×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

প্রথম অর্থ সচিবের চোখে কীর্তিমান দুই সিভিল সার্ভেন্ট

Icon

ড. এম এ মোমেন

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথম অর্থ সচিবের চোখে কীর্তিমান  দুই সিভিল সার্ভেন্ট

মোহাম্মদ মতিউল ইসলাম, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থ সচিব। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে পড়াশোনা ও আর্টিকেলশিপ শুরু করলেন। বড় ভাই নুরুল ইসলাম ১৯৫০ সালে সিএসপি হলেন (পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর); মতিউল ইসলামও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসলেন এবং ১৯৫২ সালে সিএসপি উত্তীর্ণ হয়ে কর্মজীবন শুরু করলেন। ইংরেজিতে লিখিত তার স্মৃতিকথা ‘রিকালেকশনস অব অ্যা সিভিল সার্ভেন্ট টার্নড ব্যাংক’-এর স্মৃতিস্মরণ অধ্যায়ের দুজন কীর্তিমান সিভিল সার্ভেন্ট নুরুল ইসলাম ও ওবায়দুল্লাহ খান অংশের অনুসৃতি তুলে ধরা হচ্ছে। ওবায়দুল্লাহ খান এ দেশের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। দুজনই তার সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ- নুরুল ইসলাম বড় ভাই এবং ওবায়দুল্লাহ খান ভায়রা- শ্যালিকার স্বামী।

মো. নুরুল ইসলাম, গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক

পেশাগত সিভিল সার্ভেন্ট, ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করা মো. নুরুল ইসলাম কর্মজীবনের শেষ ১০-১১ বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করে ৬১ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে এসেছেন, আরো ৪ বছর তিনি অনায়াসে থাকতে পারতেন। এ ধারাটি তার চরিত্রের মধ্যেই নিহিত। তিনিই একমাত্র সিভিল সার্ভেন্ট যিনি নির্বাহী বিভাগের জৌলুস ছেড়ে বিচার বিভাগে যোগ দিতে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু তাকে এ কারণে নির্বাচিত করা হয়নি যে সরকার নির্বাহী বিভাগে থেকে বিচার বিভাগের জন্য তাকে ছাড়তে কোনোভাবেই রাজি নয়। সম্ভবত তিনিই একমাত্র সিভিল সার্ভেন্ট যিনি অর্থমন্ত্রী বা উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব দুবার প্রত্যাখ্যান করেছেন। একবার ১৯৮২ সালে সামরিক আইন জারি করার পরপরই এবং ১৯৯১ সালে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ তার অন্তর্বর্তীকালের মন্ত্রিসভায় তাকে উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দিতে বলেছিলেন।

একজন আত্মবিলোপী ব্যক্তিত্ব ১৯৫০ সালে সিভিল সার্ভিসে যোগদানের আগে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য আর্থিক সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে তাকে লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৪৬ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তে কলকাতা গেলেন, কিন্তু পরিবার থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা না পেয়ে তার প্রত্যাশা পূরণ হলো না। এজি অফিসে একটি ছোট চাকরি নিতে বাধ্য হলেন এবং এর সঙ্গে আরো কিছু আয় যোগ করতে খান বাহাদুর মাহাবুবউদ্দিন আহমদের সন্তানদের সন্ধ্যায় টিউশনির দায়িত্বও নিলেন।

তিনি বরাবরই নিজের শরীরের প্রতি উদাসীন ছিলেন, কলকাতার জীবনও তার সঙ্গে খাপ খায়নি। তিনি পার্বত্য অঞ্চল বেছে নিলেন, চাকরি ছেড়ে দিলেন এবং দার্জিলিং পৌঁছলেন, সেখানে গভর্নমেন্ট হাউসের কেয়ারটেকারের বাসায় অতিথি হয়ে ৮-৯ মাস কাটালেন। বিনিময়ে তার সন্তানদের পড়ানোর ভার তার কাঁধে।

১৯৪৭-এ ভারত ভাগের ঠিক আগে তিনি বরিশাল ফিরে এলেন, যেখানে ছিলেন সেখানেই; কিন্তু তিনি আশা ছাড়লেন না। তিনি বরিশাল জিলা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলেন, ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সঞ্চয় করলেন; কিন্তু ভাগ্য তার অন্যত্র, তিনি ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তার মাস্টার্স আর সম্পন্ন হলো না।

তার চাকরি জীবনে তিনি হয়ে উঠেন সততা ও সাহসের উদাহরণ ও প্রতীক। চট্টগ্রামে ইমপোর্ট ও এক্সপোর্ট কন্ট্রোলার হিসেবে বাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের যারা শিল্প স্থাপনের দিকে আগ্রহী তাদের জন্য উদার নীতি অবলম্বন করে সহজে তাদের আমদানি লাইসেন্স দিয়েছেন। কিন্তু এই উদ্যোগ তাকে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে অজনপ্রিয় করে তোলেনি। ইসলামাবাদে চিফ কন্ট্রোলার অব ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট হিসেবে তিনি যখন দেখলেন বাণিজ্য সচিব একজন বাঙালি সিভিল সার্ভেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছেন তিনি তার আবেদনে নিজেকেই অন্যত্র সরিয়ে দেয়ার কথা বলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী নবাব অব হোতি আবদুল গফুর খান তাকে ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানালেন।

১৯৭২ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাকে টিসিবির চেয়ারম্যান নিয়োগ করলেন। অর্থ সচিব হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠনের জন্য দক্ষ কারো প্রয়োজন ছিল। ইসলামাবাদে সেন্ট্রাল বোর্ড অব রেভেনিওতে চাকরির অভিজ্ঞতা থাকায় নুরুল ইসলামের ওপর আমার নজর পড়ল। কিন্তু টিসিবির কাজে নুরুল ইসলাম ছাড়া অন্য কাউকে বিশ্বাস করতে প্রধানমন্ত্রী অস্বীকৃতি জানালেন। একটি সমঝোতা করা হলো। টিসিবির দায়িত্বের অতিরিক্ত তিনি এনবিআরের চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করতে থাকলেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে তার চাকরির অভিজ্ঞতায় নুরুল ইসলাম তখনই বুঝতে পারলেন জরুরি কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি যদি নিরবচ্ছিন্ন রাখা না যায় তাহলে দেশে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ভয়ংকর সংকট ও অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্যসামগ্রীর অভাবের মোকাবিলা করবে। তিনি নিজ উদ্যোগে ‘পরে মূল্য পরিশোধ’- ডেফার্ড পেমেন্ট নীতি অবলম্বন করে বিপুল পরিমাণ আমদানি কর্মসূচি হাতে নিলেন এবং সংকট এড়িয়ে যেতে সক্ষম হলেন।

তার মেজাজের সঙ্গে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি খাপ খেয়েছিল তার শেষ দায়িত্বটি- বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ১ হাজার ৫০০ বর্গফুট পর্যন্ত ছোট ফ্ল্যাটের বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ৫ শতাংশ সুদে ৩০ বছরে প্রদেয় ৯০ ভাগ অর্থ ঋণ হিসেবে প্রদান করতে এগিয়ে এলো। একই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই কর্মসূচিকে সহায়তা করতে ২ হাজার বর্গফুট পর্যন্ত ফ্ল্যাটের আয়ের ওপর প্রদেয় কর ৫ বছরের জন্য মওকুফ করে দিল। এই কর্মসূচি মেট্রোপলিটন শহর ঢাকা ও অন্যত্র মধ্যবিত্তের পক্ষে ব্যয় নির্বাহ সম্ভব ক্রমবর্ধমান চাহিদার এমন হাউজিং প্রকল্পের বহুলাংশের বাস্তবায়নে সহায়তা করল।

কিছু সময় ধরে তার শরীর ভালো যাচ্ছিল না। ১৯ ডিসেম্বর ২০০৭ আধো অজ্ঞান অবস্থায় তাকে স্কয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। জ্ঞান আর ফিরেনি, ২২ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে আমি কেবল একজন ভাইকেই হারাইনি, একজন অভিভাবক ও একজন সদা-উপকারী ব্যক্তিত্বকেও হারাই।

কিংবদন্তির কথক : এ জেড এম ওবায়দুল্লাহ খান

কোমাতে চলে যাওয়ার ১৩ মাস পর ১৯ মার্চ ২০০১ এ জেড এম ওবায়দুল্লাহ খান ইন্তেকাল করলেন। আমি শেষবারের মতো তার মুখের দিকে তাকালাম। সেখানে একজন পণ্ডিতের অবয়ব; শান্তি ও স্নিগ্ধতায় ঘুমিয়ে আছেন। সেই বেদনা ও যন্ত্রণা মিলিয়ে গেছে, যা আমি তার অবয়বকে দেখেছি; ১৩ মাস ধরে যখনই তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়েছি নিবিড়ভাবে, একদা প্রাণবন্ত ও সাহসী মানুষটিকে দেখেছি শুয়ে আছেন অসহায়, নিজেকে প্রকাশ করতে পারছেন না, নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়তে পারছেন না এবং এমনকি ধরে আসা কণ্ঠও পরিষ্কার করতে পারছেন না। কখনো কি তিনি তার গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠে বলবেন, তার সব গুণাবলি থেকে বঞ্চিত অবস্থায় তিনি কেমন অনুভব করছেন, কতটা কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি কখনো তা আর বলতে পারেননি, কিন্তু তার চেহারার তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আমাদের সবই বলে দিয়েছে। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাকে সব যাতনা ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।

নয়াদিল্লিতে একটি সেমিনারে গিয়ে ওবায়দুল্লাহ মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন। নয়াদিল্লিতে হাসপাতালে যাওয়ার বদলে তিনি দ্রুত ঢাকার চলে এলেন মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ থেকে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে। তিনি সর্বশেষ যে কাজটি করেছিলেন তা হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রে পাঠরত কন্যা কাকলিকে ফোন করে শুভ জন্মদিন জানানো, তারিখটা ১৪ ফেব্রুয়ারি।

ওবায়দুল্লাহ খানের মা আমার নানি, আমার মায়ের ফুপু, নানি যখন মারা যান আমার মা তার শয্যাপাশেই ছিলেন। কেবল সেন্টু নন (ওবায়দুল্লাহ খান), তার অন্য ভাইয়েরাও সব সময় আমাকে মনু মামা সম্বোধন করতেন। এই সম্পর্কটি বদলায়নি, যদিও সেন্টু ১৯৭৭ সালে আমার শ্যালিকাকে বিয়ে করেন। সব সময়ই তার জন্য ও তার ভাইদের জন্য আমার অন্তরে একটি বিশেষ স্থান সংরক্ষিত ছিল। চিনু (সাদেক খান) যখন সিনেমা পরিচালক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আমি তাকে পরামর্শ দিলাম প্রথমে কক্সবাজারের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র বানিয়ে হাত পাকিয়ে নিতে। আমি চট্টগ্রামের ডিসি হিসেবে এ কাজের জন্য তাকে নিয়োগ করেছিলাম। যখন মিন্টু (এনায়েতউল্লাহ খান) তার কর্মজীবনের শুরুতে ইএসএসওতে কাজ করছিলেন। তিনি চাইলেন আমি শিক্ষা সচিব হিসেবে মতিঝিল ইস্পাহানি বিল্ডিংয়ে তার জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে একটি বৈঠক করি, আমি সানন্দে সেখানে যাই। নিজের কর্মজীবন এগিয়ে নিতে ওবায়দুল্লাহ খানের কোনো সহায়তার প্রয়োজন ছিল না। তিনি বরাবরই ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

বিচারপতি মোস্তফা কামাল এবং ওবায়দুল্লাহ স্কুলে সমসাময়িক ছিলেন। তারা দুজন বন্ধু ছিলেন আবার পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান দখল করার প্রশ্নে প্রতিযোগীও ছিলেন। ওবায়দুল্লাহর মৃত্যুর কদিন আগে বিচারপতি মোস্তফা কামাল স্মৃতিচারণ করছিলেন কেমন করে তার আর সেন্টুর মধ্যে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান নিয়ে প্রতিযোগিতা চলত। যখন ওবায়দুল্লাহ প্রথম হতেন তখন মোস্তফা খুব কাছাকাছি নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় হতেন কিংবা উল্টোটাও ঘটত। মোস্তফা কামালের কথায় ওবায়দুল্লাহ ছিলেন একজন জিনিয়াস। মেট্রিক পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে আমি তাকে সর্বোচ্চ স্থান পাওয়া নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, দুই সপ্তাহ সময় দিন তারপর জবাব দেব। এক সপ্তাহ আগেই জবাব এলো, আর তিনি সত্যিই প্রথম স্থান অধিকার করলেন। যে পরীক্ষা তখনো হয়নি এবং যে পরীক্ষায় সারাদেশের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী অংশগ্রহণ করছে সেখানে নিজের ফলাফল আগাম জানাতে অবিশ্বাস্য আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন হয়। আমার সময়ে আমিও কখনো কখনো পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থানটি পেয়েছি; কিন্তু পরীক্ষায় ফল প্রকাশের আগে তা কখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।

ওবায়দুল্লাহ কখনো কোনো ধরনের জটিলতায় ভুগতেন না, এমনকি চাকরির গø্যামারও তাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। যদি তিনি কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, পল্লী উন্নয়ন একাডেমির আকতার হামিদ খান তাকে একাডেমির পরিচালক হতে বললেন। একজন এডিসির পদের যে গø্যামার তা সেখানে নেই, তবু ওবায়দুল্লাহ খান তাৎক্ষণিকভাবে তা গ্রহণ করলেন আর এটাই হয়ে দাঁড়াল তার চাকরিজীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট। তিনি পল্লী উন্নয়নের একজন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেন। সত্তরের দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশ সরকারের কৃষি সচিব নিযুক্ত হওয়ার আগে বিশ্বব্যাংক একটি পল্লী উন্নয়ন মডেল সৃষ্টি করতে তার বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সহায়তা নিয়েছে, অনেক দেশে এই মডেল বাস্তবায়িত হয়েছে। আমি সে সময় বিশ্বব্যাংকে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক, আমি দেখেছি ব্যাংকের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তার বিশেষজ্ঞ অভিমত গ্রহণের জন্য ঢাকা যাচ্ছেন।

অসাধারণ একজন ভদ্রলোক ওবায়দুল্লাহ সব সময়ই তার অধঃস্তন কর্মকর্তাদের প্রতি খুবই সৌজন্যমূলক আচরণ করতেন, জ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কখনো তাদের ‘স্যার’ সম্বোধন করতে ভুলে যাননি। জেলা প্রশাসন কাঠামোতে নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে ডেপুটি কমিশনারই মধ্যমণি; কিন্তু বিচার বিভাগের প্রধান জেলা ও সেশনস জজ বরাবরই উপেক্ষিত ব্যাকবেঞ্চার ছিলেন, উপেক্ষিত কর্মকর্তারা ডেপুটি কমিশনারকে এড়িয়ে চলতেন। এই স্বাভাবিক ধারার এক ব্যতিক্রম কুমিল্লার জেলা ও সেশনস জজ শাহাবুদ্দিন আহমেদ, তিনি সিনিয়র সহকর্মী হিসেবে সর্বাধিক সৌজন্য, সম্মান ও শ্রদ্ধা লাভ করেছেন; এটাই তার প্রাপ্য ও বটে। যখন ওবায়দুল্লাহ মৃত্যুবরণ করলেন তখন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি শাহাবুদ্দিন তার সেই আচরণের প্রতিদান দিতে তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, মরহুমের জন্য ফাতেহা পাঠ করলেন।

শেখ মুজিব কলকাতা ময়দানে সংক্ষিপ্ত ভাষণে লাখ লাখ মানুষের সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে পঙ্ক্তিমালা আবৃত্তি করে বক্তব্য শেষ করেছিলেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নিয়ে লেখার জন্য তার একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রয়োজন ছিল। আমাদের ধানমন্ডির বাসায় মধ্যাহ্নভোজ করা সময় আমি রবীন্দ্রনাথের পঙ্ক্তিগুলো অনুবাদ করে দিতে ওবায়দুল্লাকে বললাম। তিনি কয়েক সেকেন্ড ধরে পঙ্ক্তিগুলোর ওপর চোখ রাখলেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে যে ইংরেজি অনুবাদ উপস্থিত করলেন তা আমার নিবন্ধের মূল্য অনেক বাড়িয়ে দিল। ঠাকুরের পঙ্ক্তি ও ওবায়দুল্লাহর অনুবাদ :

রিক্ত আমি নিঃস্ব আমি

দেবার কিছু নাই

আছে শুধু ভালোবাসা

দিলাম আমি তাই।

ও যধাব হড় ধংংবঃ হড়ৎ ধহু ঃৎবধংঁৎব

ঘড়ঃযরহম ঃযধঃ ও পধহ মরাব

ণবঃ ষড়াব রিঃযরহ সব রং নড়ঁহফষবংং

অহফ ঃযধঃ ও ড়ভভবৎ রিঃয ধষষ সু নবরহম.

আবেগের দিক থেকে অন্য যে কোনো মৃতের চেয়ে আমি তাকেই বেশি হারাই। আরো একবার যখন ঠাকুরের ভারত তীর্থ অনুবাদ করার প্রয়োজন হলো, মনমোহন সিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য চিঠিতে উদ্ধৃত করার জন্য, আমি তাকে আবার মিস করি। এবার আমি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এক বন্ধুর শরণাপন্ন হই, বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর তিনি যা দিলেন, তা কেবল চালিয়ে নেয়ার মতো অনুবাদ।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App