারি বা পুলিশের বা র‌্যাবের কোনো কর্মকর্তার পক্ষে, বেনজীর আহমেদ সেটা প্রমাণ করেছেন। আর যে অধ্যাপক তার গাইড ছিলেন, তিনিও যে অধঃপতিত একজন, তা প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না। দলজীবীদের এই এক সমস্যা, নিজ দলের বা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেই তাদের লোভের জিহ্বা বেরিয়ে আসে।

ড. বেনজীর আহমেদ এখন পলাতক। তিনি সপরিবারে বিদেশে গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। তিনি কি লুকিয়ে আছেন দুবাইয়ে? কিংবা আমেরিকার কোনো বড় শহরে। আরাভ খান নামের যে স্বর্ণ ব্যবসায়ী দুবাইতে বিশাল দোকান উদ্বোধন করেছিলেন স্টার-সুপার স্টারদের দিয়ে, তার অর্থের উৎস হিসেবে বলা হয়েছিল বেনজীরের নাম। বেনজীর অস্বীকার করেছিলেন এই বলে যে তিনি তাকে চেনেন না। কিন্তু তার তো চেনারই কথা। কারণ ক্রাইম ওয়ার্ল্ডের এ রকম এক তরুণ হোমড়াকে না চিনলে আইজিকে যোগ্য বিবেচনা করা যাবে? তার পক্ষে না চেনাই অস্বাভাবিক। তিনি তো কেবল পুলিশ প্রশাসন নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন না, সরকারের রাজনৈতিক সহচর হিসেবেও অবদান রাখতে হতো তাকে।

তো, এই বেনজীরের নাকি শত শত কোটি টাকা। র‌্যাব-পুলিশ মিলিয়ে তার তো আয়ের অঙ্কটা বড়ই হওয়ার কথা। মানলাম তিনি ঘুষ খাননি, টাকাগুলো এমনি এমনি, মানে হাঁটতে হাঁটতেই বেনজীরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢুকে গেছে। বেনজীর লাপাত্তা। তিনি কোন দেশে লুকিয়ে আছেন, কেউ বলতে পারবেন না। এমনকি পুলিশের গোয়েন্দা শাখার লোকরাও জানেন না। তারা জানবেন কেমন করে? নিজেদের বস কী করে ঘুষ খায় সেই তথ্যই তো তাদের কাছে নেই। সেটা থাকার কথাও নয়। কারণ তাদের শেখানো হয়েছে তোমরা হলে প্রশাসক। চোর-ডাকাতদের ত্রাস, পড়ুন রক্ষক। সাধারণ জনের ত্রাস। এ জন্যই তো লোকমুখে শুনেছি, বাঘে ছুঁলে ১০ ঘা আর পুলিশে ছুঁলে ৪০ ঘা। পুলিশ দেখলেই মানুষ মুখ কাচুমাছু করে থাকে। তাই দেখে পুলিশ ভাবে, বেটা এক ডাহা চোর। না হলে তাকে ভয় পাবে কেন? সে তো সাধারণ মানুষের সেবাদাতা, আইনের লোক। আইনের লোককে কি কেউ ভয় পায়? কিন্তু সাধারণ মানুষ জানে এই আইন প্রয়োগকারীরা যে কতটা দুর্ধর্ষ চরিত্রের অধিকারী। ওই যে আইজি থাকার সময় বেনজীর বলেছিলেন, মাটির নিচ থেকে, মতান্তরে পাতাল থেকে হলেও সরকারবিরোধীদের তিনি ধরে আনবেন। তা তিনি করেছেন তার ক্ষমতাকালে। এখন তিনিই পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশকেই তার বড্ড ভয়। কখন না জানি দুর্নীতির দায়ে তাকে আটক করে। তাই তো মাত্র ১৪টি পাসপোর্টের মাধ্যমে দেশের বাইরে চলে গেছেন। কিন্তু যারা পাসপোর্ট তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন তাকে, তারা তো ধরাছোঁয়ার বাইরে নন। দুদকের উচিত সেই সব সহযোগীর তালিকা প্রকাশ করে দেয়া, তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ কাজ করার জন্য আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং আইনের মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা। এটা করা হলে অবৈধ কাজে কেউ সাহায্য করবে না আর। জেলের ভয় সবারই আছে। কেবল বেনজীরদের নেই। কারণ তিনি এবং যাদের সেবা দিয়েছেন, তারা তাকে ও তাদের রক্ষা করবেন, করবেনই। এই বিশ্বাস এখন টুটে গেছে, বেনজীর তা বুঝে গেছেন। কিন্তু সহযোগীরা এখনো বুঝেননি। তারা ভাবছেন, কয়জনকে সরকার ধরবে? শত শত অবৈধ অন্যায়কারী, বেআইনি কাজের হোতা তো সরকারের দপ্তরেই আছে, তাদের ধরলে লোম বাছতে কম্বল উজাড় হয়ে যাবেন। এ জন্যই হয়তো সরকারপ্রধান হুমকি হয়েই ক্ষান্ত হন। এর আগে তিনি ক্যাসিনো শিল্পের অধিকারীদের সাম্রাজ্য তছনছ করে দিয়েছেন। তাদের জেলে পুরেছেন, এখন আইনের ফাঁক দিয়ে নাকি পুলিশি সহযোগিতায় বেরিয়ে আসছেন, তা আমরা বুঝতে পারছি না। ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা ঘুষের বিনিময়ে বেনামি শিল্পপতি ও সুনামি শিল্পপতিদের ঋণ দিয়েছেন ফেক কাগজের ওপর নিজেদের সিল-ছাপ্পর দিয়ে, যারা ইতোমধ্যেই খেলাপি হয়েছেন, কিছু অবলোপন করেও তাদের মুক্তি দিয়েছেন, কিছু শিল্পপতি সরকারের তরফে আবেদন করেছেন ঋণের সুদ ও সুদাসল ঋণ মওকুফ করে দেয়ার জন্য। এর মধ্যেই তিনটি ব্যাংক তাদের ঋণী গ্রাহককে হাজার হাজার কোটি টাকা মওকুফও করে দিয়েছে। এই ব্যাংকিং খেলাটা সবাই জানেন, কিন্তু আপনি-আমি ঋণ পাব না এবং ঋণ নিয়ে খেলাপি হলে আমাদের জেলেই যেতে হবে... এসব ক্ষমতাবান সরকারি লোক, সরকারের আমলা ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া উচিত। কাজটা বড়ই কঠিন। এর জন্য সরকারের অর্থমন্ত্রীর পারমিশন নিতে হবে। নিতে হবে সরকারপ্রধানের অনুমতিও, কেননা শেষ পর্যন্ত তারই ইশারায় তো কাজ হওয়ার কথা। তার অঙুলি নির্দেশ ছাড়া অর্থমন্ত্রী অচল দোআনি। আর ব্যাংকগুলো তো সরকারি দলের নেতা আর এমপি সাহেবদের কাছে জি-হুজুর হয়ে থাকে। না, আমরা কুয়ার ব্যাঙ, জাহাজের খবর না রাখলেও চলে। কিন্তু কথাটা হচ্ছে, জনগণের অর্থ বলে কথা। সরকারের সব অর্থই তো জনগণের, আর বৃহত্তর অর্থে ব্যাংকগুলোর অর্থও জনগণেরই। জনগণের রাখা আমানতই হোক বা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থই হোক, মালিক ওই জনগণ। তাদের ধোঁকা দেয়া সহজ। নিত্যই তারা রাজনীতিকদের, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের ধোঁকা খেয়ে হজম করে চলেছেন।

বেনজীরের কথা বললাম, আসাদুজ্জামান মিয়ার কথা তো বলা হলো না। তিনিও গা-ঢাকা দিয়েছেন। গা-ঢাকা মানে তো অন্য দেশে মালামাল সমেত পাড়ি দিয়েছেন। কেবল বেনজীর, আসাদুজ্জামানই নন, পুলিশের ওসি থেকে ওপরের দিকের আরো শত শত কর্মকর্তা আছেন যারা অবৈধ মাল খেয়ে টাল হয়ে আছেন। তারাও নানা ছলছুঁতায় পালাতে চেষ্টা করছেন।

এই যে ঘুষ-বাণিজ্য, এটি একটি সরকারি খেলা। এই সরকারি খেলায় আমরা কম-বেশি সবাই জড়িত। আমরা যদি প্রতিবাদ না করে চুপচাপ থাকি, তাহলে বুঝব আমরা জড়িত। পেশার কাজের আমাদের সঙ্গেও তো অনেক পুলিশ, র‌্যাবের কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ আছে, বন্ধুত্ব আছে, কিন্তু লেনদেন আছে এমন কথা শুনেছি। অনেক সাংবাদিক নাকি গাড়ি-বাড়ি করেছেন ওদেরই দেয়া টাকায়। অনেক সাংবাদিকও যে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, চোখের সামনেই দেখতে পেলাম। সাংবাদিক নেতাদের গাড়ি হয় কী করে, তা পোষেন কী করে, আমার মাথায় আসে না। নিশ্চয় দুই নম্বরি করে তারা চলেন। নিজেদের দোষ যদি না দেখি, তাহলে বেনজীরের মতো রাঘববোয়ালের দুর্নীতি আমরা টেরও পাব না। না, আমাদের সাংবাদিক বন্ধুরা ওই বোয়ালের তেলতেলে তলপেটটি দেখতে পাননি। কিংবা ভয়ে তিনি বা তারা বেনজীরের বিরুদ্ধে কিছু লেখেননি। ধরা যাক এনবিআরের সদস্য বা আবু মাহমুদের মতো প্রথম সচিবের মতো এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও তো তিনি বা তারা রিপোর্ট করেননি। দুদক খুঁজে পাওয়ার পর এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ও পত্রিকায় তাদের বিরুদ্ধে বিশাল বিশাল রিপোর্ট বেরুচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তাদের নৈতিকতা নিয়ে আমরা লিখি, তারা কি আমাদের নৈতিকতা নিয়ে লিখতে পারেন? লিখতে পারেন না। লিখলেও তা কি পত্রিকাগুলো ছাপবে? নীতিগতভাবে যে সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, র‌্যাব, কাস্টমস, কর খাত, ব্যাংক খাত, কাঁচাবাজারের নিয়ন্ত্রক খাত, রাজনীতিক খাত, বুদ্ধিবৃত্তিক দলদাস খাত, শিক্ষা খাত, শিশু খাত, সড়ক খাত নৌ-খাত, সাগর খাত, নদী খাত, কৃষি খাত এবং আরো যত খাত আছে, অখাত আছে... সর্বত্রই এক দুর্নীতি রাহুর মতো গ্রাস করছে। এসব দুর্নীতির মাতৃভূমির নাম হচ্ছে রাজনীতি।

ড. মাহবুব হাসান : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App