×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

কর্তাব্যক্তিদের বোধোদয় হোক

Icon

স্বপ্না রেজা

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কর্তাব্যক্তিদের বোধোদয় হোক

আইন প্রয়োগ, দেশ ও জাতির শান্তিশৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রধানদের কীর্তিকলাপ নিয়ে সাম্প্রতিক কালের যে বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা, আদালতের আদেশ ইত্যাদি বিষয়, ভাবছিলাম সেসব নিয়ে লেখা দরকার। সমসাময়িক ইস্যুতে লেখার ধারাবাহিকতায় বিষয়গুলো সামনে চলে আসে প্রকৃতির নিয়মে অনেকটা। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সদাজাগ্রত বিধায় এমন তাড়না। দেশ ও দশের মঙ্গল চাওয়া ছাড়া আর কিইবা চাওয়ার ও করার আছে আমাদের মতো মানুষের। কিন্তু শুভাকাক্সক্ষীদের অনেকে পরামর্শ দিয়ে বসলেন, কী দরকার এসব বিষয় নিয়ে লেখার। আর কি-ই বা হয় লিখে। কতই বা লেখা যায়। লেখা কি আর শেষ হবে? যারা ধরা পড়ছে, ধরা খাচ্ছে তারাই তো চোখের সামনে আসছে। আর যারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় অলৌকিক শক্তিতে, তারা তো আর সামাজিকভাবে মানসম্মান খোয়াচ্ছে না, খোয়াতে হচ্ছে না। তাদের খবর লোকসমাজেও আসছে না। তাদের নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনার সূত্রও যে থাকছে না। নির্বিঘেœ থেকে যাচ্ছে আড়ালে। কেউ তো জানতেও পারছে না, এদের সংখ্যাইবা আদতে কত। তবে এটা ঠিক, এমন ডাকসাইটের লোকজন যে কখনো ধরা খেতে পারে, তাদের অনিয়মের খবর যে এভাবে ফাঁস হতে পারে, পত্রিকার পাতায় ফলাও হতে পারে, এটা কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে রীতিমতো এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। অতীত ইতিহাসে এমনটা হাতেগোনা। ফলে প্রথমটায় কল্পনাও করা যায়নি, যায় না। কিন্তু বিষয়টি যেন কেমন করে লোকসমাজে চলে এলো অবলীলায়। কে বলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই? স্বাধীনতা আছে। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের সূত্রই যেন সাবেক পুলিশ প্রধানের জীবন ওলটপালট করে দিল, তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াল। আর এই সূত্র ধরে দুর্নীতি দমন কমিশন সক্রিয় হয়ে উঠল এবং তারপর ধীরে ধীরে আইনের কাছে গিয়ে পৌঁছাল পুরো বিষয়টি। অথচ একটা সময় তো ছিল যখন, এ ধরনের নাগরিকের ক্ষমতা ও দাপটের কাছে সাধারণ মানুষসহ সবাই ভীতসন্ত্রস্ত থাকত। এটা তো সত্য যে, নিরাপত্তাবিধানকারী দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা শ্রদ্ধা প্রাপ্তিতে ছিলেন সমাজের নজরকাড়া ব্যক্তিত্ব। নিরাপত্তার বিষয়ে সংশয় ও সংকট দেখা দিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই তো সাধারণ নাগরিককে অভয় দেন, দিয়ে থাকেন, আশ্বস্ত করেন। আর নির্ভার ও নির্ভয় হতে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগোষ্ঠী নিরাপত্তার আশ্বাস প্রাপ্তির লক্ষ্যে, আশ্বস্ত হতে এমন ব্যক্তিদের অনুরোধ করেন, তাদের আয়োজিত নানা সামাজিক আয়োজন, অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হতে। সমাজে ভালো কিছুর উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন তো এই শ্রেণির ব্যক্তি দ্বারাই হয়ে থাকে। প্রায় প্রতিদিন তাদের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, কর্তব্য পালনের সংবাদ পত্রিকার পাতায় জায়গা করে নেয়। জনগণ জেনেছে, চিনেছে তাদের, তারা কারা। কিন্তু সবকিছুরই যেন বিপরীত একটা চেহারা থাকে, ছিল, যা প্রকাশ্যে চলে এলো। এই বিপরীত চেহারা অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত, আবার অনেকের কাছেই খুবই মামুলি ব্যাপার। বিশেষ করে যারা খবর রাখতেন, খবর সংগ্রহ করতেন। আইনি প্রক্রিয়ায় যেসব নিরীহ মানুষ প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন, সর্বস্বান্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে যাদের, আইনি অধিকার ভোগের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ন্যূনতম নমুনা নেই যাদের, এমন সব ব্যক্তির কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভাগ হলো ভয়ংকর এক আতঙ্কের নাম। যা হোক, কি শেখার থাকে যখন দেখা যায় যে, ক্ষমতার উচ্চ আসনে বসে কেউ কেউ অনিয়ম করেছেন বা করে গেছেন। কিংবা তাদের নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। যেটা সাধারণের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলছে বা ফেলতে পারে। একটি দেশের ভাবমূর্তি তো ক্ষুণ্ন হয়ই। দেখা যায়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে কেউ কেউ অঢেল ধন, সম্পদের মালিক হয়েছেন, যে সংবাদটা দায়িত্বশীল থাকা অবস্থায় সাধারণত প্রকাশিত হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায়িত্ব থেকে চলে যাওয়ার পর জনসম্মুখে আসে। সবাই জানতে পারে। এমন সংবাদ নিঃসন্দেহে সুখকর নয়, সাধারণ জনগণকে আনন্দ দেয় না। হতাশ করে, মারাত্মক রকম হতাশ করে। যে হতাশা সাধারণের মনে আলোর সঞ্চার করতে পারে না শেষ অব্দি। এই হতাশা পরবর্তী সময়ে কারোর ওপর আস্থা ও ভরসা করার পথটুকু রাখে না। কারণ মানুষ হলো সংবেদনশীল প্রাণী ও আবেগপ্রবণ। এ দেশের সাধারণ জনগণ সুখে উচ্ছ¡সিত হওয়ার চেয়ে দুঃখে বেশি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। সুখের হিসাব, সুখের গল্পের চাইতে দুঃখের হিসাব ও গল্পটা বয়ে বেড়ান। সেই আলোকে সে নিজের জীবনকে পরিচালনা করতে অভ্যস্ত হয়।

যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান কর্তাব্যক্তি সংশয় ও সন্দেহের কারণ হয়ে ওঠেন, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ চেহারা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে পুরনো প্রশ্নের সঙ্গে অনেক নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়, যা কখনোই সেই প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না, আনতে পারে না। বড়দের ভুল প্রান্তি হলে সেটা অন্যদের জন্য অনুসরণীয় হয়ে ওঠে, যদি না আদর্শ বা নৈতিকতার ঘাটতি থেকে থাকে। প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের মধ্যে অর্থবিত্ত কামাইয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ একটি প্রতিযোগিতা চলমান থাকে। বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন ঘটনা বেশি ঘটে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রতিবেদনে একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে কোটিপতিদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কোনো ধরনের দুর্যোগই এই বেড়ে যাওয়াকে ব্যাহত করতে পারছে না। অতিমারি করোনার সময়ে যখন উৎপাদন, বাজার ব্যবস্থা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, তখনো কোটিপতি পয়দার পথ খোলা ছিল। এতে প্রতীয়মান হয়, সহজ, সরল পথে ও বিধি মোতাবেক কোটিপতি এ দেশে খুব একটা হয় না। কোটিপতি বা বিত্তবান হওয়ার জন্য কৌশল বা প্রক্রিয়া লাগে, লাগে রাজনৈতিক সমর্থন ও আশ্রয়-প্রশ্রয়, যা সব সময়ই উন্মুক্ত থাকে, রাখা হয়। সাধারণভাবে একজন শ্রমিক জাতীয় মানুষ সহজে কোটিপতি হতে পারেন না। হওয়ার কথা নয়। সে ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম চোখে পড়ে, পড়েছে। সাধারণ পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা পরিবহন চালককে অঢেল ধনসম্পদের মালিক হতে দেখা যায় এবং সেটা প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা, অরাজকতার কারণে। ফলে অবৈধ পন্থায় তারা ধনী হয়ে ওঠে, তাদের সম্পত্তির হিসাব দেখে আতকে উঠতে হয়।

প্রচলিত আছে, বাংলাদেশে কিছু পেশায় অঢেল কামাই করা সম্ভব। যার মধ্যে পুলিশ ও প্রশাসন এবং সেবাদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখযোগ্য। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে। বলাবাহুল্য যে, প্রচুর টাকা খরচ করে এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার জন্য অনেকেই মুখিয়ে থাকে। সাধারণ একজন বাবুর্চি, পরিবহন চালক অথবা পিয়নের পদে চাকরি পেতে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে থাকে। যোগ্যতা না থাকলেও চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ব্যবস্থাও হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সাধারণ কনস্টেবল হওয়ার জন্য কেউ কেউ আবার ভিটে মাটিও বিক্রি করে বসে। পরে চাকরি হয়ে সেই টাকা তুলে নিতে পারে অতি সহজে। কয়েকদিনে চাকরি প্রাপ্তির যাবতীয় খরচ উঠে আসে। সোজা কথায়, মোটা অঙ্কের টাকার কারসাজি চলে দিনের পর দিন। পত্রিকার পাতায় প্রতিনিয়ত এমন সংবাদ প্রচার হয়। প্রতিষ্ঠানের বড়, ছোট এর কোনো বালাই নেই, বড়দের অনুসরণ করে অনেকেই টাকা কামাইয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। একজন বলছিলেন, যদি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা রাষ্ট্রের বিধি মেনে দায়িত্ব পালন করতেন, সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকত, তারা নৈতিকমূল্যবোধের পরিচয় দিতেন তাহলে অন্তত তাদের অনুসারীরা সেইপথে চলত। অনিয়মের কোনো অস্তিত্ব থাকত না। অবৈধ পন্থায় টাকা কামাইয়ে ভীত হতেন সবাই এবং এমন সংস্কৃতির প্রচলন ঘটত না।

এটা তো ঠিক, একজন দায়িত্ববান ব্যক্তিকে যেভাবে দেখতে ও চিনতে সাধারণ জনগণ অভ্যস্থ, আচমকা তার রূপ পরিবর্তনের গল্প সেই জনগণের কাছে রীতিমতো বিস্ময়ের। দেশ আদতে কোনো বিশ্বাসে ও আদর্শে এগোচ্ছে তা কিন্তু বুঝা যাবে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করে। প্রতিটি পেশার আয়ের সঙ্গে ব্যয় এবং সম্পদের পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করলে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে, ধারণা পাওয়া যেতে পারে। প্রতিটি পেশা ও দায়িত্বের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে, একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ জাতি গড়ে উঠবে। প্রশ্ন হলো আমরা সেই পথে এগোব কিনা।

স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App