×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

গান্ধী ও জিন্নাহর মিল-অমিল

Icon

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গান্ধী ও জিন্নাহর মিল-অমিল

তৃতীয় কিস্তি

আমলাতান্ত্রিক ভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও জিন্নাহ আগাগোড়াই রাজনীতিক; গান্ধীও রাজনীতিরই লোক, সে জন্যই তিনি অমন গুরুত্বপূর্ণ। তবে জিন্নাহ যেভাবে রাজনীতিকেই একমাত্র অবলম্বন করে তুলেছিলেন, গান্ধী কিন্তু তা করেননি, তিনি সমাজেরই লোক ছিলেন এবং সমাজ যেহেতু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে, তাই তাকে রাজনীতি করতে হতো এবং সম্ভব হলেই তিনি রাজনীতি থেকে বের হয়ে সামাজিক কাজে নিয়োজিত হয়ে পড়তেন। সাতচল্লিশের পর তার চিন্তা হয়েছিল, কংগ্রেসের আর প্রয়োজন নেই; ভেবেছিলেন একে সামাজিক সংগঠনে রূপান্তরিত করবেন, তার জন্য একটি গঠনতন্ত্রও তৈরি করেছিলেন তিনি, নিজ হাতে; বস্তুত সেটাই ছিল তার শেষ কাজ, মৃত্যুর আগের রাতে যেটি তিনি শেষ করেন। রাজনীতিকে জিন্নাহ দাবা খেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার নিজের রাজনীতির বেলায় এই তুলনা যথার্থ বটে; তিনি অপেক্ষা করতেন কংগ্রেস কোন চাল দেয়, তা দেখার জন্য এবং তারপর বুঝেশুনে নিজের চালটি চালতেন, লক্ষ্য অবশ্যই ছিল কিস্তি মাৎ করা। কিন্তু জিন্নাহ যে বিলিয়ার্ড খেলতেন সেটাও তো সত্য, সেই খেলায় লক্ষ্যভেদ করা যেমন থাকে একমাত্র অভীষ্ট, জিন্নাহরও ছিল তেমন স্থির গন্তব্য; সেটা হলো ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অর্জনের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছানো।

গান্ধী যেমন প্রতিপক্ষ পেলেও যথার্থ প্রতিদ্ব›দ্বী পাননি, জিন্নাহর ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটল, যখন তিনি কংগ্রেস থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে মুসলিম সম্প্রদায়কে রাজনীতির নিজস্ব ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলেন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় আটকে রইলেন না, সরাসরি সর্বভারতীয় নেতৃত্বে চলে গেলেন এবং সেখানেই ছিল তার জোর; নইলে নেতৃত্বদানের দিক থেকে বাংলার ফজলুল হক এবং পাঞ্জাবের সিকেন্দার হায়াত খান মোটেই কমজোর ছিলেন না। ওই দুই নেতার স্থানীয় অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়, নিজ নিজ প্রদেশের তারা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী এবং সেখানেই ছিল তাদের দুর্বলতাও। কেননা তারা প্রাদেশিক নেতা হয়ে গিয়েছিলেন। তাদের জন্য একদিকে ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রতিদ্ব›িদ্বতা অন্যদিকে ব্রিটিশের চাপ, সেই সঙ্গে হয়তো ছিল সর্বভারতীয় মর্যাদা পাওয়ার আকাক্সক্ষা। ফলে তারা উভয়েই ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর জিন্নাহর সঙ্গে হাত মেলান। যদিও তারা কেউই মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন না, ছিলেন বরং সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানেই। এদের সমর্থন জিন্নাহর জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ছিল; এদের সাহায্যেই তিনি লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন ও পাস করান। কিন্তু তারপরই এদের প্রান্তবর্তী করে দেয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে যায়। ফজলুল হক প্রধানমন্ত্রিত্ব হারালেন এবং যে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের তিনি সভাপতি পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন, সেই মুসলিম লীগের রাজনৈতিক আধিপত্যের মুখে শেষ পর্যন্ত এতটাই শক্তিহীন হয়ে পড়লেন, বাংলা যখন ভাগ হয় তখন কার্যকর কোনো ভূমিকাই রাখতে পারলেন না। পাঞ্জাবের সিকেন্দার হায়াত খানকে প্রান্তবর্তী করে ফেলা হয়তো সম্ভব হতো না, কিন্তু তিনি মাত্র ৫০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে জিন্নাহর রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্রকে বেশকিছুটা নিষ্কণ্টক করে দিয়ে গেলেন। সিন্ধু প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী খান বাহাদুর আল্লাহ বক্স সুমরো মুসলিম লীগবিরোধী ছিলেন; লাহোর প্রস্তাবের বিপক্ষে তিনি মুসলিম জনমত সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তার ওপর বিরক্ত হয়েছিল। কেননা কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত সমর্থন করে তিনি তার খান বাহাদুর পদবি বর্জন করেছিলেন; ওই কাজের শাস্তিস্বরূপ সিন্ধুর গভর্নর তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন। জানা যায়, জিন্নাহ বড়লাটকে এ ব্যাপারে উৎসাহ দান করেছিলেন। এরপর ১৯৪৩ সালের মে মাসে আল্লাহ বক্স আততায়ীর গুলিতে নিহত হন; এই হত্যারহস্য কোনোদিনই পরিষ্কার হয়নি।

জিন্নাহ তার রাজনৈতিক কর্মজীবনে দুটি বিশেষ দিবস পালনের ডাক দিয়েছিলেন, একটি ১৯৩৯ সালে, অপরটি ১৯৪৬-এ। উভয় দিবসই যে শুক্রবারে পড়েছিল, সেটাকে আপতিক ভাবা ঠিক নয়, অবশ্যই সুচিন্তিত ছিল এবং এ দুটির কোনোটিই ব্রিটিশবিরোধী ছিল না। ১৯৩৯-এর ২ ডিসেম্বরের ডাকটি ছিল কংগ্রেসশাসিত প্রদেশগুলোতে মন্ত্রিসভার পদত্যাগে সন্তোষ প্রকাশ করে মুক্তিলাভের দিবস হিসেবে পালনের। কংগ্রেসই তখন লীগের প্রধান শত্রæ। ব্রিটিশের সঙ্গে কংগ্রেসের বিরোধ তখন প্রায় মুখোমুখি; এর মধ্যেও জিন্নাহ মাদ্রাজে ১২ এপ্রিল ১৯৪১ এ অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ সম্মেলনে ব্রিটিশ সরকারকে কংগ্রেসের প্রতি নরম হতে নিষেধ করে বলেছেন, ‘সংকটের এই মুহূর্তে যারা আপনাদের যুদ্ধপ্রচেষ্টাকে বানচাল করতে চায় এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ও ভারতকে রক্ষা করার কাজে আপনাদের বিরোধিতা করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে, দয়া করে তাদের তোয়াজ করার নীতিটা পরিহার করুন।’ ওই সময়ে ঔপনিবেশিক সরকার কিন্তু তার নিজের খেলাটাই খেলছিল। কংগ্রেসের সঙ্গেই তাদের প্রধান দ্ব›দ্ব, সেই দ্ব›েদ্ব মুসলিম লীগকে সঙ্গে পাওয়াটা প্রাপ্তি হিসেবে ভালো হওয়ারই কথা।

নিজের অনুসারীদের জিন্নাহ দ্বিতীয় যে দিবসটি পালনের জন্য ডাক দিয়েছিলেন, সেটি ১৯৪৬-এর ১৬ আগস্ট; এটিকে আগেরটির মতো নিরীহ ভাববার উপায় ছিল না, কেননা এর নাম সরাসরি দেয়া হয়েছিল ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’। ডাকটি এসেছিল মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন থেকে, ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব গ্রহণে কংগ্রেসের অসম্মত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘আজ থেকে আমরা সাংবিধানিক পথ ত্যাগ করলাম।’ তিনি জানিয়েছিলেন, মুসলিম লীগের হাতেও ‘পিস্তল’ আছে। বোধ করি বোঝাতে চেয়েছিলেন কংগ্রেসের হাতে যেমন রয়েছে আন্দোলন, সরকারের হাতে ক্ষমতা, মুসলিম লীগের হাতেও তেমনি রয়েছে ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রামে’ যাওয়ার শক্তি। এই সংগ্রামটা যে কার বিরুদ্ধে, সেটা পরিষ্কার ভাষায় না বললেও কারো পক্ষেই বুঝতে ভুল হয়নি, এটা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে নয়, কংগ্রেসের বিরুদ্ধেই। আবুল মনসুর আহমদ সে সময়ে ছিলেন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক। তিনি স্মরণ করেছেন, ‘দুটি ঘটনা হিন্দু-মনে স্বভাবতই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করিল। এক, খাজা নাজিমুদ্দীন ঘোষণা করিলেন : আমাদের সংগ্রাম ভারত সরকারের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দুদের বিরুদ্ধে। দুই, প্রধানমন্ত্রী সাহেবের নির্দেশে বাংলা সরকার ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করিলেন।’

১৯১৯ সালে গান্ধী সেই যে হরতাল ডেকেছিলেন, যার পরিণতিতে ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষ থেকে জালিয়ানওয়ালাবাগের উন্মত্ত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল, সেই দিনটি ছিল রবিবার; গান্ধী ইচ্ছা করেই সাপ্তাহিক ছুটির দিনটিকে হরতালের জন্য বেছে নিয়েছিলেন, যাতে দোকানপাট, অফিস-আদালত এমনিতেই বন্ধ থাকে এবং লোকে বাড়ি ছেড়ে কম বের হয়; সাপও মরে অথচ লাঠিও না ভাঙে। অন্যদিকে জিন্নাহর পছন্দ ছিল শুক্রবার, যেদিন মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা মসজিদে আসবে, জমায়েতে জড়ো হবে এবং সেখান থেকে বের হয়ে সভা ও মিছিল করবে। সোহরাওয়ার্দী যে ওই শুক্রবারকে সরকারি ছুটির দিন করে দিয়েছিলেন, তাতে মুসলিম লীগের সমর্থকদের পক্ষে এমনটা ধারণা করা সম্ভব হলো, সরকার তাদের সঙ্গে আছে, ফলে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ মনোভাবটা আরো চাঙা হয়ে উঠল। কলকাতা তখন হিন্দুপ্রধান শহর, মুসলমানের শতকরা সংখ্যা মাত্র ২৬.৬, কলকাতা পুলিশেও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদেরই সংখ্যাধিক্য, তাই ক্ষয়ক্ষতি মুসলমানদেরই বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু সব মিলিয়ে যা ঘটেছে তা দাঙ্গা নয়, হত্যাকাণ্ড; জ্যোতি বসু মনে করেন সেই হত্যাকাণ্ড মৃতের সংখ্যা ২০ হাজারের কম হবে না, বেশিও হতে পারে। হত্যা ও লুণ্ঠনের কাজটা দুই পক্ষের অসামাজিক প্রাণীরাই মূলত করেছে, কিন্তু ভদ্রজনেরা যে যোগ দেননি তা তো নয়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App