×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

কেন সব চাকরির নিয়োগে দুর্নীতিমুক্ত থাকা যাবে না?

Icon

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কেন সব চাকরির নিয়োগে  দুর্নীতিমুক্ত থাকা যাবে না?

টেলিভিশনগুলোতে সেনাবাহিনীতে চাকরির জন্য একটি বিজ্ঞাপন প্রায় প্রতিদিনই কয়েকবার প্রচারিত হতে দেখা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, ‘সেনাবাহিনীতে অর্থের বিনিময়ে ভর্তির কোনো সুযোগ নেই। প্রতারণা অথবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হলে চাকরির যে কোনো পর্যায়ে বহিষ্কার করা হবে।’ বিজ্ঞাপনে প্রতারকরা কীভাবে চাকরি পাওয়ার লোভ দেখিয়ে বিভিন্নজন থেকে অর্থ আগেই গ্রহণ করে এবং প্রতিশ্রæত চাকরি না হলে টাকা ফেরত দিয়ে থাকে সেই গল্পও শোনানো হয়ে থাকে। এ ধরনের ফাঁদে কেউ যেন পা না দেয় সে কথাই বিজ্ঞাপনে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। বিজ্ঞাপনটি নিশ্চয়ই এমনি এমনি সেনাবাহিনী থেকে দেয়া হয়নি। বাংলাদেশে সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত চাকরি পাওয়া নিয়ে বেশ কয়েক দশক থেকে যেভাবে দালাল চক্রসহ নানা গোষ্ঠী চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেয়ার ফাঁদ পেতে বসে আছে- সেটি সবারই কমবেশি জানা আছে। চাকরি দিতে পারা না পারার ক্ষমতা বা এখতিয়ার তাদের আছে কি নেই- সেটি তলিয়ে দেখার সুযোগ নেই। চাকরি নামক সোনার হরিণ ধরতে এখন মোটা অঙ্কের টাকা দিতেই হয়। সব সময়ই যে টাকা দিয়েই চাকরি হয় এমনটিও প্রার্থী যাচাই করে দেখতে পারেন না। কিন্তু যেহেতু চাকরির বাজারে এখন বেজায় তদবির চলছে এবং সেই তদবিরের নানা এজেন্সিও সুনির্দিষ্ট হয়ে গেছে, তাই যে কেউ চাকরির কথা ভাবতেই আগে ওইসব দালাল এবং এজেন্টের কাছে যেতেই হয়। না গেলে নাকি চাকরি পাওয়া যায় না। সেই এজেন্সির কোনো বৈধতা কেউ খুঁজে পাবে না। কিন্তু সর্বত্রই চাকরিদাতা, দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে কেউ মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার নাম মুখ থেকে উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই একেবারেই চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে হাজির হয়ে যাচ্ছে কোনো কোনো কোম্পানির দালাল- যার কোনো সাইনবোর্ড নেই অথচ তার সঙ্গে যোগাযোগ আছে রিক্রুটিং এজেন্সিদের। সেখানে বিদেশে পাঠানোর নানা সুযোগ-সুবিধা মুহূর্তের মধ্যেই প্রার্থীর সম্মুখে খুলে দেয়া হয়। এর বাইরেও এখন ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে ইউরোপে নেয়ার দালালের অভাব নেই। লাখ লাখ টাকা দালালের হাতে তুলে দিয়ে অনেকেই শেষ পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে ডুবে প্রাণ বিসর্জন দেয়।

এ তো গেল অজানা-অচেনা দালালের এক ধরনের গোপন চক্র। সরকারি স্কুল, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নানা ধরনের চাকরিতে রাজনৈতিক দল এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এখন নিজেদের আয়-উপার্জনের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে অর্থের বিনিময়ে ‘চাকরিদাতা’ সাজেন। বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্যও অনেকে টাকা-পয়সার লেনদেন এবং লাইনঘাট করার কথা মোটেও অজানা নয়। আজকাল পাবলিক পরীক্ষায়ও অনেকেই টাকা-পয়সার বিনিময়ে প্রক্সি পরীক্ষা দিচ্ছেন। এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ এবং মাদ্রাসায় কয়েক যুগ ধরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পদ পর্যন্ত চাকরি দেয়া হতো। কয়েক বছর আগে শিক্ষক নিয়োগের এই ক্ষমতাটি পরিচালনা পরিষদের হাত থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। এনটিআরসি নামক একটি সংস্থা এখন শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার আয়োজন করে থাকে। এর ফলে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা শিক্ষক নিয়োগে মোটা অঙ্কের লেনদেন বন্ধ হয়েছে। কিন্তু ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও উপপ্রধানের নিয়োগ পরিচালনা পরিষদের হাতেই রয়ে গেছে। একটি এমপিওভুক্ত স্কুল বা মাদ্রাসায় নিয়োগ লাভের জন্য দরদাম আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়। একজন ঝাড়ুদার কিংবা পিয়নের জন্য কয়েক লাখ টাকার লেনদেন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। কম্পিউটার চালাতে না জানলেও ওই পদে চাকরি পেতে মোটেও সমস্যা হয় না যদি টাকার অঙ্কটা বড় হয় কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং অন্যদের নিকটজন হওয়া যায়। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার প্রধান ও উপপ্রধানের চাকরিও এখন লাখ লাখ টাকায় নিলামেই বিক্রি হয়। কেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই পদগুলোও এনটিআরসির মাধ্যমে ব্যবস্থা করছে না? সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও নিয়োগ পরীক্ষা দিয়ে চাকরি হচ্ছে আমরা জানি। কিন্তু প্রক্সি এবং মৌখিক পরীক্ষায় উতরে যাওয়ার উপায়টা অর্থের বিনিময়ে যে ঘটে সেটি অজানা কিছু নয়। গত কয়েক যুগ ধরে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী, পরিচালনা পরিষদ, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের তদবির এবং অর্থের লেনদেনে যেভাবে শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে তাতে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান এখন অনেকটাই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ, এমপিওভুক্তকরণ ইত্যাদিতেও ঘটে গেছে বড় ধরনের লেনদেনের বিনিময়। ফলে সরকারি, এমপিওভুক্ত, জাতীয়করণকৃত বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই এখন মানশূন্য শিক্ষায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে বেশির ভাগেরই আধুনিক কোনো লেখাপড়ার সঙ্গে সংযুক্তি নেই। সে কারণে নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজে গ্রাম থেকে মানুষ উপজেলা, জেলা এবং বড় বড় শহরে সন্তানদের ভর্তি করার জন্য বাড়তি অর্থ খরচ করেন। কিন্তু সংখ্যাটি খুবই নগণ্য। বেশির ভাগ অভিভাবকই হাল ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে এখন মানসম্মত শিক্ষার যে অনুপস্থিতি তা কিছুতেই পূরণ করা যাচ্ছে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও চাকরিলাভের ক্ষেত্রে তদবির এবং অর্থের বিনিময় মোটেও গোপনীয় বিষয় নয়। ফলে মেধাবী, যোগ্য ও দক্ষ কর্মজীবী মানুষের অভাব প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ঘুষ, দুর্নীতি এবং অর্থ লোপাটের ঘটনার পেছনে দীর্ঘদিন থেকে এভাবে অর্থের বিনিময়ে চাকরি পাওয়া ব্যক্তিদের অর্থ উপার্জন করার নিয়মে পরিণত হয়ে উঠেছে। সমাজে অর্থই যেখানে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে, সেখানে ধর্ম, নীতিনৈতিকতা, রাজনীতি, আদর্শ ইত্যাদি কেবলই প্রচারসর্বস্ব হয়ে ওঠে। ধারণের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ বিবেককে জাগ্রত করে না। আমাদের সমাজের যেদিকেই তাকাই তাতে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা সবাই উচ্চারণ করেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা দিন দিন শূন্যের কোটায় নেমে যাচ্ছে। সে কারণেই প্রয়োজন হচ্ছে শিক্ষা, প্রশাসন, রাজনীতি, ধর্মসহ সব ক্ষেত্রে নীতিনৈতিকতা, আদর্শ, সৃজনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করার প্রতিষ্ঠানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া। আমরা সেই ক্ষেত্রে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছি। এই পিছিয়ে পড়া আমাদের দক্ষ মানবরূপে গড়ে উঠতে মোটেও শক্তি জোগাবে না। সে কারণে এখনই প্রয়োজন রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে আইন-বিধিবিধান পরিচালিত করা। একই সঙ্গে জনগণকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যত সব অনিয়ম বাসা বেঁধেছে এসবের দূরীকরণে সময়ক্ষেপণের আর সুযোগ নেই। প্রতিটি শিশুই আমাদের জন্মগ্রহণ করে মুক্ত, স্বাধীন এবং মেধাবী মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার অধিকার নিয়ে। কিন্তু আমাদের পরিবার, সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর কূপমণ্ডূকতার মধ্যে আটকে ফেলে। সে কারণেই শিশু, কিশোর ও তরুণদের বড় অংশই আমাদের রাষ্ট্রের সম্পদ হয়ে গড়ে উঠতে পারছে না, বরং বোঝা হয়ে উঠছে। এত দিনেও যদি আমরা এই বিষয়গুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বোঝার চেষ্টা না করি, তাহলে বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অবস্থান কেবলই নিম্নগামী হতে থাকবে। বিশ্ব প্রতিযোগিতায় আমরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না। সে কারণে মেধা, সততা, দেশপ্রেম, যোগ্যতা, আদর্শবোধ দ্বারা পরিচালিত জনসম্পদ আমাদের গড়ে তুলতেই হবে। তাদেরই যোগ্য স্থানে বসাতে হবে। দেশের নেতৃত্ব তাতেই কেবল সুরক্ষিত হতে পারবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App