×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

ভয়কে করুন জয়

Icon

আসিফ হাসান চৌধুরী

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ভয়কে করুন জয়

আমাদের দেহের ভেতর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্মিত বিপৎসংকেত প্রদান করার ব্যবস্থা হলো ভয়, যা আমাদের অস্তিত্বকে সুরক্ষিত রাখার জন্য অভিযোজিত হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে অনেক খ্যাতিমান কিংবা সফল মানুষও ভয় পেতেন। বিখ্যাত ফরাসি সমর নায়ক নেপোলিয়ান বোনাপার্ট বড় বড় ভবনের সামনে উপস্থিত হলেই উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে জানালার সংখ্যা গণনা করতেন। মার্কিন কবি ও লেখক এডগর অ্যালেন পো claustrophobic ছিলেন; যেটি তার লেখার মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে। claustrophobia অর্থ আবদ্ধতা ভীতি। King of Prussia, Frederick the Greatএতটাই পানি ভয় পেতেন যে, তিনি মুখ ধোয়ার পরিবর্তে শুকনো তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে দিতে বলতেন ভৃত্যদের।

দুনিয়াজুড়ে মানুষ ভয়ের কারণে ‘উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা’ রোগে আক্রান্ত হয়ে জীবনযাপন করছে। বিচিত্র সব ভয়ে আতঙ্কিত থাকে মানুষ। যেমন- Bibliophobia হলো বই পড়ার ভয়। Acrophobia হলো উচ্চতার ভয়।  Entomophobia হলো কীটপতঙ্গের ভয়। Nyctophobia হলো অন্ধকারের ভয়। Kenophobia  হলো উন্মুক্ত স্থানের ভয়। Oneirophobia  হলো স্বপ্ন ভীতি। Peladophobia হলো টাক মাথার ভয়। Ergophobia
হলো কাজের প্রতি কিংবা কাজ হারানোর ভয়। একাকিত্বের ভয় Monophobia। Decidophobia হলো সিদ্ধান্তহীনতার ভয়। Atychiphobia ব্যর্থতার ভয়। Thanatophobia
হলো মৃত্যু ভয় বা কাউকে হারানোর ভয়।

আমরা সবাই মৃত্যুকে ভয় পাই। ফলে আমরা সবাই মারা যাওয়ার ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকি। একজন মা তার সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। সান্ত¡না পাওয়ার জন্য বুদ্ধের কাছে গেলেন এবং বুদ্ধকে নিজের দিশাহারা অবস্থার কথা বললেন। সবকিছু শুনে বুদ্ধ বললেন, নিকটবর্তী লোকালয় থেকে তুমি একমুঠো সরিষা নিয়ে এসো। কিন্তু সরিষা আনতে হবে এমন কোনো বাড়ি থেকে; যেখানে মৃত্যু প্রবেশ করেনি। সারাদিন খুঁজে সন্ধ্যায় যখন মহিলা বুদ্ধের কাছে ফিরে এলেন, দেখা গেল তিনি নিজেকে অনেকটা সামলে নিতে পেরেছেন। মহিলা বুদ্ধকে বললেন, আপনি আমাকে যে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন তা আমি বুঝতে পেরেছি। আমি এমন কোনো বাড়ি পাইনি যেখানে মৃত্যু প্রবেশ করেনি। বুদ্ধ একটু হেসে বললেন, জন্ম নিলে মৃত্যু অনিবার্য। মৃত্যু ঘটলেই সব শেষ হয়ে যায় না। মানুষের অস্তিত্বের একটি অংশ রয়েছে; যার সৃষ্টি অথবা বিনাশ নেই। অস্তিত্বেও সেই অংশের কাছে পৌঁছানোর জন্যই আমরা সবাই চেষ্টা করছি। এটিই সাধনা!

ভয় হলো বাস্তব অথবা কাল্পনিক হুমকির মোকাবিলা করতে গিয়ে সৃষ্ট মনোদৈহিক প্রতিক্রিয়া; যা দেহে উত্তেজনা ও আশঙ্কার অনুভূতি সৃষ্টি করে। ভয় সৃষ্টি, বজায় থাকা কিংবা ভয় বৃদ্ধি পেতে ভাবনা বা চিন্তার গুরুত্ব¡পূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভয় মূলত একটি দুশ্চিন্তা। যখন কেউ দুশ্চিন্তা দিয়ে আক্রান্ত হন, সেই দুশ্চিন্তা তার মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

ফলে তিনি উদ্বিগ্ন বোধ করেন। উদ্বেগের অনুভূতি ভয়ের আবেগকে সক্রিয় করে তোলে। ফলে তিনি আতঙ্ক বোধ করেন। আর একজন ব্যক্তি যতখানি আতঙ্কিত বোধ করেন, সেই আতঙ্ক মোকাবিলার জন্য তিনি তত বেশি দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়েন। ফলে অদ্ভুত বিরামহীন এক চক্রে আমরা আবদ্ধ হয়ে পড়ি, যা মোটেই সুখকর নয়।

এ অবস্থায় আমাদের দেহে কিছু শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে। যেমন- অক্সিজেনসমৃদ্ধ রক্ত শরীরের সর্বত্র পাঠানোর জন্য হৃৎপিণ্ড দ্রুত কাজ করে। এতে শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুততর হয়। তলপেট থেকে দুই পায়ের দিকে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায়; যাতে আপনি দ্রুত দৌড়াতে পারেন। শরীর ঘামতে থাকে। আহত হয়ে রক্তক্ষরণ হলে, রক্ত যাতে দ্রুততম সময়ে জমাট বাঁধতে পারে সে জন্য দেহ পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে। এ সময় অতিরিক্ত শক্তির জোগান দিতে লিভার থেকে সঞ্চিত চিনি রক্তস্রোতে এসে মিশতে থাকে। লালা তৈরি হওয়া হ্রাস পায়; ফলে মুখ শুকিয়ে যায়। আর আমাদের ইমিউন সিস্টেমের সাড়া প্রদান করার ক্ষমতা হ্রাস পায়। শরীরবৃত্তীয় এ পরিবর্তনে ভয় আপনাকে গ্রাস করতে থাকে এবং আপনি দিশাহারা হয়ে পড়তে পারেন।

গবেষণা থেকে দেখা গেছে, মানুষ যখন ক্রমাগত ভয় বা আতঙ্কের মধ্যে থাকে, তখন এই ভয় বা আতঙ্ক আমাদের ইমিউন সিস্টেম, কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেম এবং পরিপাকতন্ত্রের ক্ষতিসাধন করে বার্ধক্যকে ত্বরান্বিত করে এবং অকাল মৃত্যুর কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। ভয় বা আতঙ্ক মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি সাধন করে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, অবসাদ, হতাশা এবং Generaliæed Anxiety Disorder (GAD) এবং Post-traumatic stress disorder (PTSD) -এর মতো মানসিক বিকারগ্রস্ত অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে।

ধরা যাক, আপনি একটি বিশেষ ভাবনা বা আবেগ অথবা বিশেষ কোনো অনুভূতিকে ভয় পান। আপনার কাছে সেই নির্দিষ্ট ভাবনা, আবেগ বা অনুভূতি অনাকাক্সিক্ষত এবং অপ্রীতিকর। তাই আপনি সেই ভয়ের ভাবনা, আবেগ বা অনুভূতিকে বারবার এড়িয়ে যেতে চান বা ঝেড়ে ফেলতে চান। কিন্তু আপনি কখনই ভয় সৃষ্টিকারী ভাবনা, আবেগ বা অনুভূতিকে অতিক্রম করতে পারছেন না। যতবার আপনি কোনো নির্দিষ্ট ভয়ের ভাবনা, আবেগ বা অনুভূতিকে ঝেড়ে ফেলতে চাইবেন বা পরিহার করতে চাইবেন বা এড়িয়ে যেতে চাইবেন, সেই নির্দিষ্ট ভাবনা, আবেগ বা অনুভূতি বহুগুণে বড় হয়ে আপনার অন্তরে ফিরে আসবে। ফলে আপনার ভয় আরো বেশি বৃদ্ধি পাবে। তাই এসব ভাবনা বা অনুভূতিকে না এড়িয়ে আমরা নিজেদের তাদের কাছে উন্মোচিত করব। অন্তর্জগতে যখন এসব ভয় উদয় হয়, তখন তার জন্য জায়গা করে দেব।

আমাদের মনকে সমস্যা দিয়ে সম্পৃক্ত করার পরিবর্তে আমরা যদি সরোবরের মতো বিস্তৃত এবং উন্মুক্ত হতে পারি, তাহলে সমস্যাগুলো তাদের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে। এ জন্যই আমাদের ‘অন্তর্জগতে কী ঘটছে’ সেটি লক্ষ করা বা যা ঘটছে সে বিষয়ে মনোযোগ দেয়া মেডিটেশন বা ধ্যানশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ভাবনার স্রোতে ভেসে না গিয়ে ভাবনা এবং অনুভূতিকে অবলোকন করা অত্যন্ত জরুরি।

আপনি যখনই ভয়ের অনুভূতিতে প্লাবিত হচ্ছেন, এক মুহূর্ত দাঁড়ান। লম্বা দম নিন। আপনি একটু স্থির হবেন। লক্ষ করুন আপনার ভাবনাকে। এ অবস্থায় আপনি আপনার ভাবনা বা অনুভূতির জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তৃতিকে উন্মোচন করছেন। ভয় উদ্রেককারী ভাবনা অথবা আবেগের উপস্থিতি টের পাওয়ার পরে আপনি সেই ভয়ের ভাবনা বা আবেগটির নামকরণ করতে পারেন, যাতে করে আপনি সেটি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন। এ সময় যাতে আপনি ভাবনার স্রোতে ভেসে না যান সে কারণে নিজের দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ, ঘ্রাণ এবং স্বাদের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন হোন; যাতে করে আপনি বর্তমানে অবস্থান করতে পারেন। নিজের দম অবলোকন করুন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করুন এবং দেখুন ভয়ের কোনো অনুভূতি শরীরের কোথাও অবস্থান করছে কিনা! কারণ ভয়ের অনুভূতি শারীরিকভাবে প্রকাশ পায়। আপনার অন্তর্জগতে বিরাজমান ভয়ের অনুভূতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন হওয়ার পাশাপাশি লক্ষ করুন আপনার দেহের কোনো স্থানে সেই ভয়ের কোনো প্রভাব আছে কিনা। মূলত ভয় উদ্রেককারী ভাবনাকে ঝেড়ে ফেলা বা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য আমরা অন্তরকে বিস্তৃত এবং উন্মুক্ত করছি না, আমরা অন্তরকে বিস্তৃত এবং উন্মুক্ত করছি ভয়ের ভাবনা ও আবেগের স্থান সংকুলানের জন্য। আপনি যখন এই অনুশীলন করবেন, লক্ষ করবেন যে আপনার ভয় খুব দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে এবং আপনি অত্যন্ত স্বস্তি বোধ করছেন।

আপনার মন নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক গল্পের অবতারণা করে আপনাকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আপনার মনে হতে পারে এতসব অনুশীলন করার সময় কোথায়! অথবা এটিকে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অনুশীলন অব্যাহত রাখুন। আমাদের লক্ষ্য অর্জন, দক্ষতাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কর্মসম্পাদন কিংবা সমৃদ্ধ ও অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করার পথে অন্যতম প্রধান বাধা হলো ভয়। ভয়কে অবশ্যই জয় করতে হবে। তাহলেই ঘটবে একজন মানুষের মেধার পরিপূর্ণ স্ফুরণ।

আসিফ হাসান চৌধুরী : পিএইচডি; মলিকুলার বায়োলজি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App