×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

স্বেচ্ছা রক্তদাতা হোক আমার বিশেষ পরিচয়

Icon

মুহাম্মদ দৌলত-আল-রশিদ

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এমন মানুষ আছেন, যারা রক্ত দিতে চান, ইচ্ছা-আকুতি সবই আছে। কিন্তু চিকিৎসকের নির্দেশনায় ওজন কিংবা শারীরিকভাবে নানান কারণে রক্ত দিতে পারছেন না। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে বছরের পর বছর নিয়মিত রক্তদান অন্যতম গুরুত্ব বহন করে। পাশাপাশি একনাগাড়ে রোগ-শোক ছাড়াই সুস্থ থেকে মানবসেবায় নিজেকে কাজে লাগানোর তৃপ্তিটাও নেহাত কম নয়।

আমার জীবনেও ঘটেছে এমন তৃপ্তির ঘটনা। ৫০ বার রক্তদান করে মুমূর্ষুর সেবার সুযোগ পেয়েছি। ২০০৭ সালে আমি কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়তাম । স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের আয়োজনে ব্র্যাক ইউনির্ভাসিটির স্টুডেন্ট অডিটোরিয়ামে একটি ব্লাড ক্যাম্প হয়েছিল। সেখানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছিলাম। দায়িত্বটা ছিল খুব সহজ। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকা। যারা রক্ত দেবেন রক্তদানের আগে এবং পরে তাদের গøুকোজ পানি বানিয়ে খাওয়ানো, রক্তদাতাদের একটু খোঁজখবর নেয়া আর শুভেচ্ছা জানানো ইত্যাদি। সংঘবদ্ধভাবে সৎকাজে যোগ দিলে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের ইতিবাচক অনুরণন তৈরি হয়। আমারও হয়েছিল। মনে প্রশ্ন জাগল, আমি কবে রক্তদাতা হব? ইচ্ছা পূরণ হলো। তাও আবার রোজা রাখা অবস্থায় রক্ত দেয়ার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু। এরপর ধারাবাহিক পথচলা। ৫০ বারের বেশি রক্তদানের সৌভাগ্য জুটেছে। জুটেছে রক্তদাতা সম্মাননা। কিন্তু কোনো সম্মাননা নেয়ার সময় কখনই মনে হয়নি যে কিছু করে সম্মানটা পাচ্ছি। বারবার মনে হয়েছে, এটি তো দায়িত্বই ছিল। সুস্থ আছি, রক্ত দেয়ার যোগ্যতা আছে, তাই তো দিতে পারছি!

সৃষ্টিকর্তার কাছে এজন্য গভীর শুকরিয়া আর কৃতজ্ঞতা রক্তদান কার্যক্রমের সংগঠন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের প্রতি। যারা রক্তদানে নিয়মিতকরণে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে হ্যাঁ, সম্মাননা প্রাপ্তি দায়িত্ব পালনের বিষয়টি মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, আমরা যেন থেমে না যাই। যতদিন সুস্থতা থাকবে, সামর্থ্য থাকবে আমরা যেন নিয়মিত রক্ত দিয়ে যেতে পারি। এটি সৎকর্মের অন্যতম একটি সুযোগ। আমরা যেন কখনই এ সুযোগকে হাতছাড়া না করি। কেননা এত সহজে কষ্ট ছাড়াই অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচানোর সুযোগ প্রচুর অর্থ, সময় কিংবা শ্রম দিয়েও সম্ভব নয়। শরীরের বাড়তি একটি উপাদান দান, এভাবে উপকার করার সুযোগ আর কোনোভাবে নেই। রক্তদান বিশেষভাবে অনন্য।

রক্তদানে আমাদের পুরো শরীরের রক্তশূন্য করে দিতে হয় না। নির্দিষ্ট পরিমাণে রক্ত প্রতি ৪ মাস পরপর প্রত্যেক সুস্থ-সবল নারী-পুরুষই দিতে পারেন। জনগোষ্ঠীর কিছু অংশ যদি নিয়মিত রক্তদান করেন তবে দেশের রক্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে এজন্য নিয়মিত দানটা জরুরি। ৪ মাসের জায়গায় ১০ মাস পরে বা ১৫ দিন পরে দিয়ে হেলাফেলা নয়, যথা তারিখে রক্তদান করাই উত্তম। রক্ত যেহেতু তৈরি হয় না আর রক্তের কোনো বিকল্প নেই সেহেতু রক্তের প্রয়োজনে কেবল রক্তই দিতে হয়। রক্তদানের মাধ্যমে একজন অজানা-অচেনা মানুষ রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় হয়ে যায়। যে জাতি একাত্তরে বুলেট ভয় পায়নি, সেই জাতি সামান্য সুইয়ের ভয়ে রক্ত দেবে না- এটি একেবারেই কাম্য নয়। তাই আমরা যারা রক্তদানে নিয়মিত কিংবা উনিশতম জন্মদিনের দিকে এগোচ্ছি বা সুস্থ আছি নিজেরা নিয়মিত দিই, পাশাপাশি আশপাশের সবাইকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করি। পেশায় আমি একজন আইনজীবী, ইঞ্জিনিয়ার বা খেলোয়াড় অথবা গৃহিণীই হই না কেন- সব কিছুর পাশে আরেকটা বিশেষ পরিচয় হোক আমি নিয়মিত রক্তদাতা। মৃত্যুর পরও যাতে আমাকে স্মরণ করা হয়, উনি একজন রক্তদাতা ছিলেন! ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে সব রক্তদাতাকে শুভেচ্ছা।

মুহাম্মদ দৌলত-আল-রশিদ : রক্তদাতা ও এনজিওকর্মী, ঢাকা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App