×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

আমলা-অধ্যাপক দ্ব›েদ্বর খণ্ডচিত্র

Icon

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আমলা-অধ্যাপক দ্ব›েদ্বর খণ্ডচিত্র

যে আমলা এবং অধ্যাপকদের কথা বলা হয়েছে তারা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত নবসৃষ্ট রাষ্ট্র লালনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজের পছন্দে নির্বাচন করেছিলেন প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে। এটা স্পষ্ট, এই সিদ্ধান্ত তিনি আগেই নিয়েছেন। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তিনি তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁরই নামের সৃষ্ট বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১১ জানুয়ারি ১৯৭২ তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন, শপথ নেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। ১২ জানুয়ারি সকালেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একসঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম জেনে যান তিনি হচ্ছেন পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান আর অধ্যাপক রেহমান সোবহান সদস্য। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে আরো দুজন অর্থনীতির অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন এবং আনিসুর রহমানও কমিশনের সদস্য নিযুক্ত হন। কমিশনে চেয়ারম্যান মন্ত্রীর মর্যাদা লাভ করেন এবং সদস্যরা প্রতিমন্ত্রীর। আমলাদের সর্বোচ্চ যে আসন তাও সঙ্গত কারণে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নিচে।

অধ্যাপক নুরুল ইসলাম ‘তার এন অডেসি দ্য জার্নি অব মাই লাইফ’-এ লিখেছেন : রেহমান সোবহান, মোশাররফ হোসেন এবং আনিসুর রহমান ১৯৭২-এর প্রথম দিকে সদস্য হিসেবে আমার সঙ্গে কমিশনে যোগ দিলেন। রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান এবং আমি অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের দর কষাকষি নির্ধারণ নিয়ে কাজ করেছি। আর প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সেলের সদস্য হিসেবে মোশাররফ হোসেন কাজ করে আসছিলেন। তার সঙ্গে অনেক দিন ধরে আমাদের চেনাজানা কলকাতায় প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও আমাদের ক্লাসমেট ছিলেন। আনিসুর রহমান আমার সাবেক ছাত্র এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগে আমার একজন সহকর্মী।

নুরুল ইসলাম মনে করেছেন রেহমান সোবহানের দৃষ্টিভঙ্গি ব্রিটিশ লেবার পার্টি গোছের, মোশাররফ মধ্যপন্থি, তিনি নিজেও মধ্যপন্থি তবে প্রয়োগিক। রেহমান সোবহানের আশাবাদের সঙ্গে তিনি একাত্ম ছিলেন না। রেহমান সোবহান রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও প্রতিশ্রæতি নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের আশাবাদী ছিলেন। মোশাররফ চিন্তাভাবনায় তার অনেকটাই কাছাকাছি, অন্য দুজন সদস্যের সঙ্গে ডেপুটি চেয়ারম্যানের যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ছিল আনিসুর রহমানের সঙ্গে তা ছিল না। তিনি আনিসুর রহমানকে বিবেচনা করেছেন আদর্শবাদী, যার চাওয়া রাজনৈতিক নেতৃত্বে দরিদ্রের কল্যাণে নিবেদিত থাকুক, রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য অর্জনে অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো গড়ে উঠুক। তার মনে হয়েছে আনিসুর রহমান বিশ্বাস করতেন কার্যকরী ও প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে তখনকার সরকার সবচেয়ে উপযুক্ত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। প্রত্যাশিত পরিবর্তনে কার প্রত্যাশা, কী প্রত্যাশা- সেসব নির্ধারণের আগেই পরিকল্পনা কমিশন দ্ব›দ্ব ও অসন্তোষের মূল ভূখণ্ড হয়ে উঠল। একটি দ্ব›দ্ব ও অসন্তোষ নুরুল ইসলাম স্পষ্টভাবে সততার সঙ্গেই তুলে ধরেছেন :

বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য পরিকল্পনা কমিশনের সচিবের বিষয়টি তুলে আনা যায়। সচিব হিসেবে তিনি দুটি বিভাগের দায়িত্ব পালন করতেন- প্রশাসন এবং বিদেশি সহায়তা বিভাগ। ১৯৭২-এর গোড়ার দিকে সাবেক পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সদস্য প্রয়াত গোলাম রব্বানী এই পদবি অলংকৃত করেছিলেন, পরিসংখ্যান পিএইচডিসহ তিনি শিক্ষাঙ্গনে অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী। একদিন তিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন, তার চেহারায় অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে আছে। তিনি বললেন, পরিকল্পনা কমিশন ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন, কারণ মর্যাদা নিয়ে এখানে আর কাজ করতে পারছেন না। জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাস ইকোনমিক মিনিস্টার হিসেবে মনোনয়ন লাভের জন্য তিনি আবেদন করেছেন। তার মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে আমি যদি সহায়তা করি তিনি খুশি হবেন। আমি বিস্মিত হই, আমার কোনো ধারণাই নেই যে, তার হতাশা এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, তাকে অন্য চাকরি খুঁজতে হবে। এই অসন্তোষের কারণ হচ্ছে তারই ছাত্র আনিসুর রহমানের লেখাপড়ার রেকর্ড তার চেয়ে ভালো নয় এবং তার সরকারের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও নেই, এমনকি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে তিনি রব্বানীর চেয়ে উচ্চতর মর্যাদা ভোগ করছেন- প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা। এই পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা কমিশনে কাজ চালিয়ে যেতে অসম্মানিত বোধ যদি নাও করেন, অস্বস্তিবোধ করছিলেন। সেই সঙ্গে আরো একটি বিষয় পরিস্থিতি আরো খারাপ করে দিল; এয়ার কন্ডিশনারের স্বল্পতার কারণে আনিসুর রহমানের রুমের জন্য গোলাম রব্বানীর রুমের এয়ার কন্ডিশনার খুলে আনা হলো। অবশ্য তাকে আশ্বাস দেয়া হয় নতুন এয়ারকন্ডিশনার কেনা হলে তাকে একটি প্রতিস্থাপক প্রদান করা হবে। এই ঘটনাটি তার ক্ষতের ওপর লবণ লাগিয়ে দিল; চোখে আঙুল দিয়ে তার সহকর্মী ও অধস্তনদের কাছে তার মর্যাদা লুণ্ঠিত করা হলো। রব্বানী শেষ পর্যন্ত জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসে ইকোনমিক মিনিস্টার পদে যোগ দিতে দেশ ছাড়লেন, যদিও সেখানকার ইকোনমিক মিনিস্টার পদটি ছিল যুগ্ম সচিব মর্যাদার- স্পষ্টত সরকারের সচিবের কয়েক ধাপ নিচের একটি পদ। তার যুক্তি ছিল ঢাকায় তার আত্মমর্যাদা ও দৃশ্যমান অপমান নিয়ে থাকার চেয়ে পরিচিতজনের দৃষ্টির আড়ালে থাকা ভালো। ক’জন আর খোঁজ নিতে যাবে, তিনি কোন মর্যাদায় জাপানে আছেন।

অধ্যাপক নুরুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন গোলাম রব্বানীর বিদায়ের পর সাবেক পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের আর একজন সদস্য এবং টাফট বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি আবদুস সাত্তার কমিশনের সচিব হিসেবে যোগ দিলেন। যোগ দেয়ার একেবারে শুরুতেই আমাকে বললেন, কমিশনের সাংগঠনিক ও কর্মকাঠামো নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট। তিনি পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনে চাকরি করেছেন, সেখানে সেক্রেটারি খুব ক্ষমতাধর একটি অবস্থানে রয়েছেন, তার ভূমিকায়ই মুখ্য। কার্যত তিনি কমিশন চালান, অবশ্য মাথার ওপর থাকেন ডেপুটি চেয়ারম্যান। পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনে যারা বিভিন্ন ডিভিশনের চিফ তারা সচিবের মর্যাদার নিচে। তারা সেক্রেটারিকে নিয়ে উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন করে থাকেন। পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যদের কেবল উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করতে হয়, তাদের কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব নেই, যেমন নেই ডিভিশন চিফের। সাত্তার আমাদের কাঠামো নিয়ে হতাশ, কারণ তা পাকিস্তান মডেল অনুসরণ করেনি। তিনি মনে করেন আমি এবং তিনি মিলে কার্যকরভাবে কমিশন চালালে সদস্যরা পরামর্শ ও সহায়তা দেবেন।

তার প্রস্তাবে আমি হতবাক হয়ে যাই যে, আমাকে কমিশনের কাঠামো ও কার্য কার্যধারা পুনর্গঠন করতে হবে। আমাদের কাঠামোর পেছনের যুক্তি ও উদ্দেশ্য আমি তাকে ব্যাখ্যা করলাম- পাকিস্তান, ভারত এবং পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর কাঠামো পরীক্ষা করে ইচ্ছাকৃতভাবে আমরা বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন এভাবে গঠন করেছি। বহু বছর ধরে আমি তাকে চিনি, সাত্তার কেবলই আমার ছাত্র নন, তার চাকরি জীবনে দীর্ঘ সময় তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবাসিত হওয়ার পর এবং কমিশনে যোগ দেয়ার আগে সাত্তার আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন- এখানে ভিন্নমুখী এবং পরস্পরের প্রতিযোগী রাজনৈতিক শক্তি ভিন্ন মতাদর্শ স্বাধীনতাযুদ্ধের ৯ মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামকালে গড়ে উঠেছে। তার মতে এত বেশি কেন্দ্রাতিগ রাজনৈতিক শক্তিকে প্রথাগত বহুদলীয় গণতন্ত্র দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, এই সংকটকালে যা দরকার তা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একদলীয় শাসন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আবার উষ্ণ ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আমার ওপর বঙ্গবন্ধুর আস্থা বিবেচনা করে তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার এই ধারণাটি নিয়ে আমি যেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ করি। তার কর্তৃত্ববাদী একদলীয় সরকারের ধারণা আমাকে কাছে টানতে পারেনি। তার এই অভিযানপ্রিয়তায় আমি হতবুদ্ধি হয়ে যাই। ১৯৭৩ সালের সংবিধানের নীতিমালা পরিপন্থি একটি রাজনৈতিক উদ্যোগ নেয়ার কথা তিনি বলছেন, আমি তাকে সিরিয়াসলি নিইনি, বরং বলেছি তার উত্থাপিত বিষয়ে আমার দক্ষতার অভিক্ষেত্রবহির্ভূত, তার বরং উচিত এই নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করা। পরে অবশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে তিনি তাদের কারো কারো সঙ্গে আলোচনা করেছেন আর মন্ত্রীরা এ ধরনের রাজনৈতিক বিষয়ে জড়িত না হওয়ার জন্য তাকে পরামর্শ দিয়ে থাকবেন। এ নিয়ে তার সঙ্গে আমার কখনো আলাপ হয়নি।

আমি শিগগিরই বুঝতে পারলাম সাত্তার কমিশনের সচিব পদের জন্য অত্যন্ত অনুপযুক্ত আর তিনি যদি কমিশন ছেড়ে যান তা একদিকে যেমন কমিশনের জন্য মঙ্গলজনক হবে তেমনি মঙ্গলজনক হবে তার নিজের জন্য। সুতরাং যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংস্থাপন মন্ত্রণালয়কে জানানো হলো। এই মন্ত্রণালয় সরকারের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ করে থাকে। কিন্তু আমি অবাক হলাম যে, তাকে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে অর্থনৈতিক সচিব নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি কেমন করে এই পদ ও দায়িত্ব বাগাতে পারলেন আমি কখনো বের করতে পারিনি। সে সময় এটা বহুজন বিদিত ছিল যে, তিনি প্রকাশ্যে পরিকল্পনা কমিশনের সমালোচনা করতেন তার সিভিল সার্ভেন্ট সহকর্মীদের সঙ্গে এবং আমার ধারণা বিরাজমান পরিবেশের তিনি সহানুভূতি সম্পন্ন শ্রোতৃমণ্ডলীও পেয়ে যেতেন।

খন্দকার মোশতাক আহমেদ যখন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তখন আবার আব্দুস সাত্তারের কথা কানে আসে। বিগত শাসনামলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, যা কার্যত দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ফেলে দিয়েছিল- এমন একটি বিষয় নিয়ে মোশতাক শাসনামলে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশিত হলো। স্পষ্টত এর উদ্দেশ্য পরবর্তী মোশতাক সরকার দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসনের জন্য কাজ করবেন এটাই শ্বেতপত্রের বার্তা; ব্যাপক প্রচারের প্রেসিডেন্টের সচিবালয় থেকে এটি প্রস্তুত ও প্রকাশ করা হয়। ডক্টর সাত্তার ওই প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের অর্থনৈতিক সচিব। বিশ্বাস করতে হলো এই প্রতিবেদনের লেখক ছিলেন তিনিই। আমি জানতে পেরেছি সাত্তার বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বঙ্গবন্ধু আমলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেছেন।

অন্যত্র অধ্যাপক ইসলাম লিখেছেন, ড. সাত্তারের সঙ্গে তার ওয়ান টু ওয়ান বৈঠকের পরপরই বিষয়টি নিয়ে কমিশন সদস্যদের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা সম্মিলিতভাবে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপনা করবেন এবং সাত্তার যে কমিশন সচিব হিসেবে প্রত্যাশিত নন তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেবেন। বঙ্গবন্ধু তাদের কথা শুনেছেন। তাকে প্রত্যাহার করে এনে নিজ সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক সচিব হিসেবে কার্যত তিনি পরিকল্পনা কমিশনের ওপর ছড়ি ঘোরানোর একটি বৈধ সুযোগের অধিকারী হলেন। প্রধানমন্ত্রীর পরবর্তী পদক্ষেপটি কার্যত অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে হতভম্ব করে ফেলল; আমি এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রথম অর্থ সচিব এম মতিউল ইসলামকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, এ বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবহিত যে, সিনিয়র অফিসারদের তেমন কেউ নুরুল ইসলাম কমিশনে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী ছিলেন না। পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের কারো কারো জন্য সাময়িকভাবে একটি পথ পাওয়াই ছিল জরুরি। ড. সাত্তারের উপস্থিতি ডেপুটি চেয়ারম্যান পরিকল্পনা কমিশনের জন্য হুমকি বিবেচনা করেছেন। তার দিক থেকে বিবেচনা সঠিকই ছিল, কারণ সাত্তার তার পরিকল্পিত কাঠামো হয়তো ভেঙে দিতেন। এর পরপরই ডেপুটি চেয়ারম্যান অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি পরিকল্পনামন্ত্রী ও তাজউদ্দীন কমিশনের আলোচনার ফলাফল জানেন না, সম্ভবত বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর কাছে সরাসরি উপস্থাপনের পরামর্শ তিনি দিয়ে থাকবেন।

সাত্তার চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান প্রত্যাগত ১৯৫৬ ব্যাচের সিএসপি এম সাইদুজ্জামানকে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব পদে নিয়োগ দেয়া হলো। অর্থ সচিব মতিউল ইসলাম লিখেছেন, পাকিস্তান প্রত্যাগত সাইদুজ্জামান তার সঙ্গে দেখা করে পদায়নের কথা বলছিলেন। তিনি প্রতিশ্রæতি দিলেন তার জন্য দ্রুত একটি ব্যবস্থা করা হবে। তবে পরিকল্পনা কমিশনে পদায়নে তার কোনো ভূমিকা নেই। তিনি বরং লিখেছেন : ডেপুটি চেয়ারম্যান এমন সংকটকালে তাকে লুফে নিলেন।

নতুন সচিব সম্পর্কে নুরুল ইসলাম লিখেছেন, এম সাইদুজ্জামান বাংলাদেশি সিএসপিদের মধ্যে অধিকতর যোগ্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৭০ সালে দুজনের দেখাও হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশে যাদের কমিশনে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে (ডেপুটি চেয়ারম্যান ও অপর তিন সদস্য) তাদের কর্তৃত্ব মেনে কাজ করতে তার কোনো আপত্তি নেই। সাইদুজ্জামান আসায় পরিকল্পনা কমিশন নিয়ে বিদ্যমান দ্ব›দ্ব ও অসন্তোষ অনেকটাই হ্রাস পায়। তিনি পরিকল্পনা কমিশনের টেকনিক্যাল ডিভিশনগুলোর পেশাদার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের মধ্যে তিনি যথেষ্ট সিনিয়র ছিলেন। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সিভিল সার্জনরা তাকে মান্য করতেন, তার সে ওজনও ছিল। আশরাফুজ্জামান নামে একজন কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কমিশনে যোগ দেন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়ের কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সদস্য ছিলেন না। ডেপুটি চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সেই সময়কার কনিষ্ঠ সিএসপিদের একজন ফয়জুর রাজ্জাক। তিনি অধ্যাপক ইসলামের ছাত্র, পরিকল্পনা কমিশনের প্রতি জ্যেষ্ঠ সিভিল সার্ভেন্টের মনোভাব কী জানতেন। এটাও জানতেন তার ভবিষ্যৎ ক্ষণকালের বহিরাগতদের ওপর নির্ভর করবে না, করবে সিভিল সার্ভেন্টদের ওপর। তিনি একান্ত সচিবের পথ ছেড়ে বহিঃসম্পদ বিভাগে যোগ দেয়ার চেষ্টা চালাতে থাকলেন।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত)

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App