×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

নির্বিচারে সাপ মেরে নিজেদের ক্ষতি করছি না তো?

Icon

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নির্বিচারে সাপ মেরে নিজেদের ক্ষতি করছি না তো?

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের মতে, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত মোট ৩২টি জেলায় রাসেলস ভাইপার সাপ দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি, উদ্বেগ ও আতঙ্ক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, সংবাদ মাধ্যমে অতিরঞ্জিত ও খণ্ডিত সংবাদের ফলে বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে রাসেলস ভাইপার সন্দেহে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ মেরে ফেলা হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো- সব সাপই কি আতঙ্কজনক? বা সব সাপই কি মানুষের জন্য ক্ষতিকর? অথবা সব সাপই কি বিষধর? এক বাক্যে উত্তর আসবে- না। বাংলাদেশে যত প্রজাতির সাপ পাওয়া যায় তার অধিকাংশই বিষহীন। মাত্র ৭-৮ প্রজাতির সাপ বিষধর। তাছাড়া এই বিষধর সাপগুলোর এক ছোবলেই যে মানুষের মৃত্যু হয়, বিষয়টি এমন নয়। সাপের কামড়ে অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে মূলত যথাসময়ে চিকিৎসা না নেয়ার কারণে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ৪ লাখ সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাড়ে ৭ হাজার মানুষ মারা গেছে। যাদের বেশির ভাগই কোবরা ও কেউটে প্রজাতি সাপের কামড়ের শিকার হয়েছেন। সুতরাং রাসেলস ভাইপার নিয়ে জনমনে আতঙ্কের যে ডালপালা ছড়িয়েছে তা অযৌক্তিক।

সাপের বিষ নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ভেনম রিসার্চ সেন্টার গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছে, চন্দ্রবোড়া সাপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পুরনো ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে এবং যেখানে এই সাপ থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই, সেই জায়গার ছবিতে সাপ দেখিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে রাসেলস ভাইপার সন্দেহে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ মেরে ফেলা হচ্ছে।

বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য মতে, গত কিছুদিন ধরে দেশে রাসেলস ভাইপার সন্দেহে হত্যার শিকার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি সাপই নির্বিষ। অথচ বিষহীন সাপ মানুষের জন্য ক্ষতিকারক নয়, বরং এগুলো প্রকৃতির বন্ধু। প্রকৃতপক্ষে সাপ পরিবেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণী। খাদ্যশৃঙ্খলে সাপের রয়েছে বিশেষ অবদান। সাপের বিষ থেকে বিভিন্ন রকমের ওষুধ তৈরি করা হয়। একদিকে সাপ যেমন নিজের খাদ্য হিসেবে মানুষের জন্য ক্ষতিকর প্রাণীকে খেয়ে উপকার করছে, অন্যদিকে তেমনি পরিবেশের অন্যান্য উপকারী প্রাণীর খাদ্য হিসেবেও কাজে লাগছে। কিন্তু মানুষ যেভাবে প্রতিনিয়ত সাপ নিধন করছে, তাতে সাপের সংখ্যা যদি অত্যধিক কমে যায়, তাহলে স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট হবে। যেমন- ইঁদুর, পোকামাকড়, ব্যাঙ এগুলোর সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে যাবে। আবার খাদ্যাভাবে শকুন, পেঁচা এগুলোর সংখ্যা বেড়ে যাবে। কোনো প্রজাতির এরূপ পরিবর্তনই পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।

বলাবাহুল্য, একটি সুস্থ-সবল বাস্তুতন্ত্রে খাদ্যশৃঙ্খলে ছোট্ট একটি পরিবর্তনও জীববৈচিত্র্যের জন্য বিশাল হুমকি- যা ক্রমান্বয়ে বিপদ ডেকে আনবে। এটি জনস্বাস্থ্যেও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। ইঁদুরের সংখ্যা অত্যধিক বেড়ে গেলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি বাসাবাড়িতে এর উপদ্রবে মানুষেরও ভোগান্তি বাড়বে। প্রকৃতিতে সবকিছুরই ভারসাম্য প্রয়োজন। নয়তো প্রকৃতি তার ভয়াবহ রূপ দেখাতে বাধ্য হয়। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষার্থে, পরিবেশে ভারসাম্য বজায় রাখতে সর্বোপরি মানুষের স্বার্থেই নির্বিচারে সাপ মারা বন্ধ করতে হবে।

জান্নাতুল ফেরদাউস রিতা, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App