×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

কোটা, নাকি কোটা না

Icon

স্বপ্না রেজা

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কোটা, নাকি কোটা না

কোটা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আবার শুরু হয়েছে। ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের তুমুল আন্দোলনের মুখে সরকার একটি পরিপত্র জারি করে যেখানে কোটা সংস্কার তথা কোটায় পরিবর্তন আনা হয়। সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট আগের কোটা বহাল রাখার পক্ষে রায় দেন। যে কোটা পদ্ধতিতে বিবেচনায় রাখা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা উত্তরসূরি, নৃ-গোষ্ঠী, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী; যেমন- প্রতিবন্ধী, নারী বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তিকে এবং সেটা লক্ষণীয় হারে। আজ কোটা বিষয়ে কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করছি এবং এই বলাটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত একজন সচেতন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে। প্রথমেই আসি মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল ১৯৭১-এ এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ দিয়েছেন, লাখ লাখ নারী তার সম্ভ্রম হারিয়েছেন। অসংখ্য মানুষ হারিয়েছেন তার সর্বস্ব। ৯ মাসে নিরস্ত্র বাঙালি মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে এই দেশ স্বাধীন করেছে। সবাই যে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন, হতে পেরেছেন তা কিন্তু নয়। যিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে পারেননি, তিনি হয়তো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে, কখনোবা খেতে দিয়ে, কেউবা আবার তথ্য সরবরাহ ও সংবাদ পরিবেশন করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কেউবা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাশুশ্রƒষা করে, কেউবা আবার দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কূটনৈতিক পর্যায়ে কাজ করেছেন। পাকিস্তানি বর্বরতার মুখেও যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য গোপন করেছেন, তাদের সন্ধান দেননি তারাও একেকজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। এমনকি যিনি দেশটার শত্রæমুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন, তিনিও। অর্থাৎ তৎকালীন দেশের মুক্তিকামী প্রতিটি ব্যক্তিই ছিলেন এক একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সেটা বিভিন্ন কৌশলে, উপায়ে। এটা না বললেই নয় যে, সব মুক্তিযোদ্ধার কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেই। কারণ সব মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সনদ গ্রহণ করেননি। তাদের যুক্তি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন দেশকে স্বাধীন করার জন্য, সনদ গ্রহণ বা ব্যক্তিগত সুবিধাপ্রাপ্তির জন্য নয়। এমন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কিন্তু কম নয়। গণনা করলে এর সংখ্যা বড় হবে বৈকি। গ্রামগঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে, নিম্ন আয়ের মানুষের লোকালয়ে, বস্তিতে এমন অনেকজনের সন্ধান ও সাক্ষাৎ মিলেছে, যারা মুক্তিযুদ্ধকে চেতনায় ধারণ করে চলেছেন সুরক্ষিত স্মৃতিতে, যেখানে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল কোনো না কোনোভাবে। অথচ তারা তালিকাভুক্ত হননি। স্বাধীন একটি দেশের নাগরিক হিসেবে তারা সম্মান চেয়েছেন, মর্যাদা চেয়েছেন, অধিকার চেয়েছেন।

যা হোক, বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা, সম্মান ও সুবিধা দেয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হয়েছে এবং তালিকা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদর্শন করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। যদিও মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা নিয়ে বহুবার বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৩ বছর পরও সঠিক তালিকা প্রণয়ন হয়নি বলে প্রায়ই অভিযোগ ওঠে। দেখা গেছে, বিএনপি সরকার আমলে অনেক রাজাকারের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় এসেছে। অর্থাৎ অনেক রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা সেজেছে, বনে গেছে। আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামী সরকার আমলে কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধার নাম ঠাঁই পেয়েছে রাজাকারের তালিকায়, আবার রাজাকারের নাম ঠাঁই পেয়েছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। যে যেভাবে পেরেছে তালিকাভুক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেছে। এমনও গল্প আছে যে, ১৯৭১ সালে একেবারেই শিশু, তারও রয়েছে একখান মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট এবং সেটা হয়েছে রাজনীতির অপসংস্কৃতিতে। এসবের ফলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বেশ সংশয় রয়েই যায়। কারো কারোর মতে, দেশে অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আছে যারা সার্টিফিকেটের বদৌলতে অনেক সুবিধাভোগ করছে। এরা প্রকৃত অর্থে প্রাদেশিক চেতনার মানুষ। দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য এরা গোপনে অনেকাংশে দায়ী থাকছে, ধরা দিচ্ছে না। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে এই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা মিলেমিশে একাকার। অনেকে মনে করেন, এদের চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ প্রয়োজনে এরা রাজনৈতিক পোশাকও বদলে চলে, চলেছে। বিভিন্ন কৌশলে দেশের সব সুবিধা ভোগ করতে এরা তৎপর থাকছে। আর এদের উত্তরসূরিরা সেই সুবিধা ভোগের দাবিদার হয়ে উঠছে, সুবিধাও ভোগ করছে। অংশীদার হয়ে পড়ছে। যে দেশে যথাযথ ও সঠিকভাবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরি করা সম্ভব হলো না, সেখানে সর্বক্ষেত্রে লাগাতারভাবে সুবিধা প্রদান কতটা যুক্তিযুক্ত, বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে, এমন প্রশ্ন একজন দেশপ্রেমিক প্রবীণের।

দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৩ বছর। সাধারণ হিসাবে মুক্তিযোদ্ধাদের এখন বয়স ৬৮ কিংবা ৭০ ছুঁয়ে গেছে। কারোর হয়তো আরো বেশি। তাদের সন্তানদের বয়সও ধারণা করা যায় আনুমানিক ৪০ ছাড়িয়ে গেছে। নিশ্চিত যে, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট প্রাপ্তদের সন্তানরা সুবিধা ভোগ করেছে এবং সেটা বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে সবখানে তারা পেয়ে আসছে অগ্রাধিকার। একজন ছাত্র প্রশ্ন করলেন, এখন কি তাদের নাতি-নাতনিরা কোটা সুবিধা ভোগ করবে, তাহলে আমার মেধার মূল্য কোথায় পাব? একটা চ্যানেলের সংবাদে দেখলাম একজন ছাত্র ক্ষোভ নিয়ে বলছেন, দেশটাতো স্বাধীন হয়েছে বৈষম্য দূর করার জন্য, সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। সংবিধানেও আছে সেই কথা। তাহলে কেন সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা এসে সেই সংবিধান লঙ্ঘন করবে? বৈষম্যের দিকে আগামী প্রজন্মকে ঠেলে দেবে? এমনকি একজন বয়স্ক রিকশাচালক বলছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি অস্ত্র হাতে নিই নাই। কিন্তু এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে গজ, ব্যান্ডেজ, ওষুধ পৌঁছায়ে দিছি। আমার কোনো সার্টিফিকেট নাই। পোলাটারে পড়ালেখা করাইতেছি যেন মানুষ হয়। একটা ভালো চাকরি জোটে তার কপালে। আমি তো সারা জীবন রিকশা চালায়ে গেলাম। প্রত্যেকের প্রতিক্রিয়া অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়। ফেলে দেয়া যায় না বলে অনেকেই মনে করছেন। আবার নারীরা কিন্তু নিজ যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন সেক্টরে। নারীরা যে কেবল সরকারি চাকরিতেই ঢুকছেন, তা কিন্তু নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, করপোরেট কোম্পানি, চিকিৎসা শাস্ত্র, প্রকৌশল বিজ্ঞান, পর্বত আরোহণ, খেলাধুলা, রাজনীতি কোথাও কিন্তু নারীরা বিশেষ বিবেচনায় অংশগ্রহণ করছেন না। নিজেদের মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা বলে নারীরা বিচরণ করছেন দাপটে, মর্যাদার সঙ্গে। দেশের যে উন্নয়ন ধারা তাতে নারীর সফল অংশগ্রহণ সর্বজনস্বীকৃত। সেই নারীকে কেন কোটা পদ্ধতিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পেতে হবে- এমন প্রশ্নও নারী, পুরুষ, সবারই। আর সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ব্যবস্থা যদি পক্ষপাতদুষ্ট না হয়, তাহলে নৃ-গোষ্ঠীর সন্তানরাও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারবে বলে অনেকেরই বিশ্বাস। তবে দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য জায়গা করে দেয়া দরকার। সেটা শুধু সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নয়, বরং সর্বত্রই।

সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের শিক্ষার্থীদের দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত, ভেবে দেখা দরকার বলে অনেকেই মনে করছেন। তারা মনে করছেন, আধুনিক বিশ্বে মেধার কোনো বিকল্প নেই। যার মেধা নেই, সেও কিন্তু আধুনিক বিশ্বের সব সুবিধা ভোগ করে কথাটা বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়, হচ্ছে। আর সরকার হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান, যে প্রতিষ্ঠান দেশ পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা রাখে। রাষ্ট্রের এই সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠানে মেধাসম্পন্ন, যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তির নিয়োগ জরুরি হয়ে পড়ে। গুরুদায়িত্ব পালনের বিধান থাকায় সরকারি চাকরিতে সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত থাকে, থাকে সন্তুষ্টি ও আর্থসামাজিক নিরাপত্তা, মর্যাদা। ফলে সরকারি চাকরি কমবেশি সবার কাছেই কাক্সিক্ষত হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রস্তুত করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের।

বাংলাদেশ উন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখছে, তার জন্য কী প্রয়োজন- মেধা নাকি কোটা, একজন অভিভাবকের প্রশ্ন। আর সরকারের কাছে এমন কোনো পরিসংখ্যান বা গবেষণা আছে কিনা যে, প্রতি বছর কতজন মেধাবী শিক্ষার্থী বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে, আর কেনই বা পাড়ি দিচ্ছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, মেধার মূল্যায়ন ও মর্যাদা প্রাপ্তির আশায় অধিকাংশ মেধাবী আর দেশে ফেরে না, ফিরতে চায় না। সরকারি চাকরির প্রতি কারো কারোর অনাগ্রহতাও দেখা যায় সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি পর্যবেক্ষণ করে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকা ঘুষ প্রদানের কেচ্ছাকাহিনি তো রয়েছেই।

পরিশেষে বলব, মেধাকে অগ্রাধিকার দেয়া কেন দরকার, সেটা বিশ্লেষণ করে দেখা জরুরি। আজ যে শিশুটি তার মেধা ও প্রতিভার জন্য পুরস্কৃত হচ্ছে, সে আগামীতে তার মেধার জন্য কীভাবে পুরস্কৃত হবে, সে কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করবে এবং সেটা কোনো লক্ষ্যবস্তুকে সামনে রেখে, তার পরিকল্পনা তো এখনই নিতে হবে। মহামান্য আদালত এবং সরকার ভেবে দেখতে পারে।

স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App