×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

যা হচ্ছে, ঠিক হচ্ছে?

Icon

সুধীর সাহা

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যা হচ্ছে, ঠিক হচ্ছে?

অনেক ভেবে দেখলাম- এ পোড়া দেশে খাবার, পানি, বাসস্থান কোনো কিছুরই অভাব নেই। সবকিছুই পর্যাপ্ত আছে, শুধু অভাব রয়েছে দুর্নীতির। সেই দুর্নীতির অভাব ঘোচাতে রাত-দিন কাজ করে যাচ্ছেন কিছু মহান অধিকর্তা, কিছু মহান জনপ্রতিনিধি। আমরা বাংলাদেশের বোকা বোকা বাঙালিরা বরাবরই নীতিপরায়ণ ছিলাম, হালে দুর্নীতিবাজ হয়েছি। আবার এমন কিছু জিনিস আছে, যা আমরা দেখি কিন্তু খেয়াল করি না। এমন কিছু জিনিস আছে, যা আমরা পড়ি কিন্তু সেগুলো আমাদের মনে সেভাবে দাগ কাটতে পারে না। আবার এমন কিছু জিনিস আছে, যা আমাদের চঞ্চল করে তোলে কিন্তু আমরা পাত্তা দিই না। বাঙালিদের অস্তিত্বের বাস্তবতা এটিই, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে দরিদ্র মানুষ, যারা বৈষম্য আর নীতিহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে অনবরত। তাদের সে লড়াই ইদানীং একপেশে হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথাকথিত সুবিধাভোগী ‘এলিট শ্রেণি’ বলে খ্যাত দলটি এখন নানা সুবিধার বেড়াজালে জড়িত হয়েছে। তাই কারো চেহারাই আর অন্যরা দেখতে পাচ্ছে না; মিলেমিশেই সব কাজ সুচারুভাবে করছে। টু শব্দটি নেই কোনোদিকে। একেবারেই সব শান্ত- যেন শান্ত পুকুরের শান্ত জল। বাতাস দেয়ারও কেউ নেই, তাই ঢেউও কোথাও নেই। সমস্যা বাধায় ওই বিদেশিরা মাঝেমধ্যে; ঘেঁটে-ঘুঁটে বের করে দেয় সব গোপন কথা।

যুক্তরাষ্ট্রের কী দায় ছিল- আমাদের এত প্রিয়, এত মহান ব্যক্তির নামে দুর্নাম রটানোর? আরে, নিষেধাজ্ঞা দিতে হয়- দে। অফিসের কেরানী সাহেবকে যত পার নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে ফেলে দাও না, কে বাধা দিচ্ছে। কিন্তু না, নিষেধাজ্ঞা দেবে একেবারে বড় সাহেবের বিরুদ্ধে। আর বড় সাহেবরা তো বিপদে পড়বেনই। আগাম নোটিস তো ছিল না! তাছাড়া দেশেরটা জানা থাকলেও আমেরিকাকে ম্যানেজ করার মন্ত্রও আবার তাদের জানা নেই। তাই বাধ্য হয়ে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার দায় নিতেই হয়েছে। বেনজীর আহমেদ র‌্যাবের ডিজি ছিলেন, আইজিপি ছিলেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বর র‌্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় আমেরিকা। এক নম্বরেই নাম থাকে বেনজীর আহমেদের। বেনজীর আহমেদের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের বিষয়ে সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং লোকমুখে; এরপর থেকেই সব সময় আলোচনা ছিল। বিষয়টি সবার জানা থাকলেও জানা ছিল না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকার, দুদক কিংবা আদালতের। পুলিশের সবচেয়ে বড় কর্মকর্তা তিনি। তার বিরুদ্ধে কথা তোলে কী করে পুলিশ! বরং র‌্যাবের ডিজি থেকে সম্মানের সঙ্গে পুলিশ প্রধানের পদ দিয়ে ধন্য হয়ে যায় সরকার বাহাদুর। সবই ঠিকঠাক চলছিল। কোথাও কোনো সমস্যা ছিল না। অবসরের পর দিব্যি ছিলেন বেনজীর আহমেদ। কিন্তু দুদকের ডাক পড়ল কোনো এক অদৃশ্য সুতার টানে। দুদকের আহ্বানে আদালত বেনজীর আহমেদের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করার আদেশ জারি করে চমকে দিল হঠাৎ করে বাংলাদেশের সেই বোকা বোকা মানুষগুলোকে।

জেনারেল আজিজ আহমেদ ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। জেনারেল আজিজের দুর্নীতি নিয়ে সব সময়ই লোকমুখে আলোচনা ছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর প্রধানের পদের ভারে তার সাজাপ্রাপ্ত ভাইয়ের শাস্তি মওকুফের হাত বাড়াতেও কুণ্ঠা করেননি দেশের প্রেসিডেন্ট। দেশের সব ঠিকঠাক থাকলেও এবার কিন্তু তিনি ধরা খেলেন সেই আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা থেকেই। এবার দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে আজিজ আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল আমেরিকা। সপরিবারে আমেরিকা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। আমেরিকা স্পষ্ট করে বলেছে, আজিজ আহমেদ বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি এড়াতে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দুর্নীতিতে জড়িয়ে যাওয়ার কাজটি করেছিলেন। সরকারি কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দিতে এবং সরকারি নিয়োগ বিনিময়ে তিনি ঘুষ নিয়েছেন- এমন বক্তব্য আমেরিকা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছে।

কী দুর্ভাগ্য! কপাল যখন পুড়ে, একসঙ্গেই যেন সব হয়। এমন খারাপ সময়ে আরো খারাপ সংবাদ। সরকারের জন্য খারাপ সংবাদ, সরকারি দলের রাজনীতির জন্য খারাপ সংবাদ, দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য খারাপ সংবাদ। ঝিনাইদহ-৪ আসনে পরপর তিনবারের এমপি মো. আনোয়ারুল আজীম আনারকে ভারতের কলকাতায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড আনারের বাল্যবন্ধু আক্তারুজ্জামান শাহীন। একজন এমপির বিদেশে গিয়ে মৃত্যুবরণ অত্যন্ত দুঃখজনক, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই মৃত্যুকে ঘিরে যে বার্তা এ দেশে এলো, তা ভাবতেও শিউরে উঠছে এ দেশের বোকা বোকা মানুষগুলো। এমপি সাহেব এতদিন ধরে ‘মাদকসম্রাট’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তার নাম জড়িয়েছিল স্বর্ণ পাচারের সঙ্গেও। হুন্ডি কারবার, চোরাচালান ও স্বর্ণ পাচারের অভিযোগে ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেট এলার্ট জারি করেছিল। আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার-সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৬ সালে ইন্টারপোলের তালিকায় তার নাম উঠেছিল। তিনি ছিলেন এলাকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও চরমপন্থিদের ‘গডফাদার’। তার বিরুদ্ধে পুলিশের খাতায় ২৪টিরও বেশি মামলা ছিল। ২০০৯ সাল থেকে ধীরে ধীরে আনারের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো কমে যেতে থাকে। ২০১৪ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে বেশির ভাগ মামলা থেকে নিজেকে মুক্ত করেন আনার। এরপর আর আনারকে পেছনে তাকাতে হয়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাষায়, প্রচণ্ড জনপ্রিয় এই আওয়ামী লীগারকে তাদের দল এরপর ২০১৮ এবং ২০২৪ সালেও মনোনয়ন দেয়; তিনি পরপর তিনবার এমপি নির্বাচিত হন।

অত্যন্ত কাছাকাছি সময়ে এই তিনজনের বিষয়টি জনসম্মুখে আসার ফলে সরকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ হয়েছে বোকা বোকা মানুষগুলোর। এরা কেউ ব্যক্তি নন, এরা প্রত্যেকেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি বাহিনী ‘পুলিশ’ এবং ‘সেনা’র নেতৃত্ব দিয়েছেন বেনজীর আহমেদ ও জেনারেল আজিজ আহমেদ। সেই নেতৃত্ব দেয়ার সময়ই তারা দুজনে চরম দুর্নীতির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। নম্বর এক যদি দুর্নীতিবাজ হন, তবে সেই বাহিনীকে দুর্নীতিমুক্ত করার ওষুধ পাবেন ঠিক কোথা থেকে? বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, বাংলাদেশ সরকার এমন একটি সরকার, যারা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী প্রধানের দুর্নীতি ধরার কিংবা রোধ করার যোগ্যতা রাখে না। সেই দেশে দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করবে না, তো কোন দেশে প্রবেশ করবে? বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে জনপ্রিয়তার দোহাই দিয়ে একজন ক্রিমিনাল পরপর তিনবার এমপি হওয়ার পরিবেশ লাভ করে। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যে দেশের জনগণকে শুনতে হয় তাদের এমপি সাহেব ক্রিমিনালদের গডফাদার, সব ধরনের চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত। সেই এমপি পবিত্র সংসদে তার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখে- এমন দুর্ভাগ্যও এ দেশের জনগণের মেনে নিতে হচ্ছে।

সরকারি রাজনৈতিক দলের একটি সেøাগান আছে- উন্নয়নের রোল মডেল তাদের সরকার। এর বাইরে আছে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা, সংবাদমাধ্যম, আদালত ইত্যাদি। জেনারেল আজিজ কিংবা বেনজীর আহমেদ যখন ঢাকঢোল বাজিয়েই দুর্নীতির পাহাড় গড়েছিলেন, তখন এত সব সংস্থা কী করছিল? আওয়ামী লীগ কীভাবে একের পর এক তিনবার একজন কুখ্যাত ক্রিমিনালকে এমপি হওয়ার মনোনয়ন দেয়? মনোনয়নের পূর্বে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং কর্মরত এমপিদের বিষয়ে বিশেষ রিপোর্ট পাওয়ার সুযোগ রয়েছে সরকারি দলের। আনারকে পরপর তিনবার মনোনয়ন প্রদানের ক্ষেত্রে কি কোনো বৈরী রিপোর্টই জমা পড়েনি? তাহলে সরষের মধ্যেই কি ভূত আছে? আনারের ঘটনা আরো একবার প্রমাণ করে দিল- ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এর তথাকথিত নির্বাচন কতটা বিতর্কিত ছিল। প্রকৃত জনপ্রিয় প্রার্থীদের অনুপস্থিতিতে বিড়াল যে বাঘ হয়ে দাঁড়ায়, আনার যেন সেই বার্তাই দিয়ে গেলেন।

বাংলাদেশের জন্য আজকের দিনের এটাই ছিল প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এখান থেকেই শিক্ষা নিতে হবে আমাদের। মনুষ্যকৃত বহু অনুচিত কাজের সঙ্গে মিলে এ বিপর্যয় ভয়াবহ মাত্রা নিয়ে আছড়ে পড়েছে আজ। কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গের সময় এসেছে। এ ঘটনাগুলোকে হালকাভাবে দেখার অবকাশ নেই। তা বুঝতে হবে রাষ্ট্রকে, সরকারকে, রাজনীতিকে। নিউইয়র্কের মেয়রের কাজের একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ২০২২ সালে নিউইয়র্কের মেয়র এরিক শহরের রাস্তা সুরক্ষিত করতে দু’হাজার অবৈধ বাইক বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি এটা করে ঘোষণা দিলেন, ‘রাস্তায় অবৈধ বাইকের সংখ্যা বাড়ছিল; বাড়ছিল বাইক বাহিনীর দৌরাত্ম্যও। বাজেয়াপ্ত করা বাইকগুলোকে গুঁড়িয়ে দিয়ে সেসব বাইকারকে বার্তা দিলাম, দৌরাত্ম্য কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।’

একজন এমপির দুর্নীতি, একজন বাহিনী প্রধানের দুর্নীতি কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। এ দুর্নীতিগুলো স্বাভাবিক কোনো দুর্নীতি নয়; ফুটপাতের কলা বিক্রেতার পচা কলা দিয়ে ক্রেতা ঠকানোর পাঁয়তারা নয়, এগুলো দুর্নীতি প্রবাহের শিরোমণি। এদের শাস্তির সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি ঠেকাতে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষও দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে না। সমাজ-রাষ্ট্র আজ যে চরম এক সংকটের মধ্যে নিপতিত, তাকে বাঁচাতে হলে ঢেলে সাজাতে হবে জবাবদিহি ব্যবস্থাকে, শাস্তি দিতে হবে দুর্নীতিবাজকে। তার থেকেও কঠিনভাবে নিñিদ্র করতে হবে দুর্নীতি ঠেকানোর প্রয়োগ যন্ত্রকে।

সুধীর সাহা : কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App