×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

বিশ্ব শান্তি মিশনে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র কেন?

Icon

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব শান্তি মিশনে বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র কেন?

বিশ্বে নিজেদের ক্ষমতার প্রভাব বলয়কে ঠিক রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানারকম নিষেধাজ্ঞাকে নিজেদের কর্তৃত্ববাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বহুপাক্ষিক বিশ্বে নিষেধাজ্ঞা পাল্টা নিষেধাজ্ঞা যদিও এখন একটি ভোঁতা অস্ত্র। নিজেদের প্রভাব বলয় ধরে রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করছে নানান কূটকৌশল, যার একটি হচ্ছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নামে এনইডির (ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি) মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও তাদের লালিত কিছু সুশীলকে মোটা অঙ্কের অর্থায়নের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন বা কোনো ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করার জোর প্রচেষ্টা। আর এই এনইডির (ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি) পেছনে রয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। বিতর্কিত গণমাধ্যম নেত্র নিউজ যে এনইডির অর্থায়নে চলে তা স্বীকার করে গেছেন নেত্র নিউজ ছেড়ে যাওয়া ডেভিড বার্গম্যান, যিনি বিতর্কিত এ সংবাদ মাধ্যমটির ইংরেজি বিভাগের সম্পাদক ছিলেন। ঘটনা পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে নেত্র নিউজের বিতর্ক ছড়ানোর জালে এখন সম্পৃক্ত হয়েছে জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলে বাংলা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নেত্র নিউজ ও ডয়চে ভেলের সাম্প্রতিক প্রকাশিত প্রতিবেদন “ঞড়ৎঃঁৎবৎং ফবঢ়ষড়ুবফ ধং টঘ ঢ়বধপবশববঢ়বৎং” এবং ইউটিউব ভিডিও ডকুমেন্ট “ঋৎড়স ঃড়ৎঃঁৎবৎং ঃড় ঢ়বধপবশববঢ়বৎং” যা বাংলাদেশবিরোধী নতুন ষড়যন্ত্র। যেখানে টার্গেট করা হয়েছে শান্তিমিশনে কর্মরত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের, আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব) জড়ানো হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকেই একে বাংলাদেশবিরোধী নতুন ষড়যন্ত্র বললেও তা মোটেও নতুন নয়। র‌্যাবকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টা ২০১৪-১৫ সাল থেকে একটি চক্র বারবার করে আসছিল। বলা যেতে পারে নতুন মোড়কে পুরনো বিষ।

ডয়চে ভেলের বিতর্কিত প্রতিবেদনটি সবার মনে প্রশ্ন তোলে কয়েকটি ঘটনার সরলীকরণের মধ্য দিয়ে। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্র সচিব ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফর করেন ১৪-১৫ মে, ২০ মে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির পরের দিনই ২১ মে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এটাকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন থেকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে বাদ দেয়ার নতুন ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখছেন অনেকে। এর সঙ্গে মার্কিন মদদের একটি যোগসূত্রও দৃশ্যমান। বিশেষ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতি তাদের এ তথ্যচিত্রকে আরো বিতর্কিত করেছে। কারণ তারা মানবাধিকার মুখোশের আড়ালে ডোনার কান্ট্রিগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও অন্য দেশে নগ্ন হস্তক্ষেপ করে।

বাস্তবতা হচ্ছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ একটি বড় অংশীদার। ৩৭ বছর ধরে ব্লæ-হেলমেটের গৌরবান্বিত অধ্যায় বিশ্বের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। একটি মহল জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী থেকে বাংলাদেশি সদস্যদের বাদ দিতে অপতৎপরতা শুরু করেছে।

১৯৮৮ সালে সেনাবাহিনীর ১৫ সদস্যের একটি পর্যবেক্ষক দল ইরাক-ইরান শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যোগ দেয়। এর মাধ্যমে জাতিসংঘের পতাকাতলে শান্তিরক্ষা মিশনে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ। এক বছর পর ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ পুলিশ নামিবিয়ায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যোগ দেয়। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী মোজাম্বিক এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনী বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে ৩৭ বছর ধরে শান্তিরক্ষা মিশনে সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছে সশস্ত্র বাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ। সিয়েরা লিওনের জনগণ এখনো বাংলাদেশি সশস্ত্রবাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বর্তমানে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর মোট কয়েকটি মিশনে ছয় হাজারের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিয়োজিত রয়েছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী তাদের মিশন শেষ করেছেন। তাছাড়া মিশন এলাকায় সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত ১৬৮ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আহত হয়েছেন ২৬৬ জন। বিশ্বের ৪৩টি দেশে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা কাজ করেছেন।

ডয়চে ভেলের এ প্রতিবেদনে র‌্যাবকেও বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যারা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নির্মূলে ২০০৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি টানা ৩৩ ঘণ্টার অভিযানে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) আমির শায়খ আবদুর রহমানকে সিলেটের শাপলাবাগ থেকে গ্রেপ্তার করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই অভিযানটি সবচেয়ে বড় সাফল্য বাহিনীটির। পরে গ্রেপ্তার করা হয় সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানিসহ বিপুলসংখ্যক জঙ্গি। সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য এলাকায় নতুন জঙ্গি সংগঠনের মুখোশ উন্মোচন ও তাদের গ্রেপ্তারেও র‌্যাবের ভূমিকা প্রশংসনীয়। বর্তমানে জামায়াতুল আনসার আল হিন্দাল শারক্বীয়ার অপতৎপরতা উদঘাটনেও র‌্যাবের অগ্রণী ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্তকরণে বা মাদক চোরাচালান বন্ধেও এ বিশেষ বাহিনীর আছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাদের অর্থলগ্নি লবিস্টরা মার্কিন প্রশাসনকে ভুল তথ্য দেয়ার মাধ্যমে মিথ্যা বুঝিয়ে র‌্যাবের বিরুদ্ধে ক্রমাগত কানভারী করে যাচ্ছে চক্রটি।

এ চক্রের পেছনে যারা কাজ করছে তারা সবসময়ই বাংলাদেশকে পেছনে টেনে ধরতে চেয়েছে, কখনো গ্রেনেড হামলা, কখনো বোমা হামলা-গুলি, সবকিছুতে ব্যর্থ হয়ে এখন করছে লবিস্ট নিয়োগ, বিদেশি সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের ওপর নির্ভর করে বিশ্ব শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পথ রুদ্ধ করতে পারবে না। কারণ এরই মধ্যে বিশ্বে তারা শান্তি ও সৌহার্দ্যরে দূত হিসেবে নিপীড়িত মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

তানজবি রহমান : লেখক ও গবেষক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App