×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

কোটা প্রথার সমাধান কী?

Icon

মাইফুল জামান ঝুমু

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কোটার বিষয়টি আজকে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর নির্বাহী আদেশে কোটা পদ্ধতি চালু হয়। ১৯৭৬ সালে সরকারি চাকরিতে ২০ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে এবং বাকি সব পদ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ করা হতো। ১৯৭৬ সালে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ৪০ শতাংশে বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে মেধার নিয়োগের হার আরো বাড়ানো হয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা প্রথা চালু ছিল, যার মধ্যে ৩০ শতাংশই ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটা। যার অন্তর্ভুক্ত ছিল মুক্তিযোদ্ধা, তার সন্তান ও নাতি-নাতনি। ওই সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা আন্দোলনে নামে। যার ফলে সরকার ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে। আর ৫ বছর পর ২০২৪ সালের ৫ জুন এই কোটা বাতিলের পরিপত্রকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে।

এখন কথা হচ্ছে, সরকারি চাকরিতে কোটার ব্যাপারটি মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের সন্তান-সন্তুতি পর্যন্তই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও সরকারি ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মকে ৩০ শতাংশ কোটা সুবিধা দেয়া মানে জাতির একটি মেধাবী অংশকে বৈষম্যের দিকে ঠেলে দেয়া। একজন কোটাধারী মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটার মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি চাকরিতে সুযোগ পাচ্ছে। আবার কয়েক বছর পর একই কোটায় তার পরবর্তী প্রজন্মও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহার করে আবার সরকারি চাকরিতেও কোটার সুবিধা খুঁজবে, তাহলে সাধারণ মানুষের মেধাবিকাশের সুযোগ কোথায় রইল?

কোটানীতি বহাল করা হয় সাধারণত একটি রাষ্ট্রের অনগ্রসর জাতির জন্য। কিন্তু আমাদের দেশের মুক্তিযোদ্ধারা যদি অনগ্রসর গোষ্ঠী হয়েই থাকে, তাহলে প্রতি বছর সরকারের দেয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা কোথায় যায়? প্রতি বছর কোটা সুবিধা ছাড়াও সরকার কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান সুবিধাসহ মোট ২২টি সুবিধা পেয়ে থাকে। যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের সদস্যদের সরকার কর্তৃক রেশন হিসেবে মাসে ৩৫ কেজি চাল, ৩০ কেজি আটা, ৫ কেজি চিনি, ৮ লিটার ভোজ্যতেল, ৮ কেজি ডাল দেয়া হয়। প্রতি বছর দুই ঈদের বোনাসসহ জাতীয় দিবসগুলোতে তাদের প্রীতিভোজের খরচও সরকার দিয়ে থাকে। প্রয়োজনে তাদের এ ধরনের সুবিধা আরো বাড়ানো হোক। কিন্তু সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার তৃতীয় প্রজন্মকে ৩০ শতাংশ কোটা সুবিধা দেয়া মানে বাকি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা।

জনসংখ্যার একটি সূ² অংশ স্বল্প যোগ্যতা নিয়েও বছরের পর বছর সব ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়ে যাক, আরেকটি স্থূল অংশ উপযুক্ত যোগ্যতা নিয়ে সুবিধাভোগীদের ভিড়ে চাকরির দরজা থেকে দূরে সরে বেকারত্বের জাঁতাকলে পিষ্ঠ হোক এটা তো মানা যায় না!

প্রতি বছর যে শিক্ষার্থীরা শহীদদের বিনম্র শ্রদ্ধা দিতে পালন করে আসছে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, আজকে কোটার মতো বৈষম্যবিরোধী প্রথা তাদের অন্তরে সৃষ্টি করতে যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। এই কোটা বৈষম্য প্রথা আজ শিক্ষাব্যবস্থাকে অচল করে দিচ্ছে। আজ সামাজিক মাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বাংলার সড়ক জনপদ সবাই কোটার বিরুদ্ধে কথা বলছে। ‘শিক্ষায় আলো’ সেøাগান এখন রূপ নিয়েছে ‘কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’, সেøাগানে। অথচ এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো সমাধান টানছে না। তাদের এ চুপ থাকা দেশের রাজনৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তাই কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কোটা ব্যবস্থার লাগাম টেনে ধরে দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

মাইফুল জামান ঝুমু : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App