×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

ঢাকার স্মৃতি : কুড়ি থেকে সত্তরের দশক

Icon

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার স্মৃতি : কুড়ি থেকে সত্তরের দশক

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার রসুলুল্লাহবাদে ১৫ মে ১৯০৯ প্রিন্সিপাল সাইদুর রহমানের জন্ম। ২৮ আগস্ট ১৯৮৭ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। কলকাতার বেকার হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট এবং ঢাকার জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে অধিক পরিচিত। তার চেয়ে বেশি পরিচিতি দার্শনিক হিসেবে এবং তার কট্টর সমালোচকদের কাছে নাস্তিক সাইদুর রহমান হিসেবে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে এই দার্শনিকের সঙ্গে আমার একাধিকবার কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তিনি তার অনুকরণীয় গ্রামীণ ঢং-এ কথা বলেছেন, তাতে কৃত্রিম নাগরিক প্রলেপ দেয়া তিনি পছন্দ করতেন না। যতবারই ঢাকার ফার্মগেট ছাড়িয়ে উত্তর দিকে গিয়েছি যাওয়ার সময় হাতের ডানে, আসার সময় বামে, রাস্তার ওপর ‘সংশয়’ নামের বাড়িটার দিকে তাকিয়েছি- তারই দেয়া নাম। স্কেপটিক দার্শনিকের বাড়ির নাম তো সংশয়ই হওয়ার কথা।

তার নিজ গ্রামের পাশেরটির নাম শ্যামগ্রাম। সেকালে প্রচলিত একটি প্রবচন- শ্যামগ্রামের বিলাই-ও বিএ পাস। বাড়ি বাড়ি গ্র্যাজুয়েট ছিলেন এক-দুজন; একটি ভালো স্কুল ছিল। ১৯২৬-এ কালাজ্বর আক্রান্ত সাইদুর রহমান শ্যামগ্রাম স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে মিটফোর্ড থেকে এলএমএফ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকায় যারা তার শুভানুধ্যায়ী তারা পরামর্শ দিলেন যেন তিনি আইএ ও বিএ পাস করে বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসেন, তিনি ছাত্র ভালো, তার হয়ে যাবে। তাছাড়া বড় ভাইয়ের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও ঢাকা তাকে আকৃষ্ট করেনি- ‘তখনকার ফুলবাড়িয়া স্টেশন বরাবর রেললাইনের উত্তর দিকটা ছিল একেবারে ফাঁকা... রাস্তায় গাছপালা তেমন একটা নেই। ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, মলের গাড়িতে থাকত পরিপূর্ণ। সব সময় এক ধরনের গন্ধ আসত। মহল্লায় মহল্লায় পানির ট্যাপকলের সামনে সকাল-সন্ধ্যায় থাকত নারী-পুরুষের ভিড়। পানির জন্য ভিস্তিওয়ালা আর মেয়ে-পুরুষের অশ্রাব্য গালাগাল আমার পছন্দ হতো না। তাছাড়া থাকা-পড়ারও সু-বন্দোবস্ত ছিল না।’ সুতরাং বড় ভাইকে না জানিয়ে কুমিল্লায় এসে ভিক্টোরিয়া কলেজে আইএ-তে ভর্তি হলেন। আইএর ফল আশানুরূপ ভালো হয়নি। ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষক নিখিল রঞ্জন তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্র পড়তে পরামর্শ দেন।

মুসলমান ছাত্রদের কাছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৮ সালে ভর্তি হলেন। প্রথম টিউটোরিয়াল ক্লাসেই প্রথম শিক্ষক ইউ এন গুপ্ত তার এসাইনমেন্ট রচনা পড়ে মন্তব্য লিখেছিলেন একসেলেন্ট কম্পাইলেশন। সেদিনকার বিষয় ছিল সোফিস্ট দার্শনিকদের উক্তি : ম্যান ইজ দ্য মেকার অব এভরিথিঙ্গ।

প্রাক-প্লেটো যুগে সোফিস্টরা নাস্তিক পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ইউএন গুপ্তের স্নেহ প্রশ্রয় তাকে দর্শনে আরো উৎসাহিত করে। তারই কন্যা করুণাকনা গুপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগ থেকে এমএ-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি বেথুন কলেজে অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। খ্যাতিমান দার্শনিক অধ্যাপক হরিদাস ভট্টাচার্য, কে সি মুখার্জি, ড. বি এন রায়, উমেশ ভট্টাচার্য, ড. এম ইউ আহামেদ সবাই তার শিক্ষক, তিনি সবারই প্রিয়ভাজন।

বিএন রায়কে দুষ্ট ছাত্ররা বলতেন বিএনআর বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে। সুনামগঞ্জের জমিদার পরিবারের সন্তান প্রখ্যাত এমএন রায়ের ভাই বিএন রায় থাকতেন জয়নাগ রোডে, সেখানে এখন বোর্ড অফিস। সাইদুর রহমান লিখেছেন : ‘তার বাড়িতে বিরাট এক পুকুর ছিল। অনেক দিন বিকালে সেই পুকুরের ঘাটে বসে তার কাছ থেকে ফিলোসফি- বিশেষ করে আধুনিক দর্শনের ধারা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতাম... তিনি আমাদের সুন্দর করে বোঝাতেন যে বিজ্ঞানের ক্রমোন্নতির সঙ্গে ধর্মের অবক্ষয় হতে বাধ্য। বাড়ির পুকুরঘাটে বসে বিএন রায় শুধু আমাদের দর্শনই শেখাতেন না, নাস্তা পানিতেও আপ্যায়ন করাতেন। বিকাল বেলায় তার বাড়িতে গিয়ে যেসব নাস্তা খাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে, তা নিতান্তই দুর্লভ অভিজ্ঞতা।’ হরিদাস ভট্টাচার্য ছাত্রদের নিয়ে বিকাল বেলায় রমনা গ্রিনে যেতেন, সে সময় লম্বা দৌড় দিতেন, হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় ছাত্রদের দর্শনের বিভিন্ন বিষয় বোঝাতেন- সুন্দর গল্পের মতো সহজ করে বলতেন- আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনতাম। নীলক্ষেতে বাসায় ফিরে মেয়ে ‘টেবি’কে গান শোনাতে বলতেন। গান হতো তারপর আবার দর্শনের আলোচনা। সাইদুর রহমান ১৯৩১-এ বিএ অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, ১৯৩২-এ এমএতেও একই রেজাল্ট।

পঞ্চাশের দশক

১৯৩২ সালে দর্শনের প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া সাইদুর রহমান রাজশাহী কলেজে চাকরির জন্য আবেদন করেন। সে সময়ে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া মুসলমান ছাত্রের সাক্ষাৎ পাওয়া ছিল একটি দুরূহ ব্যাপার। ফার্স্ট ক্লাসের জোরে নির্বাচিত শিক্ষকের তালিকায় তিনি প্রথম স্থানে থাকলেন। ডব্লিউ এ জেঙ্কিনস তখন কলেজের প্রিন্সিপাল, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। ১২ বছর বিভিন্ন স্থানে চাকরির পর তিনি ঢাকা কলেজে বদলি হলেন। শুরুতে রাজশাহী গেলেও পরে প্রথম পছন্দ বরাবরই ঢাকা। তিনি ঢাকা কলেজে আসার সুযোগ পেলেন ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের পর। কলেজের ভেতর একটি শহীদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। ঢাকা কলেজের রক্ষণশীল প্রিন্সিপাল শামসুজ্জামান চৌধুরী। কলেজ প্রাঙ্গণে ছাত্রদের কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি তিনি দেবেন না। ছাত্ররা মরিয়া, তারা ধর্মঘটের ডাক দেয়। সাইদুর রহমান ছিলেন কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক আর ইনাম আহামেদ চৌধুরী ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। এই ছাত্র ইউনিয়নের অবশ্যই রাজনৈতিক দলের অনুবর্তী কোনো ইউনিয়ন নয়, এটা কলেজের স্টুডেন্টস বডি। তিনি ছাত্রদের সমর্থন করলেন, কলেজের বার্ষিক সভায় বাংলা ভাষার প্রতি সমর্থন জোরদার করলেন, সরকারবিরোধী বুদ্ধিজীবীদের কলেজে আমন্ত্রণ জানান। কলেজের সভাপতি এবং ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার পীর আহসানউদ্দীন চলে গেলেই আন্দোলনকারী ছাত্রদের নেতৃত্ব প্রকৃতপক্ষে সাইদুর রহমানের হাতে। অতএব তাকে ২৪ ঘণ্টার নোটিসে সিলেটে বদলি করা হলো। আর ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে বরখাস্ত করে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হলো। একদিকে ইনাম বোর্ডে স্ট্যান্ড করা মেধাবী ছাত্র, অন্যদিকে তার বাবা গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী প্রভাবশালী আমলা- সব মিলিয়ে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

১৯৪৭’র স্বাধীনতার পর উভয় দেশেই অভিবাসনের হিড়িক পড়ে গেল। হিন্দুরা যাচ্ছে ভারতে, মুসলমানরা পাকিস্তানে। সাইদুর রহমান তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ শতাব্দীর স্মৃতিতে লিখেছেন : কলকাতা ছেড়ে আমার ছাত্ররা ঢাকায় এসে দেখল তাদের জন্য কোনো হোস্টেল নেই যেখানে গিয়ে তারা থাকবে। বাধ্য হয়ে ছাত্ররা বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের জন্য বরাদ্দ করা বাড়িটা দখল করে নেয়। শাহাবুদ্দিন ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় এবং অত্যন্ত ভদ্রলোক। ছাত্রদের দখলে থাকার জন্য তিনি বাড়িতে উঠতে পারছিলেন না। ইচ্ছা করলে শক্তি প্রয়োগ বা পুলিশ দিয়ে একটা ব্যবস্থা করতে পারতেন। তবে সে পথে তিনি গেলেন না। আমি তখন শিক্ষা বিভাগের স্পেশাল অফিসার। এক সময় বেকার হোস্টেলের সুপারিনটেন্ডেন্ট ছিলাম বলে ছাত্রদের ওপর মোটামুটি প্রভাব ছিল। কাজেই ওই সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল আমার কাঁধে।

তিনি ছাত্রদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ একটি আলোচনায় মিলিত হলে তারাই জানাল বিকল্প একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারলে তারা তখন ওই বিচারপতির বাড়ি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। তিনি বকশীবাজার বোর্ড অফিসের পূর্ব দিকে কয়েকটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে দখলদার ছাত্রদের দ্রুত দখলি বাড়ি থেকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হলেন। তখন চিফ সেক্রেটারি আইসিএস আজিজ আহমেদ তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ডেকে এনে ধন্যবাদ দিলেন। সাইদুর রহমান মনে করেন ঢাকার প্রশাসনের তিনি ছিলেন কর্তা এবং এমনকি তিনি শুনেছেন তখনকার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন এবং তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের সম্পর্কে কেন্দ্রে কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্ট পাঠাতেন।

(শতাব্দীর স্মৃতি সাইদুর রহমান, যায়যায়দিন প্রকাশনী ১৯৯৫)

ষাটের দশকের স্মৃতি

সাইদুর রহমান ১৯৬৩’র জুলাই মাসের ৭ তারিখ জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগ দেন। তিনিই লিখেছেন সেকালে কলেজটাকে বিদ্রুপ করে বলত ‘জগাবাবুর পাঠশালা’। একটি বেসরকারি মহাবিদ্যালয়ে সরকারের তরফ থেকে একজন সরকারি চাকুরেকে প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগদান নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠে। বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক গোলযোগে কলেজটি আচ্ছন্ন ছিল। সাইদুর রহমান পরিস্থিতি সামাল দিতে ছাত্রদের পক্ষে চলে যান অথবা অন্যভাবে বলা যায় ছাত্ররাই তার পক্ষে চলে আসে। তার সামাল দেয়ার সক্ষমতার সুনির্দিষ্ট উৎসও ছিল- মওলানা ভাসানী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার অত্যন্ত সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক, তৃতীয়জন তো সরাসরি তার ছাত্র।

একবার সদ্য কেনা গাড়িতে চড়ে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের এমপি মাওলানা মান্নান কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। সরকার পক্ষ মানেই এনএসএফ, এছাড়া আর সবাই সরকারের শত্রæ। ছাত্ররা তাদের শত্রæর আগমন টের পেয়ে যায় এবং মাওলানা মান্নানের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রিন্সিপাল ছাত্রদের নির্দেশ দেন দ্রুত গাড়িটা যেন কলেজ কম্পাউন্ডের বাইরে নিয়ে যায়। তারা এটা মান্য করে। তখনকার চিফ সেক্রেটারি আসগর আলী প্রিন্সিপালকে কৈফিয়ৎ তলব করেন। প্রিন্সিপাল জবাব দেন, ঘটনাটি কলেজ কম্পাউন্ডের ভেতরে ঘটেনি, সুতরাং জনগণের রাস্তায় ঘটা কোনো দুর্ঘটনার জন্য তার কোনো দায় থাকতে পারে না। ‘তাছাড়া মাওলানা মান্নানকে আমি ডাকিনি তিনি নিজেই গিয়েছিলেন’। প্রকৃতপক্ষে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা গাড়ি পুড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি, এমপিকে উত্তম-মধ্যমও দিতে চেয়েছে, কিন্তু প্রিন্সিপাল তাকে বাসার লেপতোশকের নিচে লুকিয়ে রেখে মারমুখী ছাত্রদের হাত থেকে রক্ষা করেন।

তার সময়ের দুঃখজনক ঘটনা ১৯৬৪ দাঙ্গা। তিনি ১৯৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গার সময়ে ওখানেই ছিলেন। তিনি জানেন এ ধরনের দাঙ্গায় সংখ্যালঘুরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়- কলকাতায় যেমন মুসলমানরা ঢাকায়ও তেমনি হিন্দুরা। ঠাটারিবাজারের দক্ষিণে, বনগ্রাম-যোগীনগর, ওয়ারী এলাকায় দাঙ্গা শুরু হয়। বিদ্যুৎবেগে শহরজুড়ে আরো বেশি রটনা হয়। হিন্দুরা দাঙ্গার আশঙ্কায় যখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছে প্রিন্সিপাল নিজেই কলেজ প্রাঙ্গণে রিলিফ ক্যাম্প খোলার সিদ্ধান্ত নেন। অল্প সময়ে শরণার্থীর সংখ্যা ১৫ হাজার ছুঁয়ে যায়। কলেজ প্রাঙ্গণ দেয়াল সুরক্ষিত দুর্গের মতো ছিল। কলেজের ছাত্ররাই সম্ভাব্য আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৈনিক হয়ে প্রহরায় থাকে। সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগে শহরের আর কোথাও আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপিত হয়নি। কলেজে গড়ে ওঠা শিবিরের ওপর সরকারের নজর পড়ে। আশ্রিতদের উপযুক্ত খাবার সরবরাহ করতে থাকে। গভর্নর মোনায়েম খান পরিদর্শনে আসেন এবং আশ্রিতদের সব ধরনের সাহায্য প্রদান করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। তিনি জেলা প্রশাসককে ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রদান করেন। কলেজ শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রিতদের একজন ত্রৈলোক্য বাবু, মহারাজ নামে খ্যাত। অতুলনীয় তার দেশপ্রেম ও ত্যাগ। আরাম-আয়েস বিসর্জন দিয়ে বছরের পর বছর কারা জীবনযাপন করেন। ত্রৈলোক্য বাবুর সঙ্গে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির একজন অধ্যাপক। আরো ছিলেন চিরকুমার ভবানী নন্দী (বিখ্যাত ডাক্তার নন্দীর ভাই)। অশীতিপর ত্রৈলোক্যনাথকে প্রিন্সিপাল একই কম্পাউন্ডে তার বাসায় থাকার অনুরোধ জানালেন। কিন্তু তিনি মুখের ওপর প্রত্যাখ্যান করলেন, বললেন ‘আমি এই দরিদ্র আশ্রিতদের ছেড়ে তোমার বাড়িতে বিলাসিতার মধ্যে সময় কাটাতে পারব না। আমি এদের সঙ্গে মেঝেতে রাতযাপন করলে এদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে।’

সত্তরের দশক

শতাব্দীর স্মৃতি থেকে সরাসরি একটি এপিসোড তুলে ধরেছি : ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, সে সময় তাকে একটি ‘দর্শন’ পত্রিকার সৌজন্য কপি দেয়ার জন্য একদিন গিয়েছিলাম বাসভবনে। তার হাতে পত্রিকাটি তুলে দিতেই পাতা উল্টাতে উল্টাতে সে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে স্যার লজিকে কত নম্বর দিয়েছিলেন?’

সেখানে শুধু আমরা দুজনেই ছিলাম না। বেলা ১১টার দিকে আশপাশে তার অনেক দর্শনার্থী। আমার জবাব দিতে দেরি হচ্ছে দেখে সে সবার সামনে অকুণ্ঠচিত্তেই বলল, ‘আমাকে আপনি লজিকে ২৭ নম্বর দিয়েছিলেন।

তখন বললাম, ‘তুমি এখন নম্বরের উপরে।’

শেখ মুজিব আবার বলল দেশের অবস্থা দেখেছেন। লজিকে ২৭ পেলে দেশ এর চেয়ে ভালো পরিচালনা করার ক্ষমতা থাকে না। তবে স্যার আপনি তো অনেক মানুষকে চেনেন। দয়া করে আমাকে ১০০ ভালো মানুষের একটি তালিকা করে দেবেন। ১০০ ভালো মানুষের তালিকা দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App