×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

হাকালুকি হাওর সংরক্ষণ সময়ের দাবি

Icon

সুমাইয়া আকতার

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সর্ববৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি, মৎস্য ও প্রাকৃতিক জলজ উদ্ভিদের ভাণ্ডারখ্যাত হাকালুকি হাওর। যেটি মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। সবচেয়ে বড় ও এশিয়ার অন্যতম হাওর হাকালুকিতে রয়েছে অসংখ্য নদী, খাল, বিল, হ্রদ এবং প্লাবনভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা। হাওরের আয়তন ১৮ হাজার ৩৮৬ হেক্টর। এই হাওরেই স্থায়ী নিবাস দেশীয় বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির নানা জলজপ্রাণী ও উদ্ভিদের। আর এরই সঙ্গে জীবন-জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে হাওর তীরের কৃষি, মৎস্য ও শ্রমজীবী প্রায় ৪ লাখেরও বেশি মানুষ। এর সঙ্গে তাই তাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা মিশে আছে ওতপ্রোতভাবে। হাওর তীরের মানুষ হাকালুকিতে বোরো ধান, শীতকালীন ফসল চাষাবাদ আর গরু, মহিষ, হাঁস পালন ও মৎস্য আহরণ করেই জীবন চালায়। হাকালুকি হাওরই তাদের জীবন-জীবিকার অন্যতম উৎস। যেহেতু হাওর একটি জলাভূমি এবং জলাশয় নিয়ে গঠিত একটি বৈচিত্র্যময়ে বাস্তুতন্ত্র, যা বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণিজগৎকে সমর্থন করে প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে ঠিক রাখতে সহায়তা করে।

প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা জলজ উদ্ভিদের নানাভাবে ক্ষতি করা হচ্ছে। সংকটাপন্ন এলাকায় স্থাপিত বাঁধ, বিলে ফেলা মাটি অপসারণ, গাছ কাটার যেন মৌসুম চলছে।

পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি, মাছ, উভচর ও জলজ উদ্ভিদের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে থাকে। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, হাকালুকি হাওরে ৫২৬ প্রজাতির উদ্ভিদ। ৪১৭ প্রজাতির পাখি। এর মধ্যে ১১২ প্রজাতির অতিথি পাখি ও ৩০৫ প্রজাতির দেশীয় পাখি। ১৪১ প্রজাতির অন্যান্য বন্যপ্রাণী। ১০৭ প্রজাতির মাছ, তার মধ্যে ৩২ প্রজাতির বিভিন্ন পর্যায়ের বিপন্নপ্রায়। রয়েছে নানা ধরনের কীটপতঙ্গ, জলজ ও স্থলজ ক্ষুদ্র অণুজীব। এখন এই পরিসংখ্যানের অধিকাংশই নেই বললেই চলে। অযতœ আর অবহেলায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দেশের ঐতিহ্যবাহী হাওর হাকালুকি। সময়োপযোগী সংরক্ষণের অভাবে হাকালুকি হাওর এলাকায় অধিকাংশ বিল, সংযোগ নদী, খাল ও গাঙ্গ এখন ভরাট। তাই শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটে বোরো চাষ হয় ব্যাহত। চরম সংকটে পড়ছে গরু-মহিষসহ জলজপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যকুল।

তাছাড়া এটি কৃষি, পানিসম্পদ, মৎস্যসম্পদ এবং ইকো-ট্যুরিজমের মাধ্যমে দেশের জিডিপিতে অবদান রাখে। আমাদের সবার অবগত আছে, হাকালুকি হাওরকে মিঠাপানির মাছের অন্যতম প্রজননকেন্দ্রও বলা হয়। অথচ এখন মাছের এমন আকাল, অর্ধেক মূল্যেও বিল ইজারা নিতে আগ্রহী হচ্ছে না মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিগুলো। তাদের মতে, ইজারার আগেই বিলের মাছ লুটে নেয়া, অবৈধ মাছ শিকার বন্ধ না করা ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়ায় হাকালুকি হাওরের জলাশয়গুলোতে মাছের উৎপাদন কমে গেছে। বিভিন্ন বিলে সরকার নির্ধারিত ইজারা মূল্যের অর্ধেক দামেও মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় ইজারা নিতে কেউ আগ্রহী হচ্ছেন না। বলা বাহুল্য, হাকালুকি হাওর পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়নের জন্য একটি অমিত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। বছরের বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে এই বিপুল সৌন্দর্যের প্রতীক হাওরটি।

পর্যটন খাতেও রাজস্ব আয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও সঠিক পরিকল্পনা ও অব্যবস্থাপনার কারণে বছরান্তে এ খাত থেকে রাজস্ব আয় বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। সুতরাং এটি কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনের সমন্বয়ে হাকালুকি হাওরকে বাংলাদেশের জিডিপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। গ্রীষ্ম, বর্ষার পরে শীতকালে এই হাওরের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যকে আরো সমৃদ্ধ করে বিভিন্ন ধরনের অতিথি পাখি ও তাদের কলরব।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অতিথি পাখি এই হাওরকে বেছে নেয় তাদের শীতকালীন নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে। হাওরে দিন দিন পাখির সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। বিলে পানি কমে যাওয়ার কারণে এরূপ হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অসাধু পাখি শিকারি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিষটোপ আর পাতানো ফাঁদে ধরা পড়ছে হাজার হাজার অতিথি পাখি। ফলে প্রতি বছরই অতিথি পাখির সমাগম হ্রাস পাচ্ছে। এসব দেখার যেন কেউই থাকছে না। ফলে দেশীয় পাখির বিস্তার ও পরিযায়ী পাখির কোলাহলময় পরিবেশ শূন্য হয়ে উঠেছে।

হাওরের অনিন্দ্যসুন্দর এই প্রাকৃতিক রূপের উল্টোপীঠে রয়েছে একটি মনুষ্যসৃষ্ট বীভৎস ও কুৎসিত দৃশ্যপট। গত কয়েক দশক থেকেই এই হাওরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী অসৎ চক্র। যাদের লুটপাট সম্প্রতি রীতিমতো মহামারি আকার ধারণ করেছে। ফলে বসবাসরত সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের জীবন হুমকির মুখোমুখি হচ্ছে।

বাংলাদেশ তথা এশিয়ার সর্ববৃহৎ হাওর হাকালুকির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। ফলে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে এশিয়ার তথা দেশের বৃহৎ হাওর ও একমাত্র মিঠাপানির এই মৎস্য ভাণ্ডারটি।

হঠাৎ করে এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে হাওরের অবস্থা আগের অবস্থানে ফিরে যাবে। অবাধে পাখি শিকার, মাছ শিকারসহ বিনষ্ট হবে পরিবেশ।

তাই সামগ্রিকভাবে দেশের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য সংরক্ষণে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সমৃদ্ধির পরিসরে সংরক্ষণ করতে হবে হাকালুকি হাওর। যেখানে হাওরে বসবাসরত মানুষের জীবিকা নির্বাহ সুগম করার সঙ্গে ইকো-ট্যুরিজম এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করা সম্ভবপর করা নিশ্চিত করা যায়।

সুমাইয়া আকতার : শিক্ষার্থী, সরকারি ব্রজমোহন কলেজ, বরিশাল।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App