×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়ে কিছু কথা

Icon

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়ে কিছু কথা

সমস্যাটি শুধু চট্টগ্রামের নয়। ঢাকা, সিলেটসহ ক্রমবর্ধমান প্রতিটি নগরের। জলাবদ্ধতার জন্য চট্টগ্রামের যে কারণগুলোকে চিহ্নিত করছি কমবেশি সব কারণই বিদ্যমান নগরগুলোতে। সিলেট শহরে শত শত পরিবার জলাবদ্ধতার জন্য এ বছর নির্দিষ্ট দিনে কুরবানিও দিতে পারেনি।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতাটির কথা নিশ্চয়ই পাঠকদের মনে আছে। রাজার সভাসদ মন্ত্রী-যন্ত্রী আর রাজ্যের তাবৎ বাঘা বাঘা ব্যক্তিরা যখন একে একে গলদঘর্ম হচ্ছেন তখন একজন সাধারণ মুচি এসে বললেন, রাজার পা দুটো চামড়া দিয়ে ঢেকে দিলেই লেঠা চুকে যায়। পৃথিবীকে চামড়ায় মুড়িয়ে দেয়ার দরকার নেই। জুতা আবিষ্কার হলো এভাবে। কবিতাটি রূপক, জুতা কোম্পানিরা মাইন্ড করবেন না দয়া করে।

নিশ্চয়ই মনে আছে সুকুমার রায়ের ষোল আনাই মিছে ছড়াটি। বিদ্যে বোঝাই বাবু মশাই নৌকায় চেপে যেতে যেতে মাঝিকে নানা প্রশ্নে নাজেহাল করতে করতে যায়। এক সময় নদীতে ঝড় ওঠে। মাঝি বলে, বাবু সাঁতার জান? বাবু বলে- না। মাঝি বলে- বাঁচলে শেষে আমার কথা হিসাব করো পিছে, তোমার দেখি জীবনখানা ষোল আনাই মিছে। অর্থাৎ শহরের এই বাবু সূর্য কেন ওঠে জোয়ার কেন আসে, নদীর ধারা পাহাড় থেকে কী করে নামে, আকাশ কেন নীল এমন জটিল বিষয় জানে; কিন্তু জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে সাঁতার জানে না। এ দুটি লেখা দুজন বিখ্যাত বাঙালির। তারা দুজন বাঙালির নমস্য। এদের লেখায় বাঙালি চরিত্রের একটি দিক খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আর তা হলো আমাদের জ্ঞানের শিক্ষার এবং জানার দৈন্য, অর্থাৎ আমাদের অন্তসারশূন্যতা। আমরা জানি না, জানার ভান করি। আমরা পড়ি না, পড়ার ভান করি। আমরা অভিজ্ঞ নই, অথচ বিশেষজ্ঞের ভান করি। আমরা যোগ্য নই, অথচ সুযোগ্যের ভান করি।

বন্যায় শহর-গ্রাম ডুবে যাওয়ার চিত্র দেখতে দেখতে, মানুষের কষ্ট প্রত্যক্ষ করতে করতে, তাদের ক্রন্দন শুনতে শুনতে ও কথাগুলোই বারবার মনে আসছিল। তার কারণ শহরেতো বটেই গ্রামেও জলাবদ্ধতা বা বন্যার কারণ, এর প্রতিকার ও উদ্যোগ দেখতে দেখতে এমন কথা ভাবা ছাড়া উপায় নেই।

প্রথমে চট্টগ্রাম শহরের কথায় আসি। অন্তত ৩০ বছর ধরে চট্টগ্রামের দুঃখ বলে অভিহিত চাক্তাই খাল নিয়ে অনেক পরিকল্পনা দেখছি। অনেক অর্থ বরাদ্দ এবং তা হরিলুটের দৃশ্যও দেখছি। দেখছি কীভাবে খালগুলো মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। খালগুলো নালায় পরিণত হচ্ছে আর নালাগুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দেখছি মানবসৃষ্ট এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধারের জন্য সরকারি উদ্যোগ, বিশেষজ্ঞদের মতামত, ক্ষমতাসীনদের দৌড়ঝাঁপ আর জনগণের টাকার অপচয়। এ পর্যন্ত কত বিশেষজ্ঞ এলেন আর গেলেন, কত পরিকল্পনা প্রণীত হলো আর পরিত্যক্ত হলো, কত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলো আর ব্যর্থ হলো। কত শত কোটি টাকা অপচয় হলো, ভাগাভাগি হলো; কিন্তু চট্টগ্রামের দুঃখ চাক্তাই খাল আগের অবস্থায় ফিরে এলো না, দখল ও দূষণমুক্ত হলো না। ফিরে পেল না তার ধারণ সক্ষমতা। ডান পাড়ের মাটি তুলে বাম পাড়ে জমা করা হলো। বর্ষা বা বৃষ্টিতে তা আবার খালে নেমে এলো। খালের তলদেশ পাকা করার নামে কোটি কোটি টাকা শ্রাদ্ধ করা হলো, কিন্তু খালের প্রকৃত সংস্কার কিছুই হলো না।

সবাই জলাবদ্ধতা দূরীকরণের প্রতিশ্রæতি দেন, কিন্তু কার্যত সফল হন না। কর্তা বদল হন। তার সঙ্গে কিছু পরিকল্পনা বদল হয়। অর্থ বরাদ্দ হয়, কিন্তু বাস্তবে কোনো সুফল পায় না নগরবাসী।

‘চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা কেন হয় তার প্রতিকারের উপায় কী’ আমার ধারণা এই ধরনের বিষয় নিয়ে অন্তত হাজারখানেক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গোলটেবিল, উন্মুক্ত আলোচনা, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত প্রদান ইত্যাদি সম্পন্ন হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শহরের অন্তত অর্ধেক জায়গা বছরের সাত থেকে আট মাস জলাবদ্ধতা ও জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়। আধঘণ্টার বৃষ্টিতে পানিবন্দি হয়ে পড়ছে শহরের অধিকাংশ এলাকা। এই সমস্যা উত্তরণের জন্য সম্প্রতি মেগা প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ অর্ধেকের বেশি শেষ হয়েছে। এই কাজের দায়িত্বে আছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় তারা প্রকল্পের কাজ শেষ করবে। তৎকালীন সিডিএর চেয়ারম্যান আব্দুচ ছালাম বলেছিলেন, চাক্তাই খালের মুখে সøুইস গেট নির্মাণ করলে নগরে আর জলাবদ্ধতা হবে না। আমি তার এ ধরনের জ্ঞানে হতবাক হয়েছিলাম। কী করে এবং কাদের পরামর্শে সিডিএ খালের মুখে সøুইস গেট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জানি না। এই সøুইস গেট পুরোপুরি চালু হলে চাক্তাই খালের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়া হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

নদীর মুখে সøুইস গেট দেয়া একটি পশ্চিমা ধারণা ও পরিকল্পনা। বাংলাদেশে গত শতকের সত্তর দশকের শেষ দিকে জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচির সঙ্গে এর প্রচলন শুরু হয়। রাতারাতি অনেক নদী ও খালের মোহনায় গড়ে তোলা হয় সøুইস গেট। সারাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া সøুইস গেটের কারণে উজানে নদী বা খালটি ভরাট হতে হতে মৃত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের নদ-নদীর গতি-প্রকৃতি, এ দেশের জলবায়ু এ দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সøুইস গেটের পরিকল্পনা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সøুইস গেট দেয়ার পর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে, পলিপ্রবণ নদীগুলোতে পলি জমতে জমতে এখন ভরাট হয়ে গেছে। অর্থাৎ সøুইস গেট পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য যথার্থ নয়, এর ফলে পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। নদীগুলো মরে গেছে। উপকারের পরিবর্তে সøুইস গেট আমাদের অপকারই করেছে বেশি। সেই সøুইস গেট কীভাবে, কেন-কাদের পরামর্শে চাক্তাই খালের মুখে বসানো হবে তা জানার অধিকার আছে নগরবাসীর। চাক্তাই খাল তথা নগরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে এই সøুইস গেট কী অবদান রাখবে, কীভাবে রাখবে তা পরিষ্কার নয় জনগণের কাছে। কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নগরের মহেশখালে সøুইস গেট নির্মাণ করেছিল। এর প্রভাবে মহেশখাল কীভাবে ভরাট হয়ে গেছে এবং পরিবেশকে কীভাবে বিপর্যস্ত করেছিল তা নগরবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। সøুইস গেট অকার্যকর এবং তা পরিবেশের জন্য বিপর্যয়কর বলে পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়েছে। জনমতের চাপে বাঁধ কেটে খালের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এখন একই ভুল চাক্তাই খালের বেলায়ও কেন করা হচ্ছে তা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে।

জলাবদ্ধতা কেন হচ্ছে? এর কারণ অনুসন্ধানে কোনো বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন নেই। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পন্থা বের করতেও বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন নেই। অঙ্কটি বেশ সোজা। পানিকে তার গন্তব্যে যাওয়ার রাস্তা করে দিন। সে কোথাও জমবে না। রাস্তা ডোবাবে না, কারো বাড়িঘর ডোবাবে না। নগরায়ণের ফলে জলাশয় ও নিম্নভূমি যেখানে বৃষ্টির পানি জমে থাকার সুযোগ ছিল, তা ভরাট করে দালানকোটা তৈরি হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি জমার ক্ষেত্র সংকীর্ণ হয়েছে। নগরায়ণের ফলে সড়ক প্রশস্ত হয়েছে, খাল ও নালার ওপর সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি হয়েছে, ফলে খাল ও নালাগুলো ভরাট ও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। বক্স কালভার্ট করে খালগুলোকে মেরে ফেলা হয়েছে। খালের দুই পাশে অবৈধ দখলকারীরা স্থাপনা নির্মাণ করে খালকে সরু করে তুলেছে। অর্থাৎ নগরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু পানি চলাচলের পথ দিন দিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতম হয়েছে। সড়ক বড় করা হবে তার সঙ্গে নালা বড় হবে না, ইমারত বানাবেন খালের জায়গা ছাড়বেন না তো সে পানি যাবে কোথায়। তারতো যাওয়ার রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে। সড়কে যানজট না হওয়ার জন্য ট্রাফিক সিগন্যাল বসাবেন, কনস্টেবল-সার্জেন্ট নিয়োগ দেবেন আর পানি চলাচলের জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখবেন না। তা কী করে হয়। সড়কে ময়লা পড়লে তা পরিষ্কার করবেন, দোকানদার বসলে তাদের তাড়াবেন আর পানি চলাচলের পথে অন্তরায় সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকবেন, তাতে পানি না জমে কি শরবত জমবে?

দখল-দূষণের পরও বর্তমানে যে খাল ও নালাগুলো আছে তা শুধু পরিষ্কার রাখলেও জলজট ৫০ শতাংশের বেশি কমে যেত। একটি নালা বা খালও নেই শহরে যেটি পরিষ্কার আছে এবং তার ধারণক্ষমতার সদ্ব্যবহার হয়। সবক’টি নালা ও খাল বিভিন্ন বর্জ্যে ভরাট হয়ে আছে। শুধু এই আবর্জনা তুলে খাল ও নালাগুলোর ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনলেই জলজটের সমস্যা কমে যাবে। আর এই কাজটি বর্ষার আগে আগে নিয়মিত করলে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের বেশি প্রয়োজন হতো না। খালগুলোকে আবর্জনার ভাগাড় বানিয়ে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে যারা প্রতি বছর সড়ক উঁচু করে করে আশপাশের বসবাসকারীদের বারোটা বাজিয়েছেন তাদের নির্বুদ্ধিতা বা অসৎ উদ্দেশ্যের নিন্দা না করে পারি না।

তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে এখন থেকেই নালা ও খালগুলো সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। এখনো যেটুকু আছে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার অর্থাৎ খাল ও নালার ধারণক্ষমতা পূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনতে হবে। সড়কের পানি দ্রুত নালায়, নালার পানি খালে এবং খালের পানি নদীতে নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এই পথটুকু যেতে যে প্রতিবন্ধকতা আছে তা দূর করার উদ্যোগটি আগে নিতে হবে। খাল এবং নালাগুলোকে পরিষ্কার রাখতে নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হবে। যার বাড়ির অংশের নালা ও খালে আবর্জনা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতির বদল হবে।

পুরো বিশ্বকে চামড়ায় না ঢেকে শুধু রাজার পা দুটোকে চামড়ায় ঢেকে দিয়ে ধুলা না লাগার মতো বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিন। তাতে জনগণের টাকাও বাঁচাবে, কষ্টও লাঘব হবে। পুঁথিগত বিদ্যায় সব সময় জান বাঁচে না। মাঝির মতো প্রয়োজনীয় ও জীবন রক্ষার শিক্ষাও থাকতে হবে।

কামরুল হাসান বাদল : কবি ও সাংবাদিক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App