×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

কুরবানি পশুর ব্যয়াধিক্যের নেপথ্যে

Icon

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কুরবানি পশুর ব্যয়াধিক্যের নেপথ্যে

মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম পার্বণ কুরবানির ঈদ। অতীত আর বর্তমানের ঈদ পালনে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। অতীতে কুরবানি দেয়া মানুষের সংখ্যা এত ব্যাপক ছিল না। এখন কুরবানি ঈদে পশু কুরবানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সত্য এই যে, এই ঈদে আনন্দ উপভোগ একমাত্র তারাই করে থাকে কিংবা করে, যাদের কুরবানি দেয়ার সামর্থ্য আছে। আমাদের মোট জনসমষ্টির ১৫ শতাংশ পরিবারে কুরবানি ঈদ আসে উৎসবের বার্তা নিয়ে। বাকিদের পক্ষে আর্থিক কারণে কুরবানি দেয়া সম্ভব হয় না। তাই তারা এই পার্বণ উদযাপনও করতে পারে না। গ্রামে ভাগে কুরবানি দেয়ার প্রচলন অতীতেও ছিল, আজো আছে। কিন্তু পরস্পর বিচ্ছিন্ন শহরের মানুষ সাধারণত ভাগে কুরবানি দেয় না। আমাদের দেশে কুরবানির পশুর ক্ষেত্রে গরুই সর্বাধিক কুরবানি দেয়া হয়। আবার যারা গরু কুরবানি দেয়, তাদের অনেকেই গরুর সঙ্গে খাসিও কুরবানি দিয়ে থাকে। নিম্ন মধ্যবিত্তদের একটি অংশ অর্থনৈতিক কারণে খাসি কুরবানি দেয়। আমাদের দেশে কুরবানি দেয়ার ধর্মীয় বিধানের চেয়ে সামাজিক মর্যাদা রক্ষার আগ্রহ প্রবলতর। কুরবানি দেয়া না দেয়ার ওপর মানুষের সামাজিক মর্যাদা নির্ভর করে। এই সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় ঋণ করেও কুরবানি দেয়ার নজির রয়েছে। কুরবানির গরু নিয়েও এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়। কে কয়টি এবং কত বড় গরু কুরবানি দিচ্ছে, এ নিয়ে ঠাণ্ডা প্রতিযোগিতাও দেখা যায়।

ব্যক্তিগতভাবে আমি ইরাকের বিভিন্ন প্রদেশ ও শহরে পাঁচ বছর ছিলাম। কুরবানির ঈদের দিন বাগদাদ, বসরা, মশুল, কিরকুক, রামাদি, ফালুজা, আল-কাইম, আকাসাত পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শহরে থেকেছি। সেসব অঞ্চলে পশু কুরবানি দেয়ার দৃশ্য কখনো দেখিনি। এ নিয়ে স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলত, ‘হ্যাঁ আমরা নিশ্চয় কুরবানি দিই। তবে সেটা কেবল হজের সময়। পশু কুরবানি দেয়া হজের আনুষ্ঠানিকতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে প্রতি বছর পশু কুরবানি দিই না। কুরবানি দেয়া ফরজ নয় এবং প্রতি বছর পশু কুরবানি দেয়ার ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার কোনো বিধানও নেই।’

আমাদের দেশের মানুষের প্রোটিন চাহিদা পূরণে গরুর মাংস ছিল তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সস্তা খাবার। কিন্তু গত কয়েক বছরে ক্রমান্বয়ে গরুর মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের পক্ষে গরুর মাংস খাওয়া আর সম্ভব হয় না। ভারতবর্ষের কিছু রাজ্যে গরু জবাই নিয়ে তেমন সংকট না হলেও কোথাও কোথাও গরু জবাইকে কেন্দ্র করে নানা অঘটনের ঘটনা ঘটছে। অনেক প্রদেশে আইনসিদ্ধ উপায়ে গো-হত্যা নিষিদ্ধ। বিজেপি ক্ষমতা গ্রহণের পর বিজেপিশাসিত রাজ্যে গো-হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এখনো অতীতের ন্যায় গরু জবাই হয়। পূর্ববঙ্গে মুসলিম সংখ্যাধিক্যের কারণে গরু জবাই নিয়ে এ পর্যন্ত কোনো অঘটন ঘটেনি। আমরা যে স্বল্পমূল্যে গরু এবং গরুর মাংস কিনতে পারতাম তার প্রধান কারণ ছিল ভারতবর্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি সম্প্রদায় গো-মাংস খায় না, তারা নিরামিষভোজী।

কলকাতায় গেলে দেশের চেয়ে প্রচুর সস্তায় গরুর মাংস খাওয়া সম্ভব হয়। বিহারি মুসলিম হোটেলগুলোতে গরুর মাংসের নানা পদের গুরুপাকের রান্না মাংস স্বল্পমূল্যে খাওয়া যায়। ক’বছর পূর্বে আগের দামের চেয়ে বেশি দামে হোটেলে গরুর মাংসের বিক্রি দেখে দোকানিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। দোকানিটি হিন্দিতে যা বলেছিল তার বঙ্গানুবাদ হচ্ছে, কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায় গরু খাওয়া শুরু করার পর গরুর মাংসের মূল্য বেড়ে গেছে। তারা কেবল নিজেরা হোটেলে বসে খায় না, পরিবারের জন্যও পার্সেল নিয়ে যায়। এছাড়া খাদ্য-পণ্যসহ সব ক্ষেত্রে ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তো রয়েছেই।

ভারতের শাসক দল হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি। এই দলটি কয়েক দফায় নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় থাকার ফলে বিজেপি সরকার বাংলাদেশে গরু রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। এতে আমাদের দেশে গরু এবং গরুর মাংসের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বলে চোরাইপথে গরু আসা কিন্তু সম্পূর্ণরূপে রোধ করতে পারেনি প্রতিবেশী দেশের সরকার। বাংলাদেশে গরুর চাহিদা বিবেচনায় ভারতের খামারিরা গরু পালনে দীর্ঘকাল ধরে জীবিকা নির্বাহ করে এসেছে। বাংলাদেশের গরুর বাজারের ওপর ভারতীয় প্রচুর খামারি নির্ভরশীল। হঠাৎ গরু রপ্তানি বন্ধে ওই খামারিদের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ভারতীয় গরুনির্ভর ছিল বলেই দেশে গরুর খামার ব্যবসায়ীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়নি। গরু পালন ব্যয়সাপেক্ষ বলেই গরুর প্রকৃত মূল্য না পাওয়ার আশঙ্কায় গরু পালনে খামারিরা উৎসাহী হয়নি। ভারতীয় গরুর মূল্য দেশীয় খামারে পালিত গরুর মূল্যের চেয়ে কম হওয়ায় গরু পালনে আমাদের খামারিদের অনীহা ছিল। তবে ভারত সরকার গরু রপ্তানি বন্ধ করার পর বাংলাদেশে গরু ব্যবসায়ী-খামারিদের মধ্যে গরু পালনে সাড়া পড়েছে।

আমাদের খাদ্যে প্রোটিন চাহিদা পূরণে গরুর মাংসের নির্ভরতা বন্ধ হয়েছে। কেননা উচ্চমূল্যের কারণে গরুর মাংস আর সাধারণের খাদ্য তালিকায় নেই। তবে ভারতীয় গরু না আসায় গত ক’বছরে আমাদের দেশে উৎপাদিত গবাদিপশুর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার গবাদিপশুর খামারিদের জন্য ৫ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা প্রদানে গবাদিপশু পালনে সুবিধা হয়েছে। কুরবানি ঈদের চাহিদা দেশীয় গরু দিয়ে মেটানো যাবে বলে মত দিয়েছে খামারি, মাংস ব্যবসায়ী, চামড়া ব্যবসায়ী সংগঠন এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তারা পর্যাপ্ত গবাদিপশু মজুদের কথাও বলছেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এত দ্রুত কুরবানি ঈদে গবাদিপশুর চাহিদা দেশের গবাদিপশু দিয়ে পূরণ সম্ভব নয়। এর জন্য আরো সময়ের প্রয়োজন। এছাড়া মিয়ানমার থেকেও গরু আসে। চোরাইপথে ভারতীয় খামারিদের গরু আসা কমলেও বন্ধ হয়নি। পূর্বেই বলেছি ভারতীয় খামারিরা বাংলাদেশের বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

দেশে কুরবানি ঈদে গবাদিপশুর প্রয়োজন এক কোটির অধিক। এই বিশাল চাহিদা দেশে উৎপাদিত গবাদিপশু দিয়ে পূরণ হবে না। ঘাটতি পড়বে। ঘাটতির সুযোগটি দেশীয় মধ্যস্বত্বভোগী পাইকার ও খামারিরা গ্রহণের জন্য ঈদে গবাদিপশুর ঘাটতি হবে না বলে জোর প্রচার চালায়। আমরা নিশ্চয় গবাদিপশুর পরনির্ভরতা অতিক্রম করে স্বাবলম্বী হব, তবে তা দু-চার বছরে সম্ভব হবে না। আগে ভারত থেকে ২৫ থেকে ৩০ লাখ গরু এলেও গত ঈদের সময় এসেছিল মাত্র আড়াই থেকে ৩ লাখ। এ কারণে গত কুরবানি ঈদের বাজেট কারো পক্ষেই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। গরু কিনতে সবারই বাজেট ঘাটতি ঘটেছিল। বাংলাদেশ গবাদিপশুর চাহিদায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও গরু এবং গরুর মাংসের দর কমার কিন্তু কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। দর বৃদ্ধি ঘটেছে অন্যান্য খাদ্যপণ্যের মতোই। আসলে সরবরাহে ঘাটতি এবং মজুতদারির কারসাজিতে দর বৃদ্ধির ঘটনা আমাদের অভিজ্ঞতাজুড়ে রয়েছে। গরুর ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটবে না, সে নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৫০-৮০০ টাকা। বছর ঘুরতেই এটা হাজারে উঠলে বিস্মিত হব না। দেশে খাদ্যপণ্যের দর আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে। আমাদের কোনো শাসকের শাসনামলে বাজার ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ছিল না, আজো নেই। বিদ্যমান ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে থাকবে, সেটাও আশা করা যায় না। বলাইবাহুল্য, আমাদের ব্যবসায়ীরা শাসকশ্রেণিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভারতবর্ষের ইতিহাসে গরু জবাইকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, রক্তপাতের অজস্র ঘটনা ঘটেছে। এখনো যে ঘটছে না, তা নয়। ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের শাসনামলে সেটা চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন রাজ্য-সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় ওই সব প্রদেশে গো-হত্যা নিষিদ্ধ। পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত কোথাও না থাকলেও, ভারতে কেন রয়েছে? কারণ ভারতে উগ্র হিন্দু ধর্মান্ধরা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। অহিন্দুদের কেবল খাদ্য অধিকারে হস্তক্ষেপ নয়, তাদের ভারত-ছাড়া করতে নানা আইন প্রণয়ন করেছে। অথচ গরু হত্যা করে গরুর হিমায়িত মাংস বিশ্বজুড়ে রপ্তানিতে গো-রক্ষার কোনো ধার তারা ধারছে না। কেবল ভারতীয় অহিন্দুদের খাদ্যাভ্যাসে করে চলেছে অন্যায় হস্তক্ষেপ। ব্যক্তিগতভাবে ভারত ভ্রমণে অনেক মন্দিরে গেছি। অনেক মন্দিরে বিশালাকার পাথরের বসে থাকা ষাঁড়ের মূর্তি দেখেছি। গাভীর দুধ পানে শ্রীকৃষ্ণের জীবন রক্ষা পেয়েছিল। সে কৃতজ্ঞতা তাদের রয়েছে; কিন্তু মন্দিরে ষাঁড়ের মূর্তি কেন? ষাঁড়ের মূর্তির নিম্নাংশে খোদাই করা ‘নন্দী’ নাম দেখেছি। হিন্দু পুরাণ মতে হিন্দুদের তিন দেবতা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব। শিবের স্ত্রী (পার্বতী) দুর্গা। তাদের দুই ছেলে কার্তিক ও গণেশ এবং দুই মেয়ে সরস্ব^তী ও ল²ী। শিবের বাহন ছিল নন্দী। এছাড়া শিবের প্রধান দুই অনুচর নন্দী ও ভৃঙ্গি। নন্দী ছিল বামন আকৃতির, দুই হাত খাটো। দেখতে কুৎসিত ছিল বলেই নন্দীর কুৎসিত দেহকে আড়াল করতে ষাঁড়ের রূপ দেয়া হয়েছে। ষাঁড়রূপী নন্দী যেহেতু শিবের অনুচর এবং বাহন- সেজন্য ষাঁড়ের প্রতিও হিন্দুদের সমান শ্রদ্ধা এবং পূজনীয় আচার লক্ষ্য করেছি। নন্দীরূপী ষাঁড় মূর্তিকে নন্দী ঠাকুর অভিধায় হাঁটু গেড়ে বসে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতেও দেখেছি। ব্যবহারিক আচারের আনুগত্যে হিন্দু সম্প্রদায়ে গরু হত্যা এবং গরুর মাংস পরিত্যক্ত হয়েছে। নিজেরা না খেলেও অন্যদেরও গো-হত্যা, গরুর মাংস খাওয়ায় বাধা প্রদানকে ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা আরোপ করেছে। বিজেপি সরকারের অবস্থানও সেটা প্রমাণ করেছে।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App