×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

গান্ধী ও জিন্নাহর মিল-অমিল

Icon

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গান্ধী ও জিন্নাহর মিল-অমিল

(শেষ কিস্তি)

জিন্নাহর আদর্শবাদে ঘাটতি থাকলেও নীতিনিষ্ঠায় ঘাটতি ছিল বলে অভিযোগ নেই। আদালতে তিনি প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়তেন, কিন্তু অন্যায্য মামলা নিতেন না এবং যা তার প্রাপ্য তারচেয়ে অধিক অর্থ দাবি করতেন না; রাজনীতিতে তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি, যদিও আমরা দেখেছি তার রাজনীতির অন্তর্গত চালিকা শক্তিটি ছিল আত্মপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে যে, শেষের দিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি এতটাই কৃতসংকল্প হয়েছিলেন- ন্যায় অন্যায়ের পরোয়া করতে চাইতেন না। কলকাতা হত্যাকাণ্ডে তার প্রতিক্রিয়া তেমন হয়নি যেমনটা হওয়া সঙ্গত ছিল। ইস্কেন্দার মির্জার কথা উল্লেখ করেছি। এই সাবেক আমলা আরো জানাচ্ছেন, আলোচনার পথে পাকিস্তান পাবেন কি না এ বিষয়ে সন্দিহান হয়ে জিন্নাহ ভাবছিলেন সংঘর্ষের পথ ধরাটাই হয়তো অবধারিত হবে। সেক্ষেত্রে তার চিন্তায় এসেছিল যে, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এলাকায় একটা গোলযোগ বাধিয়ে দিয়ে পাকিস্তান পাওয়াটাকে নিশ্চিত করবেন। এই উদ্দেশ্যে মির্জাকে তিনি ডেকে পাঠান, মির্জা তখন সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগে জয়েন্ট সেক্রেটারি। জিন্নাহ তাকে বলেন চাকরি ছেড়ে দিয়ে উপজাতীয় এলাকায় গিয়ে ‘জেহাদ’ শুরু করতে। সশস্ত্র লোকদের সাহায্যে হাঙ্গামা সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হয়; ঠিক হয় এ কাজের জন্য ভূপালের নবাব এক কোটি টাকা চাঁদা দেবেন। পরে অবশ্য এই পথে এগোনোটা আবশ্যক হয়নি, কেননা আলোচনার মধ্য দিয়েই কার্য সিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ওই ধরনের চিন্তাকে যে আমলে নেয়া হয়েছিল তাতেই তো বোঝা যায়, জিন্নাহর নীতিনিষ্ঠা যে একেবারে অবিচল ছিল তা নয় এবং শেষ দিকে তিনি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। তার দেহে ক্ষয় রোগের ঘাতক তৎপরতার বিষয়ে তিনি জানতেন এবং তার আশঙ্কা হচ্ছিল যে পাকিস্তান তিনি দেখে যেতে পারবেন না। কথাটা তিনি বলেছেনও। নতুন রাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেল পদে যোগদানের জন্য করাচিতে এসে তার সরকারি বাসভবনের সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তার ব্যক্তিগত সহকারী নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট এস এম আহসানকে তিনি বলেছিলেন, ‘জানো, পাকিস্তান দেখে যেতে পারব এটা আমি কখনোই আশা করিনি।’ এস এম আহসান বাঙালিদের পরিচিত, একাত্তরে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন; গণহত্যায় উৎসাহী নন এই সন্দেহে তাকে সরিয়ে নেয়া হয় এবং তার জায়গায় আসে পাঞ্জাবি জল্লাদ টিক্কা খান।

পাকিস্তান যে একটা অবাস্তব ব্যাপার তা মুসলিম লীগের কেউ কেউ যে বুঝতেন না তা নয়, ব্রিটিশ আমলাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় তারা তেমনটা বলতেনও, কিন্তু জিন্নাহর সামনে যে মুখ খুলবেন এমন সাহস কেউই রাখতেন না। এমনকি লিয়াকত আলী খানের মনেও যে সংশয় ছিল না তা নয়। মাউন্টব্যাটেন জানাচ্ছেন যে, আলোচনার সময় (১৯ এপ্রিল, ১৯৪৭) তিনি লিয়াকতকে একান্তে জানিয়েছিলেন যে, জিন্নাহ ও তার লোকেরা মোটেই বাস্তববাদী নন এবং তাকে কিছুতেই বাস্তবতার মুখোমুখি করানো যাচ্ছে না। জবাবে লিয়াকত যা বলেছিলেন তাতে বড়লাট রীতিমতো বিস্মিত হন। লিয়াকতের বক্তব্য ছিল, “ওভ ুড়ঁৎ ংঃধভভ রিষষ ড়িৎশ ড়ঁঃ বীধপঃষু যিধঃ ঢ়ধৎঃরঃরড়হ সবধহং ধহফ ঃযবহ রভ ুড়ঁ ঢ়ৎবংবহঃ ঃযব ভঁষষ ফরভভরপঁষঃরবং ঃড় গৎ ঔরহহধয, যব রিষষ ড়ভ পড়ঁৎংব ঁহফবৎংঃধহফ ঃযবস, ঃযড়ঁময যব যধং হড়ঃ ড়িৎশবফ ঃযবস ড়ঁঃ ভড়ৎ যরসংবষভ.” কিন্তু জিন্নাহকে কে বোঝায় যে পাকিস্তান হবে ভয়াবহ এক ঘটনা। পাকিস্তানের অসুবিধাগুলো সম্পর্কে জিন্নাহ অবশ্য নিজেই অবহিত হয়েছিলেন, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই সেটা তাকে জ্ঞাত হতে হয়েছিল, নিশ্চয়ই আরো অধিক পরিমাণে জ্ঞাত হতেন যদি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক বছর এক মাস পুরো হওয়ার আগেই তিনি প্রাণত্যাগ না-করতেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছিল জিন্নাহর জন্য অপ্রত্যাশিত বিজয়; কিন্তু জয়ের ঠিক পরেই মনে হলো তিনি হেরে গেছেন। নতুন রাষ্ট্রের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করলেন। স্মরণীয় যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর চৌধুরী রহমত আলীর নাম তো নয়ই, প্রশ্নই ওঠে না, এমনকি কবি ইকবালের নাম তিনি একবারও তার কোনো বক্তৃতা-বিবৃতিতে উল্লেখ করেননি। মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির ধারণা উত্থাপন করলেন যিনি তার অবদান প্রায় মুছেই গেল; ঠিক যে-ভাবে সাতচল্লিশের ক্ষমতা হস্তান্তরের পর নেহরুও সুভাষের ভূমিকার কোনো প্রকার স্বীকৃতি দেননি এবং সুভাষের অবদানকে অস্বীকার করতে পারলেই বোধ করি খুশি হতেন। শরণার্থীদের আর্তনাদ জিন্নাহকে অশ্রæসিক্ত করল। চতুর্দিকে ঘুষ, দুর্নীতি ও কালোবাজারি না-দেখে পারলেন না। পাকিস্তান গড়ার কাজটি সঠিক হয়েছে কি না সে নিয়েও তার মনে সংশয় দেখা দিয়ে থাকবে। সাতচল্লিশের ৩০ অক্টোবর লাহোরের বিশ্ববিদ্যালয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে তাকে বলতে শুনি, কেউ হয়তো বলবেন যে ৩ জুনের পরিকল্পনা গ্রহণটা ভুল ছিল। তবে তার মতে এর কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি ভরসা করছিলেন আল্লাহর ওপর।

ইতিহাস কী বলে? পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা কি ভ্রান্ত ছিল; নাকি সঠিক? ভ্রান্তি যে ছিল তা প্রতিষ্ঠার সময়ে এবং পরবর্তীকালে কোটি কোটি মানুষের দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। অখণ্ড পাকিস্তান দু’খণ্ড হয়েছে, বাকি অংশের মানুষও এখন দুঃসহ যন্ত্রণায় রয়েছেন। জিন্নাহ নিজেও অযতেœ, প্রায় অবহেলায় জীবনের শেষ কয়টি দিন কাটিয়েছেন। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলে তিনি বাঙালির আস্থা হারিয়েছিলেন। কিন্তু তাই বলে পাকিস্তানি শাসকরা যে জিন্নাহকে ভুলেছে তা নয়, যখনই প্রয়োজন দেখা দিয়েছে তখনই তারা তাকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। এমনকি তার ভগ্নি ফাতিমা জিন্নাহকেও। ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার প্রচারাভিযানে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে ‘মাদার-ই-মিল্লাত’কে অংশীদার করা হয়েছিল। পরে ১৯৬৫-তে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নির্বাচনে ফাতিমা জিন্নাহকে প্রার্থী করা হয়েছে, এবার বিরোধী দলের পক্ষ থেকে। সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে যে রাজনৈতিক দল গঠন করেন তার নাম রাখা হয়েছিল মুসলিম লীগ (কায়েদে আজম); মনে করা হয়েছিল যে তাতে সুবিধা হবে।

মুসলিম লীগের তিনি একচ্ছত্র নেতা ছিলেন; তবে সংগঠন হিসেবে তাকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার ব্যাপারে তার যে আগ্রহের অভাব ছিল সেটা আমরা দেখেছি। কিন্তু ১৯৪৮ সালে প্রথম ও শেষবারের মতো যখন ঢাকায় এলেন তখন সরকারি হিসেবে লক্ষাধিক মানুষের মহাসমাবেশে উর্দুর পক্ষে বলতে গিয়ে তিনি মুসলিম লীগ ছাড়া পাকিস্তানে যে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল থাকবে না এই রকমের মতও প্রকাশ করেছেন। বলেছেন,

ডব যধাব ধং ধ ৎবংঁষঃ ড়ভ ঁহপবধংরহম বভভড়ৎঃ ধপযরবাবফ চধশরংঃধহ ধভঃবৎ ঃবহ ুবধৎং. ওঃ রং গঁংষরস খবধমঁব যিরপয যধং ফড়হব রঃ. [...] ঘড়ি রঃ রং ধ ংধপৎবফ ঃৎঁংঃ রহ ুড়ঁৎ যধহফং. ওং ঃযরং ংধপৎবফ ঃৎঁংঃ ঃড় নব মঁধৎফবফ নু ঁং ধং ঃযব ৎবধষ পঁংঃড়ফরধহ ড়ভ ঃযব বিষভধৎব ড়ভ ড়ঁৎ হবি পড়ঁহঃৎু ধহফ ড়ঁৎ ঢ়বড়ঢ়ষব ড়ৎ হড়ঃ. অৎব সঁংযৎড়ড়স ঢ়ধৎঃরবং ষবফ নু সবহ ড়ভ ফড়ঁনঃভঁষ ঢ়ধংঃ ঃড় নব ংঃধৎঃবফ ঃড় ফবংঃৎড়ু যিধঃ বি যধাব ংবপঁৎবফ?

এ পর্যন্ত এসে শ্রোতাদের তিনি নাটকীয়ভাবে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তারা পাকিস্তানে বিশ্বাস করেন কি না। স্বভাবতই সবাই বলেছেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। পরের প্রশ্ন পাকিস্তানের কোনো অংশ ভারতের অংশ হয়ে যাক এটা কাম্য কি না। সমস্বরে ধ্বনিত উঠেছে, না, না। তখন তিনি জানালেন, “ডবষষ, রভ ুড়ঁ ধৎব মড়রহম ঃড় ৎবপড়হংঃৎঁপঃ চধশরংঃধহ, ঃযবহ ও ংধু ঃযধঃ ঃযব যড়হবংঃ ঃধংশ ভড়ৎ বাবৎু গঁংষরস রং [...] ঃড় ংবৎাব ঃযব গঁংষরস খবধমঁব ঃড় ঃযব নবংঃ ড়ভ যরং ধনরষরঃু [...] ঊাবৎু গঁংষরস ংযড়ঁষফ পড়সব ঁহফবৎ ঃযব নধহহবৎ ড়ভ গঁংষরস খবধমঁব.” গান্ধী চাইছিলেন কংগ্রেসকে অবলুপ্ত করতে; জিন্নাহ বলছেন মুসলিম লীগকে একমাত্র করে তুলতে; কথাটা তার পরে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন তারাও বলেছেন। ঢাকার ওই জনসভায় জিন্নাহ আরো একটি উক্তি করেছিলেন, সেটা হলো, “ছঁরঃব ভৎধহশষু ধহফ ড়ঢ়বহষু ও সঁংঃ ঃবষষ ুড়ঁ ঃযধঃ ুড়ঁ যধাব ধসড়হমংঃ ুড়ঁ ধ ভবি পড়সসঁহরংঃং ধহফ ড়ঃযবৎ ধমবহঃং ভরহধহপবফ নু ভড়ৎবরমহ যবষঢ়, ধহফ রভ ুড়ঁ ধৎব হড়ঃ পধৎবভঁষ ুড়ঁ রিষষ নব ফরংৎঁঢ়ঃবফ.” কংগ্রেস নেই তাতে কী, কমিউনিস্ট ও বিদেশি চররা তো রয়েছে; ওই জুজুর ভয় দেখানোর কাজটা কায়েদে আজমই শুরু করে দিলেন, পরবর্তী শাসকরাও ওই ধ্বনি দিতে কসুর করেননি।

শিবরাম চক্রবর্তীর একটি গল্পে আছে পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন একদিন গল্পের কলকাতাবাসী নায়ক ভুল ট্রামে চেপে শোনেন ভেতরে আওয়াজ হচ্ছে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদে’র, বিভ্রান্ত নায়ক ভুল করে শুনেছেন লোকেরা বলছে ‘পাকিস্তান জিন্নাবাদ’। শুনে তিনি সাড়া দেননি, কেননা তার মনে হয়েছে জিন্নাহকে বাদ দিয়ে পাকিস্তান চাইবার আওয়াজ দিলে কাজটা বিপজ্জনক বলে গণ্য হতে পারে। জিন্নাহ ও পাকিস্তান এ সময়ে অভিন্ন ছিলেন বৈকি, তবে তাদের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা শুরু হয়ে গেছে পাকিস্তানের জন্মমুহূর্ত থেকেই। সেটা আসলে অনিবার্যই ছিল।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App