×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

জাতীয়করণকৃত ব্যাংকগুলোর সূচনাকালই ছিল স্বর্ণযুগ

Icon

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয়করণকৃত ব্যাংকগুলোর সূচনাকালই ছিল স্বর্ণযুগ

স্বাধীনতার পরপর যে সময় ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য থাকার কথা ছিল, সে সময় ব্যাংকগুলোর কোনো বোর্ড ছিল না, ব্যাংকের টাকা লুণ্ঠন হয়নি, ঋণ নিয়ে কোনো গ্রাহক খেলাপি হননি, দেশত্যাগ করেননি, কোনো গডফাদারের নামও শোনা যায়নি। সোনালী ব্যাংকের একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষ করে সেই কাহিনি লিখেছেন বাংলাদেশের প্রথম অর্থ সচিব মতিউল ইসলাম। তার ইংরেজি রচনার অনুসৃতি উপস্থাপন করা হলো, তা ব্যাংকিং ইতিহাসের অজানা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছে :

মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৩ মার্চ ১৯৭২ বাংলাদেশের প্রথম অর্থ সচিব হিসেবে মন্ত্রিসভায় বৈঠকে ব্যাংকিং খাত জাতীয়করণের বিস্তারিত প্রস্তাব পেশ করলাম। ২৬ মার্চ ১৯৭২ থেকে কার্যকরী ঘোষণা করে ‘দ্য বাংলাদেশ ব্যাংক (ন্যাশনালাইজেশন) অর্ডার’ ১৯৭২ জারি করা হলো।

১৭ জানুয়ারি ১৯৭২ আমি প্রথম অর্থ সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। সে সময় ব্যাংক খাত ছিল সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার চূড়ান্ত সীমানায় এবং আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল ব্যাংকিং খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা। নির্বাচন ইশতেহার অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ব্যাংকিং খাত জাতীয়করণে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ ছিল। এই প্রতিশ্রæতি সামনে রেখে আমি ব্যাংকিং খাত জাতীয়করণ করার বিস্তারিত পরিকল্পনা দাখিল করি। সে সময় অধিকাংশ ব্যাংক যেমন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ইউনাইটেড ব্যাংক মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ইত্যাদির সদর দপ্তর ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। বাংলাদেশি মালিকানাধীন দুটি মাত্র ব্যাংক ছিল- ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন।

বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যাংক দুটি স্ব স্ব পরিচয় নিয়ে সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালু থাকবে- সরকার আমার এই প্রস্তাব গ্রহণ করে। পশ্চিম পাকিস্তানি ১০টি ব্যাংকের বেলায় আমি প্রস্তাব করি এগুলোকে ৪টি ভিন্ন ভাগে পুনর্বিন্যস্ত করতে হবে। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ব্যাংক অব বাহওয়ালপুর এবং প্রিমিয়াম ব্যাংক একত্র করে একটি ব্যাংক করা হবে, দ্বিতীয় ব্যাংকটি হবে ইউনাইটেড ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সমন্বয়ে, হাবিব ব্যাংক ও কমার্স ব্যাংক মিলে হবে তৃতীয় ব্যাংক এবং চতুর্থ ব্যাংকটি হবে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, অস্ট্রেলেশিয়া ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে। মন্ত্রিপরিষদ আমার প্রস্তাব সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করে, তবে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যগণ ব্যাংকের জন্য বাংলা নাম প্রস্তাব করেন যেমন- সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, পূবালী এবং উত্তরা। এই সংযোজনসহ দ্য বাংলাদেশ ব্যাংকস (ন্যাশনালাইজেশন) অর্ডার ১৯৭২ জারি হলো, যার ঘোষিত কার্যকারিতা ২৬ মার্চ ১৯৭২ থেকে।

এ সময় আমি তিনটি চ্যালেঞ্জর মোকাবিলা করি। প্রথম চ্যালেঞ্জ ৬টি ব্যাংকের প্রত্যেকটিতে ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ ৬টি ব্যাংকের প্রত্যেকটির জন্য পৃথক বোর্ড অব ডিরেক্টর্স নির্বাচন এবং তৃতীয় চ্যালেঞ্জ সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে ব্যাংকে পেশাদার কর্মী নিয়োগের একটি পদ্ধতি চালু করা। রাজনৈতিক প্রভাব থেকে ব্যাংককে মুক্ত রাখতে আমি নিজেই ৬ জন ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিলাম। সৌভাগ্যবশত সরকার আগেই পাকিস্তানি ব্যাংকের সব শাখা অধিগ্রহণ করে সেখানে প্রতিটি ব্যাংকের জন্য পৃথক প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল। আমি এই প্রশাসকদের চারটি নব সৃষ্ট ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি বুঝতে পারছিলাম যে এই প্রক্রিয়ায় আমি রুলস অব বিজনেসের বিধান লঙ্ঘন করছি, কারণ একমাত্র প্রধানমন্ত্রীই ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়ার অধিকারী। কিন্তু এই ঝুঁকি আমাকে নিতে হয়েছিল, কারণ আমি চাইনি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগের প্রক্রিয়ায় রাজনীতি কোনো ভূমিকা পালন করুক।

সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হলেন জি এম চৌধুরী, ইউনাইটেড ব্যাংকের অর্থাৎ জনতা ব্যাংকের দায়িত্ব খায়রুল কবির, অগ্রণী ব্যাংকে ফজলুর রহমান এবং রূপালী ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হলেন মনসুরুল আমিন। ইস্টার্ন ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মি খালেদকে নবগঠিত পূবালী ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর করা হলো, হামিদুল্লাহর জায়গায় ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কে হলেন ঠিক স্মরণ করতে পারছি না, হামিদুল্লাহ আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগ দেন।

পরিচালনা পর্যদ গঠনের প্রশ্নে আমি মনে করেছি, ৬টি জাতীয়করণকৃত ব্যাংকের অর্গানোগ্রাম, নিয়োগবিধি বেতন ও পে-স্কেল ঠিক করা, ঋণ প্রদান ইত্যাদি নির্ধারণে প্রতিটির জন্য ১০ জন করে বাইরের ৬০ জন সদস্যের সমন্বয়ের গঠিত ৬টি বোর্ড অব ডিরেক্টর্স গঠন সুবিবেচনা প্রসূত কাজ হবে না, বরং তাতে সংহতকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। আমি তাই আমি বোর্ড অব ডিরেক্টর্স নিয়োগ অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেই সংহতকরণের সময় নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধায়নের দায়িত্ব নেয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ২৬ মার্চ সকালে আমি প্রস্তাবিত ৬ ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টরদের আমার অফিসে আসার আহ্বান জানাই এবং তাদের হাতে ম্যানেজিং ডিরেক্টরের নিয়োগপত্র প্রদান করি এবং কিছু নির্দেশনা দিই। প্রথম কথা হচ্ছে, নব সৃষ্ট ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে ব্যাংক ভালোভাবে চালানো এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদের। শুরুতে রুটিন কাজের মধ্যে রয়েছে নতুন নাম সাইনবোর্ড লাগানো, নতুন লেটারহেড বানানো, প্রত্যেক ব্যাংকের হেড অফিসের কার্যক্রম চালাতে আলাদা কমিটি নিয়োগ ইত্যাদি।

ব্যাংকারদের জানানো হয় সাইফুর রহমানকে নব গঠিত ব্যাংকগুলোর জন্য পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি সব ব্যাংকের জন্য একই ধরনের অপারেশনাল পদসোপান, নতুন স্কেল ও সব ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ তৈরি করবেন। এই কাজটি যথাযথভাবে সমাপ্ত করতে সাইফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন টিমকে পুরোপুরিভাবে সহযোগিতা করতে হবে। তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে কোনো পরিচালনা পর্ষদ থাকবে না, অর্থ সচিব হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও কেসসমূহের নির্দেশনা প্রদান করব।

ম্যানেজিং ডিরেক্টরদের আমি পরবর্তী যে নির্দেশনা দিই তা হচ্ছে- তারা কোনো প্রেস নোট জারি করবেন না, কোনো সংবাদ সম্মেলন করবেন না, নীরবে নিঃশব্দে কাজ করে যার যার ব্যাংককে পুনরুজ্জীবিত করবেন। আমার এই পরামর্শের উৎস হচ্ছে আমার একান্ত বিশ্বাস যে প্রেস নোট কিংবা সংবাদ সম্মেলন দিয়ে ব্যাংকের প্রতি জনগণের আস্থা অর্জন করা যাবে না। সে আস্থা গড়ে উঠবে ব্যাংকের দৃশ্যমান ভালো পরিচালনা থেকে। শেষ পরামর্শটি ছিল- নতুন নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কেবল মেধা ও পেশাগত দক্ষতাই হবে বিচার্য বিষয় হবে।

আমি বুঝতে পারছি, রুলস অব বিজনেস অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন গ্রহণ না করে ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিয়োগের দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার জন্য শিগগিরই আমাকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কোনো কায়েমি স্বার্থের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই অভিযোগ করা হলে তিনি জবাব দিয়েছেন, তাই নাকি? ব্যাংক ভালোই চলছে। আমি ওকে বকে দেব। কেবল প্রদানমন্ত্রী নন, কূটনৈতিক বৃত্তের সদস্যরা অনুভব করছেন ধীরে ধীরে ব্যাংকগুলো শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে শুরু করেছে।

প্রধানমন্ত্রীই যখন বিষয়টি আমার কাছে উত্থাপন করলেন, আমি স্বীকার করলাম আমি রুলস অব বিজনেজের বিধি ভঙ্গ করেছি, ২৩ মার্চ থেকে ২৬ মার্চের ব্যাংকিং জাতীয়করণ আদেশ জারি হওয়া পর্যন্ত মাত্র দুদিন সময় পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন আমার কোনো সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি তাহলে তিনি নতুন কাউকে নিয়োগ দিতে পারেন। যাই হোক, আমার দেয়া নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী কোনো পরিবর্তন আনতে অসম্মতি জানালেন।

আমি প্রধানমন্ত্রীকে আরো বললাম, আমি ছয়জন জেনারেল ম্যানেজার নিয়োগ দিতে চাচ্ছি, তিনি চাইলে আমি সুপারিশ আকারে অনুমোদন জন্য পাঠিয়ে দেব। প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিলেন। আমার সুপারিশসহ ছয়জন জেনারেল ম্যানেজারের নাম প্রস্তাব করে পাঠালাম, শিগগিরই ডাক পেলাম। তিনি বললেন, আমি যেসব সুপারিশ করেছি একটি বাদে আর সব ঠিক আছে, আমার সুপারিশকৃত সেই একজন হচ্ছেন আনোয়ারুল আমিন, নুরুল আমিনের ছেলে, তিনি তখন পাকিস্তানের ভাইস প্রেসিডেন্ট। আমি খোলামেলাভাবেই বললাম, এই নিয়োগে আমি কোনো সমস্যা দেখছি না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সম্মত হলেন না, একটি বাদে বাকি সব নাম অনুমোদন করে নথি পাঠিয়ে দিলেন।

জাতীয়করণকৃত ব্যাংকে মেধার ভিত্তিতে পেশাজীবী নিয়োগ চালু করতে গিয়ে দেখলাম আমি বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছি। একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী যিনি আমাকে বাবাজি বলে সম্বোধন করতেন তার একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে কোনো একটি সরকারি ব্যাংকে নিয়োগ দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। আমি দুবার তার অনুরোধ এড়িয়ে গেলাম। কিন্তু তৃতীয়বার হুমকির স্বরে তিনি বললেন তার অনুরোধ অমান্য করার কারণে তিনি আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। শেষ পর্যন্ত আমি তাকে বললাম, তার প্রার্থীকে কোনো মফস্বল শহরে পোস্টিং দেয়া হবে। (অনানুষ্ঠানিক আলোচনার সময় মতিউল ইসলাম জানিয়েছেন এই মন্ত্রী হচ্ছেন খন্দকার মোশতাক আহমদ।)

কয়েকদিন পর স্টেট ব্যাংকে অব পাকিস্তান করাচিতে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত থাকা এ কে এন আহমেদ ঢাকায় ফিরলেন এবং উপযুক্ত পোস্টিংয়ের জন্য আমাকে অনুরোধ করলেন। কিন্তু উপয্ক্তু পদ বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে বসাতে হবে। কারণ বর্তমান গভর্নর হামিদুল্লাহর সেন্ট্রাল ব্যাংকিংয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তার এই প্রস্তাব নিয়ে আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে রাজি হলাম না। কিন্তু যেহেতু তিনি পাকিস্তান প্রত্যাগত এবং আমার কাছে রিপোর্ট করেছেন, তার জন্য একটি উপযুক্ত পদ বের করে দেয়া আমারই দায়িত্ব। ঠিক সে সময় সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পদটি শূন্য ছিল, কারণ এই পদে অধিষ্ঠিত জি এম চৌধুরী কিছু মারাত্মক অনিয়ম করায় প্রেসিডেন্টশিয়াল অর্ডার নাইনে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমি এ কে এন আহমদকে এই পদটি গ্রহণ করতে অনুরোধ করলাম এবং একই সঙ্গে বললাম যদি তিনি সম্মত না হন তাহলে তাকে পুনর্বাসনের আর কোনো দায়িত্ব আমার থাকবে না। তিনি পরদিন সকালে এলেন এবং সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হতে রাজি বলে জানালেন, তখন যথারীতি প্রজ্ঞাপন জারি হলো।

১৯৭৩-এর অক্টোবরে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে বিশ্বব্যাংকে আমার যোগদানে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি জানালেন আর কফিল উদ্দিন মাহমুদ আমার স্থলাভিষিক্ত হলেন। ৬টি জাতীয়করণকৃত ব্যাংকে বোর্ড অব ডিরেক্টর্স নিয়োগের প্রক্রিয়া তিনি শুরু করলেন। গর্ভনর হিসেবে হামিদুল্লাহর চাকরিও কাল শেষ হয়ে এলে এ কে এন আহমদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর নিয়োগ করা হয়।

আমার বক্তব্য শেষ করার আগে ১৯৫১ সালে আমার বয়স যখন ১৮-১৯ বছর, তখন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের চট্টগ্রামের একটি শাখায় আমার ব্যক্তিগত যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সে প্রসঙ্গটি তুলতে চাই। আমি তখন আমার চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি কোর্স শেষ করতে সেখানে আর্টিক্যালড ক্লার্ক হিসেবে কাজ করছিলাম। আমি একটি অডিট ফার্মের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলাম, আমাকে মাসে ২৫ টাকা ভাতা দেয়া হতো এবং এই টাকার ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান লালদীঘি শাখায় একটি অ্যাকাউন্টে খুলি। ব্যাংকের সঙ্গে আমার লেনদেনের চিত্রটা ছিল এ রকম- ৫ বা ১০ টাকা এক একবার তুলছি বা জমা রাখছি। আমি ১০ টাকা একটি চেক নগদায়নের জন্য বেশ সকালেই ব্যাংকে যাই। আমি বেশি আগেভাগে চলে এসেছি, ব্যাংকে তখন কেবলমাত্র একজন সিনিয়র স্টাফ সদস্য ছিলেন। তিনি আমাকে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। আমি ১০ টাকার চেকটা বের করে তার হাতে দিলাম। ভদ্রলোক তখন তার ওয়ালেট বের করে ১০ টাকার একটি নোট দিয়ে বললেন দিনের নির্ধারিত সময় আমার অ্যাকাউন্টের জমা থেকে ১০ টাকা কাটা যাবে। পরে জানতে পারি সেই ভদ্রলোক অন্য কেউ নন, তিনি মিস্টার মাহবুবুর রশিদ, যিনি ১৯৬৭ সালে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের গভর্নর হয়েছিলেন (২০ জুলাই ১৯৬৭ থেকে ১ জুলাই ১৯৭১ পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেছেন)। এ ধরনের আর একটি ঘটনা ঘটে ১৯৫৮ সালে আমি তখন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের (এঙঊচ) অর্থ বিভাগের উপসচিব। আমাকে ধানমন্ডি ১৩ নম্বর রোডে একটি প্লট বরাদ্দ করা হয়েছে, গৃহনির্মাণ ঋণ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে ১২ মাসের বেতন মঞ্জুর হয়েছে। আরো ঋণ কোথায় পাওয়া যায় আমি সে অনুসন্ধান করছিলাম।

ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ঢাকার ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টরের ফোন পেয়ে আমি বিস্মিত হই। তিনি বললেন, যেহেতু আমি একটি নতুন বাড়ি করতে যাচ্ছি আমার নিশ্চয়ই গৃহনির্মাণ ঋণ প্রয়োজন, আর তিনি ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। ২০ হাজার টাকা গৃহনির্মাণ ঋণ বরাদ্দপত্র ও চেক দিয়ে একজন অফিসারকে পাঠালেন, প্রয়োজনীয় ফরম পূরণ ও প্রয়োজনীয় কাগজ গেঁথে দিয়ে আমি চেকটি গ্রহণ করলাম। তিনিই সেই ব্যাংকার রশিদ, পরবর্তীকালে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের গভর্নর।

একজন ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতার সঙ্গে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের একজন সাবেক সিনিয়র অফিসার দুর্লভ সহযোগিতার এমন উজ্জ্বল একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। আমি আশা করব, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের উত্তরসূরি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট কেবল সম্পদ ও দায়ের সুব্যবস্থাপনাই করবেন না, ব্যাংকের ক্ষুদ্র মক্কেলদের সহযোগিতার এমন দুর্লভ সংস্কৃতিকে ধারণও করবেন।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App