×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি

অসচেতনতাই হচ্ছে বৃক্ষ নিধন

Icon

রনি সরকার

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘ছাড়পত্র’ কবিতার অমর বাণীগুলো আজ মিথ্যা হতে চলছে। আমরা এ বিশ্বকে বাসযোগ্য করে তুলছি না, বরং পৃথিবীকে বসবাসে অকার্যকর করতে নানারকম ফন্দি-ফিকিরের আয়োজন করছি প্রতিনিয়ত। আইপিসিসির রিপোর্ট অনুযায়ী- ১৯৫০ সালের পর থেকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর জলবায়ু যেভাবে বদলে গেছে তার জন্য মূলত মানুষই দায়ী। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘এখনই কিছু করুন, না হলে সংকটের ঝুঁকিতে থাকুন।’ জাতিসংঘের বৈশ্বিক উষ্ণতাবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) গবেষণায় আরো দেখা যায়- আমাদের গ্রহটি আগামী ১০ বছরের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির চূড়ান্ত সীমা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। যা হবে প্রাক-শিল্পযুগের মাত্রার থেকেও বেশি। এতে জলবায়ু পরিস্থিতি অস্বাভাবিক রূপ নেবে। বিশেষ করে চরম দুর্ভিক্ষ, দাবানল, বন্যা ও সেই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের খাদ্য সংকটের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেবে। সাম্প্রতিক চলমান দাবদাহ থেকে মুক্তি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে দেশের একটি স্বনামধন্য ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ ১০ দিনে ৫ লাখের অধিক বৃক্ষরোপণ করেছে। এজন্য ছাত্রলীগকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, গাছ লাগানো পরিবেশের জন্য যতটা সহায়ক, ব্যক্তিসচেতনতা এর চেয়ে শতগুণ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা সচেতন নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পরিবেশের মর্মান্তিক ক্ষতি করছি। সম্প্রতি দিনাজপুর টু ঢাকা রেলভ্রমণে আমরা এমন চিত্র দেখতে পেয়েছি। শহরগুলোর পাশে অবস্থিত বড় বড় পুকুর ও জলাশয়গুলো ভরাট করা হচ্ছে। গড়ে তোলা হচ্ছে বিশাল বিশাল ইমারত। নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী- একটি বিশাল বাসা বা শপিংমল কমপ্লেক্স স্থাপনের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পুকুর বা জলাশয় রাখতে হবে, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য। যাতে করে এই স্থাপনায় অগ্নিদুর্ঘটনা সংঘটিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে এই জলাশয়কে ব্যবহার করা যায়। পক্ষান্তরে নিকটস্থ জলাশয় থেকে বাতাসে প্রচুর জলীয়বাষ্প আসে, ফলে দাবদাহে মানুষ কিছুটা স্বস্তি বোধ করে। আমাদের দেশ নদীমাতৃক দেশ। অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যার সুষ্ঠু বণ্টন নীতি তদারকির অভাবে শুকনো মৌসুমে আমাদের দেশের নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে প্রতি বছর বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার একর ফসলি জমি মরুভূমিতে পরিণত হয় এবং নদীগুলো পানি শূন্য হওয়ায় বাতাসে জলীয়বাষ্পের স্বল্পতাও দেখা দেয়। তাই নদীগুলো এখন আমাদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অনেকটা অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ থেকে ৭-৮ বছর আগে গ্রামের লোকজন তীব্র তাপপ্রবাহে রাস্তার পাশে বড় বড় বৃক্ষের নিচে টং বা চৌকি তৈরি করত। সারারাত সেখানে লোকজন আড্ডার পাশাপাশি গল্প-গুজবে মেতে উঠত। কিন্তু এখন গ্রামগুলোতে অসহনীয় পর্যায়ের তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে শুধু এসব বড় বড় বৃক্ষ নিধনের জন্য।

গ্রামে পল্লী বিদ্যুতের প্রসার ঘটানোর ফলে রাস্তার দুধারে বৃক্ষগুলো নির্মমভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। এমনকি পরিবেশবন্ধু তালগাছগুলোকেও উপড়ে ফেলতে হয়েছে- এই বিদ্যুৎ শিল্পের বিকাশ ঘটানোর জন্য। যার ফলে, অস্বাভাবিকভাবে বৃক্ষ নিধন করায় চলমান তাপপ্রবাহে এখন শহরের মতো ছোট ছোট গ্রামগুলোও ক্রমান্বয়ে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা অনুধাবন করছি; দেশের সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। কিন্তু দেশের চিরাচরিত সম্পদগুলোকে এভাবে ধ্বংস করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা- আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।

রনি সরকার : শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App