×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

দেশে সেবার করুণ ও বাজে একটি অভিজ্ঞতা

Icon

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে সেবার করুণ ও বাজে একটি অভিজ্ঞতা

আমাদের দেশের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করে। মাঝখানে মনে হতো তাদের অপপ্রচার সত্য। হয়তো এই সরকারের হাতে সময় আর বেশি নেই। এদের অধিকাংশ এখন হাল ছেড়ে দিয়ে অদৃষ্টবাদী। তারা এখন ভিন্ন কথা বলে। তাদের নতুন মত, সময় বিচার করবে। তো সময়ই যদি বিচারক মনে করেন তো জ¦ালাও-পোড়াও, মানুষ মারার কি দরকার ছিল? বিরোধী বলতে যে একটি শক্তিশালী দল বা প্রতিপক্ষ, সেটাই ভুলে গেছে মানুষ। আহম্মকীরও একটা সীমা থাকে। দেশ জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, পার্টি অফিসে রাতজাগা নেতারা কীভাবে দেশকে নেতৃত্ব দেবেন? এটা বলে বোঝানোর দরকার পড়ে? বিরোধিতার নামে যে উগ্রতা আর শাসনের নামে যে কঠিন আচরণ তার চাপে রাজনীতি দিশাহারা। রাজনীতির কথা থাক।

বলছিলাম দেশের উন্নয়নের কথা। আমরা মাঝে মাঝে দেশে যাই। কাজেই সব সময়ের অনিয়ম আমাদের ভোগায় না। বিশেষ করে গিয়ে ফিরে আসার সময়টুকু কাটে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে। বাস্তবতা তখন অধরা। জরুরি কাজে ব্যাংকে যেতে হয়েছিল। সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। আমরা সবাই অবগত আছি ব্যাংকের অবস্থা নাজুক। এর সঙ্গে ওর সঙ্গে ওর মিশ্রণের মাধ্যমে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা চলছে দেশে। যখন ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যাংকগুলো গজিয়ে উঠছিল তখন এ নিয়ে কথা বলে দেখেছি। তিরস্কার আর বাঁকা চাউনির বাইরে কিছু জোটেনি। আমার নামের পাশে যতই প্রাবন্ধিক, লেখক, ছড়াকার, কবি লেখা হোক না কেন আমার মূল পেশা ছিল ব্যাংকিং। আশির দশকে চাকরির হাহাকার, কোনো মিডিয়া নেই, প্রতিষ্ঠান নেই একনায়ক এরশাদের খেয়াল-খুশির আমলে আমি চাকরি পেয়ে গেয়েছিলাম প্রবেশনারী অফিসার পদে। সে চাকরির এক পর্যায়ে আমাকে একটি ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে ঋণখেলাপি নির্ণয়ের ভার পড়ে আমাদের ওপর। সহজ হিসাব। সাধারণ ঋণের জন্য মন্দ ঋণের জন্য আলাদা আলাদা খাত। রাখতে হবে পর্যাপ্ত মজুত অর্থ বা প্রভিশন। তাতেই কাজ সারা। রাতারাতি ব্যাংকগুলোর মুনাফা উধাও। জোর করে নেয়া দুই-তিনটা বোনাস বন্ধ। অনেকে আমাদের ওপর বেজায় রাগ করলেন। কী দরকার এত হিসাব মানার? যেভাবে চলছে চলুক। কোন এক কর্মকর্তা যাবে ঋণ দিতে, ঋণের খবর নিতে তাকে উপহারের নামে নগদ ধরিয়ে দিলেই বলবে, সব ঠিক আছে। সে কর্তা যদি সৎ বা নিরীহ হন তো তাকে বল প্রয়োগে রাজি করাতে হবে। এমন গোঁজামিল বন্ধ হওয়াতে বেজার কর্মচারী কর্মকর্তার টের পাননি সামনে কী দিন আসছে।

আজ ব্যাংকগুলো করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি। অস্ট্রেলিয়া আসার পর আমি মূল চারটি বড় ব্যাংকের তিনটিতে কাজ করেছি। সব সময় ভাবতাম আড়াই কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দেশে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি ব্যাংক কেন? জনসংখ্যা যাই হোক মানুষের আয় আর লেনদেন ক্ষমতা অনেক বেশি। সে বিবেচনায় নিঃসন্দেহে আরো চার-ছয়টি ব্যাংক থাকতে পারে। কিন্তু না রাতারাতি ব্যাংকের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখে না কেউ। ব্যাংক তো দূরের কথা। পোস্ট অরইস প্রাইভেট হওয়ার পর যে কেউ চাইলে এর শাখা ক্রয় করে নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে পারেন। পাসপোর্ট থেকে টাকা তোলা সব কাজ হয়ে এই পোস্ট অফিসে। লাভজনক ব্যবসা। যে সব বাঙালি এমন শাখা খুলে বসেছিলেন তাদের সিংহভাগই ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। কারণ চাইলেই ইচ্ছামতো লাভ করা যায় না। সঙ্গে আছে নিয়মকানুনের ঝক্কি। বাংলাদেশে উন্নয়নের পাশাপাশি যে ব্যাংক খোলার হিড়িক আজ তা গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কথা পরে আলাপ করা যাবে।

একটি সরকারি ব্যাংকের প্রধান শাখায় গিয়ে যেসব সমস্যার সমুখীন হয়েছি, তার তালিকা দিলে এ লেখা শেষ করা যাবে না। মূলত যা চোখে লেগেছে দুর্ব্যবহার। আমি কারো অমঙ্গল চাই না বলে নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম। কিন্তু যে হিন্দু অফিসারটি চট্টগ্রামের মূল শাখায় বসে প্রতিনিয়ত গ্রাহকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছেন নিজেকে শাহেন শাহ মনে করছেন তার দায় নেবে কে? মৃত্যু পথযাত্রী ব্যাংকের এই অফিসার জানে না ক’দিন পর হয়তো তাকে বেতন দেয়ার টাকাও থাকবে না। কিন্তু লোকটি সমানে তার গ্রাহকদের অপমান করে যাচ্ছে।

আচরণের পাশাপাশি সমস্যার আরেক নাম ডকুমেন্ট। বাংলাদেশে ১০ বছর আগে জন্ম নেয়া নব্বই শতাংশ মানুষের জন্ম তারিখ বানোয়াট। তার আগের কথা না বলাই ভালো। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত মানুষ একসঙ্গে ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছেন? এর কারণ সঠিক তারিখ না থাকা। মা-বাবারা তখনকার দিনে এগুলো লিখে রাখতেন না। নিবন্ধনেরও কোনো নিয়ম ছিল না। অথচ এসব জানার পরও ডকুমেন্ট নিয়ে বাড়াবাড়ি করে এরা। এটা দিলে বলে ওটা দেন, ওটা দিলে বলে সেটা চাই। আপনি সবকিছু দিলে তারপর শুনবেন উনি খেতে গেছে। খেতে গেলে যে ফিরে আসতে হয় এ কথা মানে না তারা। উন্নয়ন মানে যদি এই বাস্তবতা হয় বলার কিছু নেই।

আমরা এসব দেশে ব্যাংকের চাকরিতে নিয়মের বাইরে এক মিনিটও বেশি সময় বাইরে থাকতে পারিনি। যে কোনো কাজে আধা ঘণ্টা বিরতি মানে ৩০ মিনিট। এক মিনিটও এধার-ওধার হতে পারবে না। লাট বাহাদুরের নাতি সরকারি ব্যাংকের কর্তা খেতে যান না ভোজনে যান তার হিসাব রাখে কে? বলছি ব্যাংকগুলোর সেবার মান আর টাকা ফেরত দানের অনীহা কি উন্নয়নের সঙ্গে যায়? তিন ধরনের মানুষ কোনো দুর্ভোগ পোহায় বলে মনে হলো না। এক. উচ্চ পদমর্যাদার কেউ, দুই. নেতা বা তাদের পরিচিত জন, তিন. মিডিয়া বা অন্যভাবে বিখ্যাত কেউ। এছাড়া আমজনতার অবস্থা ভয়াবহ। ব্যাংকিং যে একটি সেবার কাজ সেটি কারো মাথায় আছে বলে মনে হয়নি।

ব্যাংকের নাভিশ্বাসের আরেকটি কারণ অদক্ষ জনশক্তি। আমি কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি কাজ করছে, নিয়ম মানছে; কিন্তু পলিসি জানে না। জানলেও তার অর্থ বোঝে না। এর জন্য চাই ট্রেনিং। দূর দেশ থেকে গিয়ে এটা বোঝা মুশকিল তারা কতটা দক্ষ বা কতটা প্রশিক্ষিত। আমার ধারণা আগপাশতলা পরিবর্তন করা না গেলে বাংলাদেশের সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেবা দানে আগ্রহ, ভালো ব্যবহার এবং কাজ বুজে কাজ করার পাশাপাশি নীতিমালায় পরিবর্তন না আনলে এর সমাধান হবে না।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App