×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অঙ্গীকার এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

Icon

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অঙ্গীকার এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। প্রতিষ্ঠাকালে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এর সভাপতি, টাঙ্গাইলের শামছুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং তৎকালীন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মূলত আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্টের ব্যাপক জয়লাভের পর ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিলে সাম্প্রদায়িক শব্দ ‘মুসলিম’ পরিহার করে দলটির নামকরণ হয় আওয়ামী লীগ। জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত পাকিওস্তানি স্বৈরাচারী মুসলিম লীগ সরকার ও সামরিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে বাঙালির জনপ্রিয় দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর নির্বাচন, বাষট্টির হামুদুর রহমানের গণবিরোধী শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন, বাঙালির মুক্তি সনদ ছেষট্টির ৬ দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২২ ফেব্রুয়ারি তথাকথিত আগরতলা মামলায় শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সবার মুক্তিলাভের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় জীবনে নতুন দিগন্ত সূচিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি জননন্দিত আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

এর পর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগ তথা সমগ্র বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ঘোষিত ৬ দফা গণদাবিতে পরিণত হয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক আলোচনার নামে চক্রান্ত উপলব্ধি করে বঙ্গবন্ধু একাত্তরের মার্চের শুরুতেই দলের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের মাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুসারে অসহযোগ আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে পরিগণিত হন। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের জনসভার জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু জতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানালে বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা আরো শানিত হয়। গ্রেপ্তারের পূর্বে বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ মধ্য রাতে টেলিগ্রামযোগে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা প্রদান করেন।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগারে থাকাকালীন ১০ এপ্রিল অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা আম্রকাননে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করে। যে বৈদ্যনাথতলার নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। মুজিবনগর সরকারের বিচক্ষণ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি হলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সপ্তম নৌবহর প্রেরণ করা সত্ত্বেও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের সার্বিক সমর্থনে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে জাতির মহান বিজয় অর্জিত হয়। পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজিসহ ৯৫ হাজার সৈন্য রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণে বাধ্য হলে বাঙালির বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

উল্লেখিত ঘটনাবলির আলোকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা, চুয়ান্নর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, বাষট্টির গণবিরোধী শিক্ষা নীতির পরিবর্তে প্রগতিশীল শিক্ষা নীতি, ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের নামে প্রহসন করে বাঙালি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার ব্যাপক প্রস্তুতি অব্যাহত থাকে। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর এহেন চক্রান্ত আগেই বঙ্গবন্ধু মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে ছিলেন বলেই তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জনসভায় স্বাধীনতার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশনা দিয়ে ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের সঙ্গে বর্তমান আওয়ামী লীগের অনেক অমিল পরিলক্ষিত হয়। তিনি যেভাবে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতেন, তাদের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তেমনটি এখন দেখা যায় না! তাই পরীক্ষিত ও ত্যাগীরা নব্যদের দাপটে রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়ছে, অন্য দলে যোগদানও তাদের কাছে ধর্ম ত্যাগের সমান।

মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের কাছে জনগণের প্রত্যাশা স্বভাবতই অনেক। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ আজ অভাবনীয় উন্নয়ন সাধনে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাংক চক্রান্তের কারণে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ, অসংখ্য উড়াল সেতু, আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের আধুনিকায়ন, কর্ণফুলী টানেল, হাতিরঝিল, এলিভিয়েট এক্সপ্রেস, অত্যাধুনিক মেট্রোরেল দেশের উন্নয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রসঙ্গক্রমে বলা বাহুল্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে কিছু স্থাপনার এমনকি ছোট ছোট স্থাপনার নামকরণ তাঁর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। শেখ হাসিনা নিজেই বঙ্গবন্ধুর নামে পদ্মা সেতুর নামকরণে আপত্তি জানিয়েছেন। কারণ বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, যার নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে অন্তরের অন্তস্থলে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হয়। বঙ্গবন্ধু মানেই সমগ্র বাংলাদেশের মানচিত্র, বঙ্গবন্ধু মানেই লাল সূর্যের জাতীয় পতাকা, বঙ্গবন্ধু মানেই মহান মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনী জয় বাংলা। সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু মানেই বাঙালি জাতি। তাই এখন থেকে বৃহৎ স্থাপনাগুলোর নামকরণ তার সুযোগ্য উত্তরসূরি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, কামারুজ্জামানসহ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের নামে নামকরণ হলে পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধুই আরো সম্মানিত হবেন। নতুন প্রজন্মসহ সবাই প্রকৃত ইতিহাস জেনে অবগত হবে যে, তারা সবাই বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী নেতা। তা না হলে মুক্তিযুদ্ধকালীন একজন সেক্টর কমান্ডার (যার জন্য সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল) দুঃখজনক বা অনাকাক্সিক্ষতভাবে বঙ্গবন্ধুর পরবর্তী নেতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবেন, যা কোনোক্রমেই সামান্য বিবেকসম্পন্ন মানুষের কাম্য হতে পারে না! একজন সংস্কৃতিজন আমার সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেছিলেন- বঙ্গবন্ধুর পাশে তাজউদ্দীনের মতো দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য রাজনীতিবিদ ছিলেন, কিন্তু শেখ হাসিনার পাশে তার সমকক্ষ কোনো নেতা নেই। ’৭৫-উত্তর ছাত্র ইউনিয়নের এক নেতা এবং সাবেক সচিব আমার সঙ্গে সম্প্রতি আলাপকালে একই মত পোষণ করেছেন। বাস্তবেও আমাদের আশা-ভরসার মূল ভরসাস্থল শেখ হাসিনার পরবর্তী নেতা কে তা আমাদের বোধগম্য নয়, যা দেশ ও জাতির জন্য চরম দুশ্চিন্তার! স্বাধীনতা লাভের খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় নেতৃত্বে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ১৯৭২-এর ৪ নভেম্বর মূল্যবান সংবিধান গৃহীত হয়ে বিজয়ের প্রথম বার্ষিকী ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের চরম ব্যত্যয় ঘটে। ২৩ বছর দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় এসে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বর্বর ইমডেমনিটি আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার কাজ সম্পন্ন করে। পরে আবার ক্ষমতায় এসে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বহুলাংশে সম্পন্ন করলেও জাতীয় ৪ নেতার বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার আজো সম্পন্ন হয়নি!

আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এই দলের মূল নেতা শেখ হাসিনার কাছে দেশ ও জাতির প্রত্যাশা অপরিসীম।

সরকার যেহেতু দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলে আসছে, তাই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অঙ্গীকার হোক দল ও সরকারে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, বিদেশে পাচারকৃত বিপুল অর্থ ও সম্পদ (কানাডার বেগমপাড়াসহ) জব্দ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, যা শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব। বিগত সাম্প্রদায়িক সরকারগুলোর কারণে মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক চেতনা আজো সংবিধানে পুনঃপ্রবর্তন সম্ভব হয়নি। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অঙ্গীকার হোক দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের পাশাপাশি সার্বিক শান্তি নিশ্চিতকরণ ও বায়াত্তরের সংবিধানের নিরিখে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা।

হাসান-উজ-জামান : ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ (মুসপ)।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App