×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

রাষ্ট্র ভাঙল কিন্তু শোষণ ভাঙল না

Icon

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্র ভাঙল কিন্তু শোষণ ভাঙল না

বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে প্রায় দরিদ্রতম। এত বেশি দরিদ্র মানুষ অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। সবাই জানেন দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে, দারিদ্র্যের মাত্রাও বাড়ছে, যেমন বিপরীতে বাড়ছে ধনীর সংখ্যা ও প্রাচুর্যের মাত্রা। সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে না, শুধু লুণ্ঠিত হচ্ছে। উৎপাদনের পথে প্রধান অন্তরায় কোনটা? না, দরিদ্র মানুষ নয়। দরিদ্র মানুষ শ্রম করতে চায়। এত সস্তা শ্রম কোথায় পাওয়া যাবে এই একবিংশ শতাব্দীতে? যাবে না, যায় না। আমেরিকায় যে শ্রমের দাম ঘণ্টায় ৭.৫৩ ডলার, বাংলাদেশে তা পাওয়া যাবে ২৫ সেন্টে। না, অভাব শ্রমের নয়। অভাব হলো পুঁজির। আমাদের অর্থনীতি পুঁজিবাদী, কিন্তু এখানে পুঁজির অভাব। অর্থনীতিবিদরা দেখাচ্ছেন যে, জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল জাতীয় আয়ের শতকরা ১.৬ ভাগ, এক বছর পরেই সেটা আরো নেমে গেছে, একের নিচে, যাত্রা তার শূন্যের অভিমুখে। অথচ এই সময়ে ১০০ কোটি মানুষের দেশ জনপ্রজাতান্ত্রিক চীনে সঞ্চয়ের শতকরা হার ছিল ৪০; এক বছর আগে তা ছিল ৩৫। বাড়ছে, অনেক দেশেরই সঞ্চয় বাড়ছে, আমাদেরটা ছাড়া। কমার কারণগুলো দুর্বোধ্য নয়। অর্থনীতিতে, উদ্বৃত্ত কম। কিন্তু যেটুকু উদ্বৃত্ত থাকছে অধিপতি শ্রেণির লুণ্ঠনকারীরা তা আত্মসাৎ করে নিয়ে হয় ভোগ ও অপচয় করছে, নয়তো পাচার করে দিচ্ছে বিদেশে। এই বুর্জোয়ারা মোটেই দেশপ্রেমিক নয়। দেশপ্রেমিক প্রবাসী শ্রমের সাহায্যে যা সঞ্চয় করে, তা দেশে পাঠায়; দেশীয় বুর্জোয়া যা জবরদখল করতে পারে, তা পাঠিয়ে দেয় বিদেশে। প্রবাসীর মন দেশে থাকে, দেশি ধনীর মন থাকে প্রবাসে।

প্রবাসী বাঙালি দেশে বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু সুযোগ পায় না। লুণ্ঠনকারীরা সেখানেও হস্তক্ষেপ করে। চায় ঠকিয়ে নিয়ে নিতে। লাইসেন্স, পারমিট, প্রজেক্ট, খাজনা, ব্যাংক, জমির দখল- একশ একটা ফেরকার সৃষ্টি করে, যাতে পরিশ্রমে অর্জিত টাকা নিয়ে যে প্রবাসী দেশে আসেন তিনি বড়জোর জমি কিনে নিজের ও পরবর্তী বংশধরদের জন্য একটি স্থায়ী ঝামেলা সৃষ্টি করে রেখে যান, নয়তো আর কখনো ফেরত আসবেন না, নীরবে এই প্রতিজ্ঞা করে চোখ মুছতে মুছতে বিদেশে চলে যান।

বাংলাদেশের সীমান্ত এখন জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে- সর্বত্র উন্মুক্ত। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল যে তিনি চোরাচালানিতে জড়িত ছিলেন। আমরা মন্তব্য না-ই করলাম, কিন্তু সন্দেহ কী যে অধিপতি শ্রেণির বহু মহাজনই এই চোরাচালানে জড়িত। নইলে তা থামে না কেন। যারা শিল্পকারখানা গড়বেন তারা দাঁড়াতে পারছেন না, চোরা পণ্যের অসম প্রতিযোগিতায়। বিনিয়োগ করলে পুঁজিপাট্টা নিয়ে বসে পড়বার ঝুঁকি থাকে। না, উৎপাদন বাড়ছে না। লুণ্ঠন যেখানে অধিপতি সেখানে উৎপাদনে কে যাবে। যায় না। যেতে চায় না। উৎপাদনের রাজনীতি অনুৎপাদক শ্রেণিকে দিয়ে হবার নয়, হচ্ছেও না। দরিদ্র বাংলাদেশে ভোগবিলাস ও অপচয়ের যে স্রোত আজ বহমান, তা অতুলনীয়। প্রাকৃতিক বন্যার তবু শেষ থাকে, এ বন্যার শেষ নেই। সব কিছু সয়লাব করে দিচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর, খুব স্বাভাবিকভাবেই ঠিক হয়েছিল যে, কারো বেতনই ১ হাজার টাকার বেশি হবে না। অল্প পরেই বেতনের সর্বোচ্চ হার দ্বিগুণ, অর্থাৎ ২ হাজার করা হয়েছে; সেই সঙ্গে আরো যে একটি বৈধ সুযোগের বন্দোবস্ত করা হলো, সেটি ছিল রোমহর্ষক। আমলাদের সরকারি খরচায় একটি করে গাড়ি দিয়ে দেয়া হয়েছে, সার্বক্ষণিক। পাকিস্তানি আমলের তুলনায় অনেক বেশিসংখ্যক আমলা এই গাড়ি নিয়ে নিয়েছে। সেটা সূত্রপাত, রাজাকারদের সাধারণ ক্ষমা ও ভোগবিলাসে উৎসাহ দান একই সঙ্গে ঘটল, তারা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, এবং তারা সমাজে এগোতে থাকল। ভোগবিলাস একটি সর্বব্যাপী আদর্শে পরিণত হয়ে পড়েছে। তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এমন কোনো শক্তি এই মুহূর্তে আমাদের দেশে নেই।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে এত যে মানুষ মারা যায় তার মূল কারণটিও প্রাকৃতিক নয়, অতিপ্রাকৃতিকও নয়, কারণটি নিতান্তই অর্থনৈতিক। সেখানেও ওই একই ঘটনা, ধনী-নির্ধনে বিভাজন। উপকূলে গরিব মানুষই মারা গেছে এবং গরিব বলেই। প্রথম কথা, এমন এলাকা আছে যেখানে মানুষ থাকার কথা নয়, কিন্তু মানুষ থাকে। শখ করে নয়, বাধ্য হয়ে। একসময়ে উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদীরা যেমন বৌদ্ধদের হটাতে হটাতে বার্মা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছিল, আমরাও তেমনি আমাদের গরিবদের অনেককে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে উপকূলবাসী করেছি। উপকূলে মানুষ থাকে প্রকৃতির সঙ্গে আপস করে। ঘরবাড়ি আদিম প্রকৃতির, জীবনের মান অত্যন্ত নিচু, বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ, রেডিও শোনে কি শোনে না, শুনলেও তারা ভাষা বোঝে না। প্রকৃতি যখন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে তখন স্বভাবতই বাঁচার আর কোনো উপায় থাকে না। তারা মারা যায়, গুনতির বাইরে।

বাংলাদেশে ক্রমাগত বৃক্ষনিধন ঘটছে। এতে প্রকৃতি ভয়ংকরভাবে বিরূপ হয়ে পড়েছে। গরিব মানুষ গাছ ভালোবাসে, গাছকে সন্তানের মতো স্নেহ করে। কিন্তু গাছ না কেটে তার উপায় থাকে না, যেমন উপায় থাকে না গোয়ালের গরু বিক্রি না করে। আসল কুঠার পুঁজিবাদের।

বাংলাদেশের সমস্যা গরিবরা নয়, যদিও সেভাবে প্রচার করা হয়। বাংলাদেশের সমস্যা তার ধনীরা, যাদের আদর্শ লুণ্ঠন, যারা অপচয়কারী ও পুঁজি পাচারে বিশ্বাসী, যাদের বোঝা বহন করতে গিয়ে অর্থনীতি ক্রমাগত ন্যুব্জ হয়ে পড়ছে। আর এই ধনীকে ধনী করার এবং গরিবকে গরিব করার পেছনে রয়েছে পুঁজিবাদ। সাম্রাজ্যবাদ যার পৃষ্ঠপোষক, সামন্তবাদ যার গোপন অনুচর।

দুই.

একাত্তরের কথা বারবার আসে। না এসে উপায় কী। ওই এক ঘটনা, যা বাঙালির ইতিহাসকে একটি নতুন মাত্রা দিয়েছিল। একাত্তর বাঙালির জন্য সম্মান এনেছে। না, মৃত্যুর কারণে নয়, প্রতিরোধের কারণে। হানাদারদের অস্ত্রের নিচে মাথা পেতে দেয়াতে গৌরবের কানাকড়ি নেই, চরম গøানি রয়েছে। যখন থেকে মুক্তিযুদ্ধের শুরু, তখন থেকেই গৌরবের উদ্বোধন। কিন্তু তারপর? তারপর দিন যত গেছে অসম্মান তত বেড়েছে। দেখা গেল পাঞ্জাবিরা যা পারেনি, বাঙালিরা তা-ই করছে। বাঙালিকে হটিয়ে দিচ্ছে পেছনে। একাত্তরের পরে বাঙালি আর ঐক্যবদ্ধ নয়, সে বিভক্ত। এক অংশ ক্রমাগত সুযোগ পাচ্ছে, অপরাংশ ক্রমাগত বঞ্চিত হচ্ছে। এর আলো, ওর অন্ধকার। আমরা বলি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। কথাটা খুবই সত্য।

ওই যে চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তার সংজ্ঞাটি কী? বিতর্কে না গিয়ে বলা যায়, চেতনাটি সংজ্ঞায়িত হয়েছিল প্রথম সংবিধানের চার মূলনীতিতে : জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রে। ওই মূলনীতিগুলো থেকে আমাদের সরিয়ে দেয়াই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা।

মুক্তিযুদ্ধের সেই মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান এবং বেতারে তাঁর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে সমগ্র জাতিকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধকরণের মেজর জিয়াউর রহমান, উভয়েই নিহত হয়েছেন। পাঞ্জাবির হাতে নয়, বাঙালির হাতে। অবিশ্বাস্য ঘটনা, কিন্তু সত্য তো অবশ্যই। ইতিহাস এ ঘটনার ব্যাখ্যা কীভাবে করবে? ব্যাখ্যা একটাই। সেটা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্রীয় পশ্চাদপসরণকে নিশ্চিত করা। কথাটা নেতিবাচক হলো, ইতিবাচক ব্যাখ্যা হবে পুঁজিবাদের অবাধ বিকাশের স্বার্থেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে শেখ মুজিব সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, কিন্তু একাত্তরের পরে সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে নয়, পক্ষেই তিনি বলেছেন। মানতেই হবে তার দ্বিধা ছিল। অধৈর্য পুঁজিবাদ তাকে দ্রুত সরিয়ে দিয়েছে, নিজের রাস্তাকে নির্বিরোধ করার প্রয়োজন। জিয়াউর রহমান পুঁজিবাদের বিপক্ষে ছিলেন না, কিন্তু অগ্রসরমাণ পুঁজিবাদ তাকে যথেষ্ট সহায়তাকারী মনে করেনি, যেজন্য তাকেও সরিয়ে দিয়েছে। অনেকটা বুলডোজার দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করার মতো। সন্দেহ কি পুঁজিবাদ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরস্পরবিরোধী। তারা একসঙ্গে যাবে না। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র ঝুঁকে পড়েছে পুঁজির দিকে। প্রথমে ঝুঁকে পড়া, পরে স্থির হওয়া পুরোপুরি। মুক্তিযুদ্ধের এ এক ঐতিহাসিক, প্রায় অবিশ্বাস্য, পরাজয়। অনেকটা আমেরিকার সোভিয়েত ইউনিয়ন জয়ের মতো। সম্মুখযুদ্ধে পারেনি, সাংস্কৃতিক অন্তর্ঘাতে পেরেছে। বলা বাহুল্য, পাকিস্তানি ধনীদের সরিয়ে সেই জায়গায় বাঙালি ভাইদের বসিয়ে তাদের হাতে শোষিত হবে- এই লক্ষ্যে মানুষ যুদ্ধ করেনি। কিন্তু ঘটনা সেই রকমই দাঁড়িয়েছে। লোক বদলাল, ব্যবস্থা ঠিকই রইল। রাষ্ট্র ভাঙল, শোষণ ভাঙল না। শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার প্রথম ও একমাত্র সাক্ষাৎকারে ফিদেল ক্র্যাস্ত্রো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমলাতন্ত্রের কী করলেন। না, প্রধানমন্ত্রী আমলাতন্ত্রের কিছু করতে পারেননি। তাদের কেবল অক্ষুণ্ন রাখেননি, ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত সামরিক আমলাতন্ত্রের একাংশের হাতে তিনি নিষ্ঠুরভাবে নিহত হলেন। আমলাতন্ত্র হচ্ছে বৈষম্যের সন্তান এবং সংরক্ষক। সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের পতনের প্রধান কারণগুলোর একটি হলো ওই আমলাতন্ত্রের বিকাশ। পাকিস্তান ছিল একটি আমলাতন্ত্রী পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, সেখানে সামরিক-বেসামরিক আমলারা পুঁজির মালিকদের সঙ্গে মিলেমিশে নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করত। বাংলাদেশেও তেমন ঘটনাই ঘটল। এই ইতিহাস এতই প্রত্যক্ষ যে এর পুনরুল্লেখ অপ্রয়োজনীয়। বাংলাদেশের পরের সরকার আগের সরকারকে ছাড়িয়ে গেছে, পুঁজিবাদের অভিমুখে যাত্রায়। অর্থাৎ অরাজকতা, দারিদ্র্য ও দুর্যোগের অভিমুখে এগিয়ে নিয়ে গেছে জাতিকে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App