×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

অভিবাসীদের এনআইডি কিংবা পাসপোর্ট : কিছু প্রশ্ন

Icon

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অভিবাসীদের এনআইডি কিংবা  পাসপোর্ট : কিছু প্রশ্ন

এনআইডি বর্তমান বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক নাগরিকের জন্যই অত্যাবশ্যকীয়। এমনকি বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী অভিবাসীদের জন্য এটা আরো গুরুত্বপূর্ণ। দেশে ব্যাংক-বিমায়, অফিস-আদালতে, জমি-দোকানপাট বেচাকেনায় একজন বাংলাদেশি হিসেবে এটাকে এড়িয়ে চলার কোনো উপায় নেই। কিন্তু প্রবাসী কিংবা অভিবাসীদের জন্য দেশ থেকে এনআইডি কার্ড হাতে পাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই সুখকর নয়।

দীর্ঘ কয়েক বছর অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সরকার প্রবাসীদের এই কার্ড দেয়াটা সহজতর করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশিদের এনআইডি নিতে উৎসাহিত করছে। আর তারই অংশ হিসেবে গত ১০ জুন ম্যানচেস্টার সহকারী হাইকমিশনে নর্থওয়েস্ট ইংল্যান্ডের বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য এ কার্যক্রমের (স্মার্ট এনআইডি) আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। এর আগের দিন লন্ডনেও এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। আমলাদের অনেক আলাপ-আলোচনা শুনেছি বিভিন্ন সময়ে। দেখেছি, গতানুগতিক সাফাই গাওয়ার মাধ্যমেই তারা শেষ করেন তাদের রাজকীয় সফরগুলো কিংবা একটা বক্তৃতা। কিন্তু বলতেই হয়, দীর্ঘ সময় পর একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্য শোনলাম। যার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, রাষ্ট্রের প্রতি ছিল তার দায়বোধ, সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশের কনসেপ্টটা খুব সাবলীল ভাষায়ই তোলে ধরেছেন তিনি। কথা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কিছু প্রশাসনিক জটিলতার কথাও অকপটেই স্বীকার করেছেন, যা সাধারণত কেউ করে না। বাহুল্য ছিল না তার কথায়। রাষ্ট্রের একজন নিরেট ভালো সেবকই মনে হয়েছে তাকে। আমিও মাঝে মাঝে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সমালোচনা করি, কিন্তু আমার এক অগ্রজ আছেন যিনি ছুতো পেলেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যক্রমের বিরোধিতা করেন, এই মানুষটাকেও জিজ্ঞাস করেছিলাম মো. আলমগীরের আলোচনা সম্পর্কে- বললেন মনেতো হলো একজন সৎ মানুষ। উল্লেখ করা যায়, তিনি অকৃত্রিমভাবেই ম্যানচেস্টারের সহকারী হাইকমিশনারেরও প্রশংসা করলেন। এ রকম সৎ মানুষরাই আসুক রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখায়- এই প্রত্যাশা আমাদের মতো অভিবাসীদের।

এখন আসা যাক একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে। এনআইডি কার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্র প্রত্যেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশিই নিতে ইচ্ছুক কিনা, তাও আলোচনায় উঠে এসেছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনারও উল্লেখ করেছেন, এনআইডি কার্ড নিতে প্রবাসীদের কাছ থেকে তারা আশানুরূপ সাড়া পাচ্ছেন না। সাড়া না পাওয়াটাও খুব একটা অস্বাভাবিক নয়, কারণ যে প্রজন্মের এই জাতীয় পরিচয়পত্র প্রয়োজন, তাদের অনেকেরই এমনকি বাংলাদেশি পাসপোর্টও নেই। যদিও এখন পাসপোর্ট না হলেও এনআইডি দিয়েই বাংলাদেশ এর চেয়ে বেশি সুবিধা নিতে পারছে মানুষ। কিন্তু কথা হলো বাংলাদেশের এনআইডি কিংবা পাসপোর্ট পেতে যে প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা অনেক ক্ষেত্রেই সহজ নয়। বিশেষত ব্রিটেনের সমাজব্যবস্থায় এ রকম জাতীয় কোনো পরিচয়পত্র যেমন- পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রভৃতি পেতে রাষ্ট্রীয় যে সহজীকরণ প্রক্রিয়া আছে তার মধ্য দিয়ে নাগরিক তার সদ্ব্যবহার করে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে যদি একজন ব্রিটিশ নাগরিক স্বচ্ছ হয়, অর্থাৎ গুরুতর অপরাধী না হলে তার জন্য একটা পাসপোর্ট পেতে সাধারণত সময় বেশি যায় না। আর পশ্চিমা সমাজব্যবস্থায় প্রত্যেকটা নাগরিকই এ রকম সহজ পদ্ধতির মধ্য দিয়েই তার প্রয়োজনীয় সব কিছু করে যাচ্ছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকরা বিশেষত এ দেশগুলোতে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম এ ব্যবস্থাটাই স্বাভাবিক বলে মনে করে। তাছাড়া ডিজিটাল পদ্ধতির সঙ্গে এখানকার মানুষ অনেকটা অভ্যস্তও। সুতরাং এনআইডির মতো একটা ভালো উদ্যোগের ব্যবহারকারী হতে কোনো দ্বিধাবোধ থাকার কথা নয় এ প্রজন্মের।

বাংলাদেশি পরিচয়পত্রের জন্য কিছু প্রক্রিয়া আছে যেগুলো প্রয়োজনীয়, কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্বচ্ছ। যেমন উল্লেখ করা যায় পুলিশ ভেরিফিকেশন। সবচেয়ে প্রয়োজনীয় এবং ভেজালের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয় এই পদ্ধতিটা। প্রবাসে থাকা একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকের পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য নাগরিকের স্থায়ী ঠিকানার সন্ধানে যাওয়ার কথা স্থানীয় একজন পুলিশ কর্মকর্তার। তারা সেখানে হয়তো যায়, তবে প্রায় সময়ই সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা এ দেশে যার ফোন নাম্বার দরখাস্তে উল্লেখ থাকে, তাকে ফোন করে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দিতে রাজি হয়ে যান এবং তার কাছ থেকে একটা অর্থ দাবি করেন। তখন বাধ্য হয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী অফিসারকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব পড়ে দেশে যার টেলিফোন নাম্বার থাকে তার ওপর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর খেসারতটা অনেক বড় হয়ে যায়। এ রকম অভিযোগ এক-দুটি নয়, অনেকই আছে, ভোক্তভোগী প্রায় সবাই। অন্যদিকে বলা হচ্ছে, এমনকি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত এনআইডি কিংবা বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু কথা হলো তৃতীয় প্রজন্মের এমন অনেকেই আছে, যারা দেশে যায়নি কিংবা ওই নাগরিক এখনো কৈশোর উত্তীর্ণই হননি, তখন এর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স কীভাবে হবে? অথচ যেহেতু পদ্ধতিটা এ রকমই যে, পাসপোর্ট কিংবা এনআইডির জন্য পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ওই মানুষটাকেও করতে হবে। অতএব যেভাবেই হোক এ ব্যাপারটাও সংশ্লিষ্ট অফিসার ম্যানেজ করে দেন। এ ব্যাপারটা ওইদিন সহকারী হাইকমিশনে কেউ কেউ প্রশ্নও তুলেছেন। যেহেতু পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নেয়াটা একটা প্রসেসের অন্তর্ভুক্ত, সেহেতু এই পদ্ধতির মধ্য দিয়েই যেতে হবে এবং নাগরিকদের এর কোনো বিকল্প নেই বলে সেদিন উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই যে প্রশ্নগুলো এখানে উত্থাপন করা হয়েছে, তা হাইকমিশনের কিংবা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের মধ্যে নয়, তাই তারা কোনো সদুত্তরও দিতে পারেননি।

কিন্তু এর তো একটা উত্তর প্রয়োজন। কারণ একজন শিশু কিংবা কিশোর দেশেই ভ্রমণ করল না, অথচ ওই কিশোরের পুলিশ ক্লিয়ারেন্সটা কীভাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তা দেবেন, বর্তমান প্রক্রিয়ায় তা-ই হচ্ছে। এ ব্যাপারে কি ভিন্ন চিন্তা-ভাবনা প্রয়োজন নয়?

অন্যদিকে একটা কথা এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, ওইদিন মো. আলমগীর বলেছেন, এনআইডির ব্যাপারে তারা জনগণের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়াও পাচ্ছেন না। কিন্তু ওইদিনের উদ্বোধনী সভায় উপস্থিত বাংলাদেশি মানুষের কথাগুলো থেকে এ ব্যাপারটা মনে হয়েছে যে, এই জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাসপোর্ট কিংবা এনআইডি সংগ্রহ করতে এখানে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের মনোযোগ সৃষ্টি করতে বেগ পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। পশ্চিমা সমাজব্যবস্থায় প্রত্যেকটা নাগরিকই সহজ পদ্ধতির মধ্য দিয়েই তার প্রয়োজনীয় সব কিছু করে যাচ্ছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকরা বিশেষত এ দেশগুলোতে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাটাই স্বাভাবিক বলে মনে করে। সে কারণে বাংলাদেশে অন্যরকম প্রথা প্রচলিত থাকলে, সোজা কথায় সেলামি প্রথার প্রচলনটা থেকে গেলে এ প্রজন্মের দেশটার প্রতি টানটাই হয়তো থাকবে না।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App