×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

কৃষি বাজেট খাদ্য নিরাপত্তায় কতটুকু সহায়ক

Icon

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষি বাজেট খাদ্য নিরাপত্তায় কতটুকু সহায়ক

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল, সেই লক্ষ্য পূরণকে সর্বাগ্রে জোর দেয়া হয়েছে আগামী বছরের বাজেটে, যার মধ্যে কৃষি বাজেট একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। কৃষি খাতের অবদান তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ‘অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩৮ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মন্ত্রণালয়ে বাজেট বেড়েছে মাত্র ২ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে মোট বাজেটের মাত্র ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অথচ মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশ। এদিকে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও বরাদ্দ কমেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের। কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে ২৭ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৩৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। সে হিসাবে মন্ত্রণালয়টির বরাদ্দ কমেছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ কিছুটা বাড়ছে। এ খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে ৪ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ রয়েছে ৩ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। এদিকে কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার খাত বিবেচনা করে কাজু বাদামে আমদানি শুল্ক ১৫ থেকে হ্রাস করে ৫ শতাংশ ও এসেপটিক প্যাক আমদানিতে শুল্ক ২৫ থেকে হ্রাস করে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশে উৎপাদিত কাজু বাদামের বাজার বিকাশের উদ্দেশ্যে কাজু বাদাম আমদানিতে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি আরোপ করা হয়েছে। ভর্তুকি ও প্রণোদনায় বরাদ্দ আগের অর্থবছরের তুলনায় কম ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রস্তাবিত বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, দেশের ক্রমবর্ধমান প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে গবাদি পশু এবং হাঁস-মুরগির টেকসই জাত উন্নয়ন, সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে উৎপাদন দ্বিগুণ করার কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি গ্রামীণ জীবন ও জীবিকার প্রধান বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং পল্লী উন্নয়নের কথায় এলেই কৃষি সবার আগে চলে আসে। বর্তমানে কৃষি খাতে হার জিডিপিতে প্রায় ১২ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে শস্য খাতের অবদান সর্বাগ্রে রয়েছে। যেহেতু কৃষি পল্লী উন্নয়নের একটি বড় খাত, তাই সরকার বাজেটে কেবল কৃষি খাতে ১৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা আগামী বছরের বাজেটে প্রস্তাব করেছে। এখানে উল্লেখ্য, কৃষি যেহেতু একটি অগ্রাধিকারভুক্ত খাত এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই গত বছরগুলোতে এই খাতে ভর্তুকি দেয়া হয়েছিল, যা গড়ে প্রতি বছর দাঁড়ায় ৬০১.৪ কোটি টাকা এবং আগামী বছরের বাজেটে ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার মনে করছে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকরণ, কৃষি গবেষণায় দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষির বহুমুখীকরণ, রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্যের বাণিজ্যিকীকরণ, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ইত্যাদিতে জোর দিতে হবে। সেই ক্ষেত্রে বর্তমান বছরের বাজেটে অথনীতির প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) যে টার্গেট ধরা হয়েছে, তা অর্জনে কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম বিধায় সেই খাতে প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে বলে কৃষি অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে নিরলস কাজ করছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে নেয়া হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প। পাশাপাশি কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত করতে দক্ষ জনবল তৈরিতে ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কৃষি প্রকৌশলীর ২৮৪টি পদ সৃজন ও পদায়ন করা হয়েছে। ফলে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিকে যাচ্ছে ও যান্ত্রিকীকরণের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। এ বছর বোরোতে ধান কাটার যন্ত্র কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় দ্রুততার সঙ্গে সফলভাবে ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে অঞ্চলভেদে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকিতে কৃষকদের কৃষিযন্ত্র দেয়া হচ্ছে, তথা এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিতে নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। এর মাধ্যমে ফসল উৎপাদনে সময় ও শ্রম খরচ কমবে, কৃষক লাভবান হচ্ছে ও বাংলাদেশের কৃষিও শিল্পোন্নত দেশের কৃষির মতো উন্নত ও আধুনিক হচ্ছে। কৃষিযন্ত্রের প্রাপ্তি, ক্রয়, ব্যবহার ও মেরামত সহজতর করতে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পর্যায়ক্রমে স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র তৈরি করতে চাই। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। রাজধানীসহ প্রায় সর্বত্র সুউচ্চ দালানকোঠা ও মার্কেট নির্মাণ করতে গিয়ে অত্যধিক চাপ পড়ছে কৃষি জমিতে। সরকার সমস্যাটি সম্পর্কে সম্যক সচেতন। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, গ্রামকে শহরায়ণ করা হবে গ্রামের নিসর্গ-প্রকৃতি ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেই। শহরের সব নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়া হবে গ্রামেও। তাই বলে কেবল উন্নয়নের নামে কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, কৃষি আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তবে বর্তমানে কৃষিকাজে উৎসাহী তথা কৃষিশ্রমিক পাওয়া রীতিমতো দুর্লভ হয়ে উঠেছে। কৃষি খাতের এই বাজেটকে সাধুবাদ জানাতে চাই। কিন্তু কোভিডে লকডাউনে আমরা লক্ষ্য করেছি, পণ্য যে অঞ্চলে উৎপন্ন হয় না, সেখানে তার আকাশছোঁয়া দাম। আর যেটি উৎপন্ন হয়, তা কৃষক বিক্রি করতে পারছেন না। রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো ব্যবস্থা নেই। বাজেটে সেসব ব্যাপারে দিকনির্দেশনা নেই। এ রকম বাস্তবতায় কৃষি খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, মোট বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ শতাংশ, কৃষি খাতের বাজেটও বৃদ্ধি পেয়েছে ৬ শতাংশ (কৃষি খাতে ১৩ হাজার ২১৯ কোটি টাকা)। শহর থেকে কাজ হারিয়ে যারা গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের কর্মসংস্থান কিংবা তাদের শ্রম বিনিয়োগ কীভাবে ঘটবে, তার তেমন কোনো উল্লেখ বাজেটে নেই। তথ্য বলছে, বিগত বছরগুলোতে জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ অবহেলিত হয়ে এসেছে এবং কৃষি খাতে ভর্তুকি অন্যান্যবারের মতো এবারো একই অবস্থায় রয়েছে। এখন আসা যাক বিনিয়োগের প্রসঙ্গে, যা বর্তমান বছরের বাজেট উন্নয়ন খাতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা। আবার যদি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ পর্যালোচনা করা হয় তা হলে দেখা যায়, জিডিপিতে এর হার মাত্র ২২ শতাংশ, যা গত কয়েক বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। আবার ব্যাংকিং খাতের হিসাবে দেখা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যক্তি পর্যায়ে যে বিনিয়োগ হয়েছে, তা সামষ্টিক অর্থনীতির বিবেচনায় মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ এবং এতে কৃষি খাতের অংশ আরো কম অথচ ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষি বাণিজ্যিকীকরণের ওপর জোর দেয়া হয়েছিল, যেখানে পরিবারভিত্তিক চাষাবাদকে পরিহার করে খামারভিত্তিক বৈজ্ঞানিক চাষাবাদকে (গ্রিন হাউস) উৎসাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে, ক্ষুদ্র প্রান্তিক চাষিরা অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় এসব কৃষকের কোনো প্রবেশাধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যার প্রমাণ কৃষিপণ্য; বিশেষত কৃষকের ধানের মূল্য না পাওয়া। কৃষি বাজেটের আরো দিক হলো কৃষির প্রক্রিয়া যেহেতু গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই এর গতিশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৭ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা (বাজেটের ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ), নদী ভাঙন রোধ ও নদী ব্যবস্থাপনার জন্য পানিসম্পদ খাতে ৬ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা (বাজেটের ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ) বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাত মিলিয়ে বর্তমান অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯৫ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানোর পাশাপাশি তাকে প্রকৃতিবান্ধবও করে তুলতে হবে। জনগণের স্বাস্থ্য, পুষ্টির সঙ্গে সমন্বয় রেখে কৃষি ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। পরিকল্পনা করতে হবে সম্ভাব্য খাদ্য বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে। পরিকল্পনায় ক্ষুদ্র এবং পারিবারিক কৃষকদের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই পর্যালোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, বাজেট বাস্তবায়ন শতভাগ হলে দেশের কৃষি অর্থনীতি চাঙ্গা হবে সত্য, কিন্তু কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন হবে কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারণ। ধান-চাল ক্রয় সংগ্রহ বাড়ানো, কৃষি গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো, কৃষকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে পেনশন চালু, যা অনেক দেশে আগে থেকেই রয়েছে।

ড. মিহির কুমার রায় : কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক; ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App