×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

ঈদযাত্রায় ৪৫৮ প্রাণহানি

কার দায় ও কার দায়িত্ব?

Icon

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 কার দায় ও কার দায়িত্ব?

২০২৪ সালের এপ্রিলের ২১ তারিখ আমার এ কলামে (নৃবিদ্যার দর্শন) আমি লিখেছিলাম, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল কি কখনো থামবে না?’ আমার প্রশ্নের মধ্যে খানিকটা ক্ষোভ ছিল, খানিকটা বিক্ষোভ ছিল, খানিকটা যন্ত্রণা ছিল এবং খানিকটা প্রতিবাদের ভাষা ছিল। আমি এ প্রশ্ন করেছিলাম, কারণ বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী শুধু মার্চ ২০২৪-এর অর্থাৎ এক মাসে ৫৬৫ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। আমি তখন লিখেছিলাম, ‘আমাদের মনে রাখা জরুরি, ৫৬৫ কেবল একটি সংখ্যা নয়, ৫৬৫টি জীবন এবং সে জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো হাজারো মানুষের জীবন ও পরিবারের অবস্থা, পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কি কোনো চিন্তা করেছি? আমাদের মধ্যে কোনো অনুভূতি কি তৈরি হয়েছে? আমরা কি কোনো মানবিক অনুভূতি দিয়ে সেই জায়গায় নিজেকে দাঁড় করে পরিস্থিতিকে একবার বোঝার চেষ্টা করেছি? করিনি, কারণ আমরা মৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়া করে মৃত্যুকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়ে আমাদের অনুভূতিগুলোকে আবেগহীন, বিবেকহীন এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলেছি।’ তাই আমি অত্যন্ত ক্ষোভমাখা আবেগের বিক্ষোভে প্রশ্ন করেছিলাম, সড়কে এ মৃত্যুর মিছিল আদৌ কোনোদিন থামবে কিনা! কেননা একটা দেশে ক্রমাগতভাবে ক্রমবর্ধমান হারে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু ঘটছে; কিন্তু কোনোভাবে এর কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। কিন্তু এবার ঈদুল আজহার যাত্রায় গত ১৫ দিনে নতুন করে ৪৫৮ জন মানুষের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু দেখে আমার সে ক্ষোভিত প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল আসলে আর থামবে না। বরঞ্চ দুঃখজনক হলেও সত্য, মৃত্যুর এ করুণ মিছিল দীর্ঘ থেকে আর দীর্ঘতর হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এ প্রাণহানির দায় কার? এবং মানুষকে এ প্রাণহানি থেকে রক্ষার দায়িত্ব কার?

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য আগে শরিক করে নিই। যাত্রী কল্যাণ সমিতি দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ঈদুল আজহার আগে-পরে ১৫ দিনে দেশের সড়ক ও মহাসড়কে ৩০৯টি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৪৫৮ জন মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ১ হাজার ৮৪০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। যাত্রী কল্যাণ সমিতি একটি তুলনামূলক বিচার ও বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দুর্ঘটনা ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ বাড়লেও প্রাণহানি বেড়ে হয়েছে দেড়গুণের বেশি। আহতের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় সাড়ে তিন গুণ। অর্থাৎ ঘটনার সংখ্যা, নিহতের সংখ্যা এবং আহতের সংখ্যা যেন প্রতিযোগিতা দিয়ে বাড়ছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির গত বছরের ঈদুল আজহার সময়কার তথ্য বলছে, ওই বছর ঈদযাত্রায় (২২ জুন, ২০২৩ থেকে ৬ জুলাই, ২০২৩ পর্যন্ত ১৫ দিন) দেশের সড়ক ও মহাসড়কে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৯ জন নিহত ও ৫৪৪ জন আহত হয়েছিলেন। সে হিসাবে এ বছরের ঈদুল আজহার ঈদযাত্রায় সড়কে প্রাণহানি বেড়েছে ৫৩ দশমিক ১৭ শতাংশ, আহতের সংখ্যা বেড়েছে ২৩৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ শতাংশের হিসেবেও আহত, নিহত এবং পুঙ্গুত্ব যেন একে অন্যকের ছাড়িয়ে যাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা করছে। নিহত, আহত এবং পঙ্গু হওয়ার এ পরিসংখ্যান তো শুধু সড়ক ও মহাসড়কের করুণ চিত্র; কিন্তু নৌপথ ও রেলপথও কম যায় না। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, এ বছর ঈদের আগে-পরের ১৫ দিনে রেলপথে ২২টি দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে নৌপথে ছয়টি দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত, ছয়জন আহত হয়েছেন এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরো ছয়জন। সুতরাং মৃত্যুর মিছিল চলমান আছে। এটা থামার কোনো লক্ষণ নেই। এ এক অন্তহীন মৃত্যুর অভিযাত্রা।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী সড়কে ও মহাসড়কে দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৫১ জন চালক, ১১ জন পরিবহন শ্রমিক, ৪৮ জন পথচারী, ৬১ জন নারী, ২৪টি শিশু, ১৪ জন শিক্ষার্থী, একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, তিনজন শিক্ষক, দুজন মুক্তিযোদ্ধা, তিনজন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য পরিচয়হীন বেওয়ারিশ লাশ। যেন এ মৃত্যুর মিছিল অন্তহীন গন্তব্যে যাত্রা করছে।

কেন সড়ক দুর্ঘটনায় এসব নির্মম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে? এগুলো নিয়ে বিস্তর আলোচনা অনেকবার আমরা করেছি। এসব নিয়ে অনেক গবষণা হয়েছে, অনেক লেকচার আমরা দিয়েছি এবং শুনেছি, সড়ক দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে অনেক চর্বিত-চর্বণ হয়েছে; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আহত, নিহত ও পঙ্গুত্বের সংখ্যা। তথাপি আবার এখানে এসব দুর্ঘটনার কারণগুলো উল্লেখ করছি, কেননা এগুলো বারবার সামনে আনা জরুরি, যাতে আমরা বুঝতে পারি কেন এসব নির্মম ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনা ঘটার পেছনে অনেক কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ট্রাফিক আইনের অপপ্রয়োগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপক বৃদ্ধি, বেপরোয়া মোটরসাইকেলের বেয়াড়া চলাচল, মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও তিন চাকার যানের ব্যাপক বৃদ্ধি ও এসব যানবাহন সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল, সড়ক-মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং না থাকা, সড়কে বাতি না থাকা, রাতের বেলায় ফগ লাইটের অবাধ ব্যবহার, সড়ক-মহাসড়কে নির্মাণ ত্রæটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অদক্ষ চালকের সংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধি, ফুটপাত বেদখল করার কারণে রাস্তার ওপর দিয়ে মানুষের চলাচল, যানবাহনের ত্রæটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার ক্রমবর্ধমান প্রবণতা, উল্টোপথে যানবাহন চালানোর ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং সড়কে বেপরোয়া চাঁদাবাজি প্রভৃতি। আমি অন্যত্র লিখেছি, ‘এসব কারণ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এখানে আছে প্রশাসনিক অদক্ষতা, মনিটরিংয়ের অভাব, দুর্নীতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ক্ষমতার অপব্যবহার, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, আমাদের আইন না মানার স্বভাবসুলভ প্রবণতা এবং ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।’ সুতরাং আমরা কেউ এ অনাকাক্সিক্ষত ও নির্মম মৃত্যুর দায় এড়াতে পারি না। কেননা যারা এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, তারা কোনো না কোনোভাবে আমাদের সমাজেরই লোক, আমাদেরই পাড়া-প্রতিবেশী, আমাদেরই করো না কারো আত্মীয়স্বজন এবং আমাদেরই পরিচিত-পরিজন। তাই এ মৃত্যুর দায় আমাদের সম্মিলিত দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতার এবং আমাদের সহজাত আইন না মানার প্রবণতার।

তাই সড়কে ও মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে আমাদের সবারই সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। স্মার্ট বাংলাদেশের দর্শনের আলোকে একটি স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের মতো ছোট ছোট যানবাহনগুলোকে একটা শক্ত তদারকি ও নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা, সুদক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ, যাতে চালকের অদক্ষতার কারণে যেন কোনো দুর্ঘটনা আর না ঘটে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে যানবাহনের ফিটনেস প্রদান করা, যাতে ফিটনেসবিহীন কোনো গাড়ি রাস্তায় না চলতে পারে, রাতের বেলায় বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেল চালকদের রিফ্লেক্টিং ভেস্ট পোশাক পরিধান বাধ্যতামূলক করা, সড়কে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করা, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা সন্তোষজনক পর্যায়ে আনা, যাতে জব-সেটিসফেকশন নিশ্চিত করা যায়, রাতের বেলায় যান চলাচলের সব সড়ক ও মহাসড়কে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা, নিয়মিতভাবে সড়ক নিরাপত্তা অডিট করা এবং সড়কে পর্যাপ্ত ইন্ডিকেটর এবং ড্রাইভিং ইনস্ট্রাকশনের ব্যবস্থা করা এবং সড়কের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএকে অধিকতর গতিশীল, কার্যকর এবং শক্তিশালী করা প্রভৃতির মাধ্যমে সড়কে ও মহাসড়কের মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান মিছিলে লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। কিন্তু আমরা এসব কথা বলেই যাচ্ছি, সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নিয়মিতভাবে এসব খবর প্রকাশ ও প্রচার করেই যাচ্ছে কিন্তু সড়কে আহত, নিহত ও পঙ্গুত্বের সংখ্যার পরিবৃদ্ধি কোনোভাবেই কমানো যাচ্ছে না। কেননা যার বাচ্চা তার হুশ নেই, কিন্তু পাড়া-প্রতিবেশীর ঘুম নেই। তাই আমরা না ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না, যার হুশ থাকার কথা সে বেহুশ হয়ে থাকলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই ঈদযাত্রার মতো আনন্দযাত্রায় ৪৫৮ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এসব মানুষের করুণ আর্তনাদ এবং তাদের পরিবারের করুণ বিলাপ আমাদের কানে কি কখনো পৌঁছাবে না?

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App