×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

কূটনৈতিক দাবার চাল

Icon

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 কূটনৈতিক দাবার চাল

তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনবার সরকারিভাবে ভারত সফর করলেন। জি-২০ সম্মেলনে বাংলাদেশ ছিল বিশেষভাবে আমন্ত্রিত। শেখ হাসিনা নিজেই যোগদান করেছিলেন। দ্বিতীয়বার গেলেন নরেন্দ্র মোদির তৃতীয়বারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে। সর্বশেষ ছিল দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। এত অল্পদিনের ব্যবধানে পরপর তিনবার একই দেশে ভিন দেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীর সফর পৃথিবীতে একেবারেই নেই বললে অত্যুক্তি হবে না। মধুর একটি কূটনৈতিক আবহে শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নয় বরং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুবার বাংলাদেশ সফরও বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা বৈকি! দিল্লি এবং ঢাকা মৈত্রীর বিশেষ অবস্থান শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সই করার মধ্য দিয়ে। এরপর ২০১৭ সালে প্রটোকল ভেঙে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেও বাংলাদেশকে কিছুটা বাড়তি গুরুত্ব দিতে হয় ভারতকে। এত কিছুর পরও হাসিনা-মোদির পরস্পর পরস্পরের প্রতি মুখমিষ্টি সংলাপ তাৎক্ষণিকভাবে হাততালি কুড়িয়েছে ঠিকই; কিন্তু তা বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষকের সার কেনার হদিস, ঘাটতি গম পাওয়ার সম্ভাবনা, প্রয়োজনের সময় চাল-চিনি-আদা-পেঁয়াজ-মসুর ডাল-রসুন পাওয়ার নিশ্চয়তা; ঝুলে থাকা তিস্তার অমীমাংসিত পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার স্বার্থে দিল্লির প্রয়োজনীয় ভূমিকা- এসব কিছুর কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি। এখনো ঝুলে আছে ২০১১ সাল থেকে তিস্তা পানি বণ্টনের চুক্তি।

ইতোমধ্যে দুদেশের মধ্যে অবস্থিত অনেক সমস্যারই সমাধান হয়েছে। কিন্তু তিস্তা সমস্যাটি আটকে আছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আর পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকারের টানাপড়েনের মধ্যে। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে মাত্রা পেলেও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অমীমাংসিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের সমস্যা ভারত জিইয়ে রেখেছে দীর্ঘদিন ধরে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাদেশিক সরকার নিঃসন্দেহে বুঝতে পেরেছে, তিস্তা সংকটের সমাধান হলে বাংলাদেশের জনগণ অন্য ১০টি প্রাপ্তির চেয়েও বেশি খুশি হবে। তারপরও ওই একই অবস্থা প্রতি বছর। শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় তীব্র খরা, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে বাঁধ খুলে দেয়ায় ভয়াবহ বন্যাকবলিত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিস্তৃত এলাকা। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সেই মনমোহনের শাসন থেকে শুরু করে বর্তমানে নরেন্দ্র মোদির শাসনের পুরো সময়টাই আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে- তারা তিস্তা সমস্যার সমাধান চায় আন্তরিকভাবে। কিন্তু বিপত্তির জায়গাটা তাদের ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকার। হাসিনা-মমতা সম্পর্ক আপাতভাবে সব সময় মধুর হলেও তাদের এই শুকনো ভালোবাসা ইলিশ আর আমের আদান-প্রদানের হাত গলে কূটনৈতিক চিড়ে ভিজে তিস্তার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যেতে পারেনি কখনো। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য এই সফরগুলোর নেপথ্যে ছিল একটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দাবার চাল। দাবার চালটি ছিল তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি। শেখ হাসিনার পরপর তিনবার সফরের যোগফল এবার তিস্তা সমস্যা সমাধানের সুর বয়ে আনতে পারে বলে মনে হচ্ছে। কেননা শেখ হাসিনার সর্বশেষ সফরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা নিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশের এক নম্বর সমস্যা তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের প্রশ্নটি। কিন্তু এবার ভারতের নতুন সরকার ক্ষমতা লাভের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার কূটনৈতিক দাবার চালটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। প্রায় দুই দশক পর আগামী ৮ থেকে ১১ জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করতে যাচ্ছেন এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হতে যাচ্ছেন। চীন ইতোমধ্যেই ঘোষণা করেছে, তারা এ বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক সহায়তা বিশেষ করে চীন বাংলাদেশকে সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ প্রদান করার প্রস্তাব অনুমোদন করবে। চীন সফরের ঠিক আগে ভারত সফরের এমন দাবার চাল ঠিকঠাক কাজ করেছে বলেই মনে হচ্ছে। তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতীয় প্রতিনিধি দল আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- দিল্লি-ঢাকা সোনালি অধ্যায়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তিস্তার পানি সংরক্ষণে এবার বাংলাদেশে আসছে দিল্লির একটি টেকনিক্যাল দল। তিস্তার পানি সংরক্ষণ নিয়ে এই প্রথম ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গের সরকারকে পাশ কাটিয়ে একটি বড় পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। বেইজিং সফরের আগে ভারত সফরকে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগালেন মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা। কেননা ইতোমধ্যেই চীন জানিয়েছিল- তারা তিস্তা নদীর পানি সংকট ঘোচাতে জলাধার নির্মাণের জন্য বাংলাদেশকে বিপুল অর্থ সাহায্য দিতে প্রস্তুত আছে। ঠিক সে সময়েই সুযোগ বুঝে ঢাকা দিল্লির কাছ থেকে তিস্তার পানি সংকটের দীর্ঘদিনের আটকে থাকা জট ছাড়ানোর আবেদন জানিয়েছিল। ভারতের মোদি সরকারের হাতে বিকল্প কোনো উপায় ছিল না। হাসিনাকে বেইজিংমুখী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখতে তিস্তার পক্ষে বাংলাদেশকে ছাড় দেয়ার বিকল্প রাস্তা তার সামনে খোলা ছিল না। তাই তিনি মমতার রাগ-অনুরোধ সবকিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। ঠিক হয়েছে, শিগগির বাংলাদেশের রংপুরে আসবে ভারতের প্রতিনিধি দল। উপ-হাইকমিশনের একটি অফিসও চালু হবে রংপুরে। নরেন্দ্র মোদির তিস্তা নিয়ে এই একতরফা সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু মোদি যেন এবার অসহায়। সময়ের জাঁতাকলে অঞ্চলিক প্রাধান্য বজায় রাখার কৌশলের অংশ হিসেবে এবং বন্ধু-প্রতিবেশী বাংলাদেশকে আরো নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ করার উপায় হিসেবে তিস্তার পানি বণ্টনের সমস্যা সমাধান না করার কোনো বিকল্প খুঁজে পায়নি এবার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

চীন সফরের কূটনৈতিক দাবার চালে বাংলাদেশ এবার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ‘মমতার অজুহাত’ এক নিমেষেই কুপোকাত করে দিতে সক্ষম হয়েছে। তিস্তা সমস্যা সমাধানের উদ্যোগটি ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নয়নে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্রমোন্নতি দক্ষিণ এশিয়ার অনুকরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে নিঃসন্দেহে। কেননা চোখে পড়ার মতো অনেক উন্নতিই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারতীয় পণ্যের অবাধ যাতায়াত সম্ভব হয়েছে, রেল ও সড়ক যোগাযোগের পুনঃস্থাপন হয়েছে, করিডোর বিনিময় হয়েছে। বাংলাদেশের আখাউড়া-আগরতলা রেলসংযোগ প্রকল্পটি ভারতের আর্থিক সহযোগিতায় সম্পন্ন হয়েছে, খুলনা-মোংলা বন্দর রেললাইন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে, ভারতীয় কনসেশনাল ফাইন্যান্সিং স্কিমের আওতায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের অধীনে বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্লান্ট স্থাপিত হওয়ার পথে কাজ হচ্ছে। আর এখন তিস্তার কাঁটা সরে যাওয়ার কূটনৈতিক পথ আবিষ্কার হওয়ার পথ ধরেছে। সময়ের ব্যবধানে সামান্য তিস্তা নদীর পানি বণ্টন সমস্যাটি বাংলাদেশের জন্য দাঁড়িয়ে গিয়েছিল অসামান্য সমস্যা হিসেবে। বিষয়টির গুরুত্ব নরেন্দ্র মোদির কাছেও ধরা পড়েছে। তাই সে সমস্যারও সমাধান হচ্ছে আজ। যা হওয়ার কথা ছিল সেই মনমোহন শাসনের সময়ে, দেরিতে হলেও আজ সেই কূটনৈতিক বিজয় বাংলাদেশের ঘরে এনে দিতে পেরেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে দ্বিধায় আছে ভারত। সুবর্ণ সুযোগ তাই খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। দ্রুত এবং গভীর কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবেই তিনি পরপর তিনটি সফর করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে ছিনিয়ে এনেছেন তিস্তার পানি বণ্টন সমস্যার সমাধানের পথ। আশা করা যায়, এমন সফল কূটনৈতিক দাবার চালেই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন সমস্যায়ও অগ্রণী ভূমিকা আদায় করে নিতে পারবে। বাংলাদেশের জন্য ভারতের গম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং গম-চাল-চিনি-আদা-পেঁয়াজ-মসুর ডাল এসব দ্রব্যগুলোকে অপরিহার্য পণ্যের তালিকাভুক্ত করে নির্দিষ্ট পরিমাণ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখার অনুমোদন হয়তোবা এর পরের কূটনৈতিক আদান-প্রদানের অন্যতম বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়াবে।

যে কাজটি সেদিন মনমোহন সরকার করতে পারত এবং মোদি সরকার তার পূর্বের দুই সরকারের সময়কালেই করতে পারত- এবার শেখ হাসিনার বেইজিং সফরমুখে সেই কাজটিই মোদি সরকার বিশেষ যতেœ যেন করে দেখাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর অজুহাত আজ যেন ধোঁয়ায় ওড়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিক কূটনৈতিক জোর, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বেইজিং সফর- দাবার চাল যেন ঠিক সময়ে ঠিক কাজটিই করে দেখাচ্ছে।

সুধীর সাহা : কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App