×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুত গতানুগতিক বাজেট

Icon

অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটুকু প্রস্তুত গতানুগতিক বাজেট

অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গত ৬ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটের মোট ব্যয় ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা এবং আয় দেখানো হয়েছে ৫ লাখ ৪৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাজেট যদি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ৫১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বাজেটের সম্ভাব্য ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করা হবে। বাজেটের যে আর্থিক আয়-ব্যয়ের আকার প্রদর্শন করা হয়েছে, তাতে প্রস্তাবিত বাজেটকে সংকোচনমূলক বলা যেতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থনৈতিক পটভূমি ছিল প্রতিকূল- সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আন্তর্জাতিক চাপ এবং গণতান্ত্রিক বিরোধী দলের অভাব এর মধ্যেই বাজেটটি প্রণীত হয়েছে। এ অবস্থায় নতুন অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রণয়নের কাজটি ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। আমি মনে করি, বর্তমান বাজেটটি হচ্ছে ত্রিভুজ ক্ষমতার কাঠামোয় প্রণীত ত্রিশঙ্কু বাজেট।

সাধারণ মানুষ মনে করে, যেহেতু শাসক দলের মধ্যে গণতান্ত্রিকতা এবং বিরোধী দলের মতামত অনুপস্থিত এবং সাম্প্রতিক সময়ে যে প্রতিযোগিতাহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেই পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটে সাধারণ মানুষের স্বার্থ সংরক্ষিত হওয়ার সুযোগ খুব একটা নেই। এ অবস্থায় শাসন ক্ষমতায় আমলা এবং ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। এর প্রভাব পড়ছে অর্থনৈতিক সুশাসনের ওপর। দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টরে এখন সুশাসনের বড়ই অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে যারা অসৎ, তারাও এই আমলা এবং ব্যবসায়ী শ্রেণির সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। সেই সঙ্গে সর্বত্রই দুষ্টের পালন এবং শিষ্টের দমন করার প্রবণতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। এ অবস্থা যতদিন দূর না হবে, ততদিন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুশাসন প্রত্যাশা করা যায় না। বাজেটে ধনীদের থেকে রাজস্ব আদায় করে জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয়ের সুযোগ সীমিত। বাজেটের শুধু কসমেটিক চেঞ্জ করে কোনো লাভ হবে না। মূলত অপ্রত্যক্ষ কর, ব্যাংক ঋণ এবং বৈদেশিক-ঋণ-অনুদান সংগ্রহ করে তার ৬০ শতাংশ রাজস্ব ব্যয় করে এবার খুব অল্পই থাকবে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য। ফলে সরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কম। তদুপরি অতীতের ধারাবাহিকতা থেকে মনে হয় বরাদ্দকৃত অর্থ পূর্ণ ও সঠিকভাবে ব্যয় হবে না। ব্যয়িত অর্থের ব্যাপারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে না। এভাবে জবাবদিহিতাহীন অবস্থায় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনেকেই ফাঁকি দেবেন। অনেকেই দুর্নীতির মাধ্যমে কালো টাকা বানানো অব্যাহত রাখবেন।

ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাচ্ছে। যারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেন তাদের অনেকেই মনে করেন এই অর্থ আর ফেরত না দিলেও চলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকিং সেক্টরের প্রদর্শিত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে মার্চ, ২০২৪-এ এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। অবশ্য ঋণ হিসাব অবলোপন, পুনঃতফসিলিকৃত ঋণ হিসাব এবং মামলাধীন প্রকল্পের নিকট দাবিকৃত অর্থ যোগ করলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করে যাবে বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়বে না। এতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না। বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছিলেন, ব্যাংকিং কমিশনের, বাংলাদেশ বাংকের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা- কোনোটাই এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি।

দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে বিপুলভাবে। অনেকেই মনে করেন, ব্যাংক থেকে যে ঋণ প্রদান করা হয় তার একটি বড় অংশই নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অর্থ পাচার যতদিন সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা না যাবে, ততদিন ডলারের বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বহুদিন ধরে সরকার মার্কিন ডলারের বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার কারণে স্থানীয় মুদ্রা টাকার মান অনেকটাই কমে গেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়ার ফলে মাত্র একদিনের ব্যবধানে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১১০ টাকা থেকে ১১৭ টাকায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। এটাকে কোনোভাবেই ক্রলিং বৃদ্ধি বলা যাবে না। অবশ্য অনেকেই বলছেন, মার্কিন ডলারের বিনিময় হার যদি পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করা হয়, তাহলে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার আরো বৃদ্ধি পাবে। মার্কিন ডলারের চাহিদা এবং মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে প্রতিটি পণ্যের আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ব্যাপক হারে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছে। গুঁড়া দুধ, বিভিন্ন ধরনের মসলা এমনকি চালের দামও বেড়ে যাচ্ছে। অবশ্য শুধু মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বা আমদানি দাম বৃদ্ধির কারণেই যে অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হচ্ছে তা নয়, বাজারে তৎপর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এবং পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজদের কারণেও পণ্য মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ তার আবশ্যিক পণ্যের ২৫ শতাংশের মতো বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করে থাকে। অবশিষ্ট ৭৫ শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। শুধু আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই যদি অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য মূল্য বৃদ্ধি পায় তাহলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এবং বাজারজাতকৃত পণ্যের মূল্য বাড়ছে কেন? দেশের ব্যবস্থাপনা এখনো স্বচ্ছ এবং সুশৃঙ্খল ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। বাজার এখনো মহল বিশেষ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। অথচ উন্নত বাজার অর্থনীতির মূল কথাই হচ্ছে বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য চাহিদা এবং জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। কিন্তু আমাদের এখানে বাজার ব্যবস্থা এখনো সঠিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। একচেটিয়া প্রভাব, মধ্যস্বত্বভোগীদেও দাপট, শক্তিশালী সিন্ডিকেট; এদের প্রভাবেও হঠাৎ হঠাৎ কৃত্রিমভাবে ডিম, পেঁয়াজ, আলু ইত্যাদির দাম অতীতে অসঙ্গতভাবে বৃদ্ধি পেতে দেখেছি।

গত প্রায় আড়াই বছর ধরে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিটের কাছাকাছি রয়েছে। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি মাঝে মাঝেই ডাবল জিডিটি অতিক্রম করে যায়। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী জ¦ালানি তেলের মূল্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং সাপ্লাই সাইড বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ অতিক্রম করেছিল। সেই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) পলিসি রেট বৃদ্ধি এবং অন্যান্য নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাদের অর্থনীতিতে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার হচ্ছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকও একাধিকবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করেছে। আগে যেখানে পলিসি রেট ছিল ৫ শতাংশ, এখন তা সাড়ে ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু পলিসি রেট বাড়ালেও কিছু দিন আগ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার ৯ শতাংশে নির্ধারণ করে রেখেছিল। ফলে পলিসি রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমিয়ে আনার উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি। এবার আশা করা হচ্ছে সুদের হার বাড়িয়ে, ঋণ সরবরাহ কমানো যাবে ও সঞ্চয় বাড়ানো যাবে এবং তখন ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। কিন্তু বিপুল ঘাটতি বাজেটে ব্যাংক থেকে সরকার যদি বিপুল ঋণ নিতে থাকে, তাহলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কতটুকু ব্যয় সংযম কার্যকর করতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। ব্যাংকিং সেক্টরে এখন তারল্য সংকট আছে। সরকার তার বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করছে, তাই ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তি সমস্যা ঘনীভূত হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়বেন।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আনুপাতিক হারে মজুরি বৃদ্ধি পায় না। ফলে মূল্যস্ফীতি স্থির আয়ের মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে এক নম্বর সমস্যা বলে মনে করে। আর তা যদি হয় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি, তাহলে তো কথাই নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করলেও খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি মাঝে মাঝেই ডাবল ডিজিট অতিক্রম করে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ দরিদ্র এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষগুলো বড়ই অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এত দ্রুত এই লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা কম। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে বিনিয়োগ দরকার হবে তা কি হিসাব অনুযায়ী অর্জনযোগ্য? এই মুহূর্তে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনাটাই বেশি জরুরি। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য মার্কিন ডলারের বিনিময় হার কমানো না গেলেও অন্তত স্থিতিশীল রাখতে হবে। মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি পাগলা হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। সে জন্য যে করে হোক আমাদের রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, আমদানি প্রতিস্থাপন ও অপ্রয়োজনীয় আমদানি হ্রাস- এসব ক্ষেত্রে কোমড় বেঁধে নামতে হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে পণ্য মূল্য কমানোর জন্য কিছু কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। কিন্তু শুল্ক হ্রাসের হার খুবই কম। এতে বাজারে পণ্য মূল্য হ্রাসের ক্ষেত্রে কতটা ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিনিময় হারের প্রতিকূলতা রেখে এবং বাজারে যে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট এবং চাঁদাবাজ চক্র তৎপর রয়েছে সেটা ভেঙে দিতে না পারলে শুধু শুল্ক কমিয়ে মূল্যস্ফীতি কমবে বলে মনে হয় না। আমদানি শুল্ক হ্রাসের ফলে পণ্য আমদানি ব্যয় যেটুকু কমবে তার সুফল ভোক্তারা পাবেন না বাজারে ঘাটতি অবস্থার জন্য এই সুবিধা বিক্রেতাদের পকেটই হয়তো আরো ভারি করবে। কাজেই আমি মনে করি, বাজেটে যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে তা দিয়ে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি খুব দ্রুতই কিছু একটা কমানো যাবে না। সরকার বাজেটের আকার খুব একটা না বাড়িয়ে সংকুচিত রাখার জন্য চেষ্টা করেছে। মুদ্রানীতিতে সংকোচনমূলক অবস্থান ব্যক্ত করা হয়েছে। ব্যাংক আমানতের ওপর সুদের হার বাড়ানো হয়েছে এই প্রত্যাশায়, তাহলে সাধারণ মানুষ তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখবে। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকলে মানুষের আমানত সংরক্ষণের ক্ষমতা কমে যাবে। তাই চাইলেই ব্যাংকে আমানত রাখতে পারবেন না। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পেলে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু আমাদের দেশে বড় সরকার-ঘনিষ্ঠ ধনী হাউসগুলোর ক্ষেত্রে এটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ তারা যারা ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেন তাদের অনেকেই মনে করেন গৃহীত ঋণের অর্থ ফেরত না দিলেও কোনো অসুবিধা হবে না। এ ধরনের ঋণ গ্রহীতার কাছে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়।

পণ্য আমদানি যদি কমে যায়, তাহলে সরকারের রাজস্ব আহরণের পরিমাণ কমে যাবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগও যদি হ্রাস পায়, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আমি আশঙ্কা করছি, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা পূরণ হবে না। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে, যা বেকার সমস্যা বৃদ্ধি করবে। আমার মনে হয়, আগামী অর্থবছরে উন্নয়নের বা প্রবৃদ্ধির জয়ঢাক বাজানো যাবে না। সরকার প্রস্তাবিত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে মনে হয় না।

রপ্তানি আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে আসছে না। এর কারণ হচ্ছে, যারা বিদেশে পণ্য রপ্তানি করছেন, তারা দেশে ডলার বিনিয়োগের উপযুুক্ত পরিবেশ পাচ্ছেন না। তাই তারা উপার্জিত রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ নানাভাবে বিদেশে রেখে দিচ্ছেন অথবা অবৈধ পথে দেশে নিয়ে আসছেন কখনো কখনো এবং সুযোগ মতো আবার বাইরেও পাঠিয়ে দিচ্ছেন যখন-তখন। এটা রোধ করতে হলে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। দেশে ব্যবসায়-বাণিজ্যের ব্যয় কমছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সর্বস্তরে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে ‘কস্ট অব বিজনেস’ কমছে না। শুধু আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সমস্যা দূর করা যাবে না। এজন্য সর্বস্তরে মনিটরিং, দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ১৫ শতাংশ ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে, তা নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। এটা জনগণের জন্য কোনো উপকারে আসবে না। অতীতের এ ধরনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো সুফল বয়ে আনেনি। যারা বৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেন এবং নিয়মিত কর প্রদান করেন তাদের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। কালো টাকার মালিকরা যদি ১৫ শতাংশ ট্যাক্স দিয়ে তাদের অর্থ বৈধ করতে পারেন, তাহলে বৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারী, যারা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যাক্স প্রদান করছেন, তারা হতাশ হবেন। তারাও এই সুযোগ গ্রহণের জন্য ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কাজেই এ ধরনের সুযোগদান কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

অনুলিখন : এম এ খালেক

অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App