×
Icon ব্রেকিং
বরগুনায় সেতু ভেঙে বিয়ের মাইক্রোবাস খালে, নিহত ১০

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

স্মার্ট বাংলাদেশ ও সোনার বাংলা বিনির্মাণে নির্লোভ মানুষ চাই

Icon

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্মার্ট বাংলাদেশ ও সোনার বাংলা বিনির্মাণে নির্লোভ মানুষ চাই

জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আছে বলে উন্নয়নের ধারাবাহিকতাও চলমান আছে। বৈশ্বিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশে এবারো জিডিপিতে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৫ মার্কিন ডলার। একদিকে রিজার্ভের পরিমাণও ক্রম-হ্রাসমান, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতির কারণে দ্রব্যমূল্যেরও ঊর্ধ্বগতি। এসবের মধ্যেই মানুষের বসবাস। ওপরে বর্ণিত বিভিন্ন নিয়ামকের জন্য সাধারণের অসন্তোষও আছে। কিন্তু তারপরও মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রয়াস নিতে হবে, রিজার্ভের ওপরও চাপ কমাতে হবে এবং সেই সঙ্গে উন্নয়নের চলমান ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে উপলব্ধি করতে হবে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ ও অর্থনীতি সঠিক পথে আছে এবং এর ধারাবাহিকতাও রক্ষা করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক নেতাকর্মীই নন, আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার নির্বাহী প্রধানদেরও দায়িত্ব দেশের মানুষকে বোঝানো, শেখ হাসিনার কাছেই দেশ নিরাপদ এবং উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নবিলাসী। সুতরাং সেই অভীষ্টে পৌঁছানোর জন্য যতটা সংযম ও সাধনার দরকার, তার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকার মনোনীত কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধান এবং দলীয় নেতাকর্মীকে উপলব্ধি করতে হবে, নির্বাহী কোনো দায়িত্ব ও রাজনীতি কেবল ভোগের অবলম্বন নয়, যথাযথ দায়িত্ব পালন এবং ত্যাগও রাজনীতি কিংবা দায়িত্ব পালনের একটি ঐশ্বর্যমণ্ডিত গুণ।

আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং সরকার কর্তৃক মনোনীত নির্বাহীদের মনে রাখতে হবে, নিজের দল ক্ষমতায় থাকলে যে মানসিক স্বস্তি ও প্রশান্তি থাকে, অন্য দল ক্ষমতায় থাকলে তার বিন্দু বিসর্গও থাকে না! বিগত ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমরা তা ভালোভাবেই টের পেয়েছি! দুঃখজনক, নেতাকর্মী কিংবা সরকার কর্তৃক মনোনীত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধানের প্রায় অধিকাংশই সব সময় দল বা সরকারের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নিজেরা ‘আঙুল ফুলে কলাগাছে’ পরিণত হন। রাষ্ট্রের সর্বশেষ অবসরে যাওয়া পুলিশ প্রধানের আয়ের সঙ্গে সংগতিবিহীন সম্পদের আধিক্য প্রথমত গণমাধ্যম এবং পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পত্তি ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হওয়ায় এসবের আলোচনা এখন প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

গ্রাম বাংলায় বহুল প্রচলিত ‘যে যায় লঙ্কা সেই হয় রাবণ’ এই প্রবাদটি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে যেন এক নির্মম বাস্তবতারই দৃষ্টান্ত। আমরা জানি না, এই বাংলার কোনো ব্যক্তি বা কবি সামাজিক জীবনযাপনের কী নিদারুণ অভিজ্ঞতা লাভের পর এমন বস্তুনিষ্ঠ প্রবাদের জন্ম দিয়েছিলেন। অথবা কোন অঞ্চলের সামষ্টিক মানুষের জীবনযাপন বা সামাজিক ব্যবস্থাপনার তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এরূপ একটি প্রবাদের সৃষ্টি হয়েছিল, সে ইতিহাস আমাদের জানা নেই। তবে কল্পনা করতে বাধা নেই, সামাজিক সংগঠনের মধ্যে বিরাজিত আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপরতার পুনঃপৌনিকতায় ত্যক্ত-বিরক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সামাজিকগণের মানসভূমে কোনো এক কালে আক্ষেপোক্তি স্বরূপ এইরূপ প্রবাদের জন্ম হয়েছিল। উপরন্তু, কালপ্রবাহে যুগের পর যুগ সামাজিক ব্যবস্থাপনায় নানা রূপান্তর ঘটলেও অভ্যন্তরীণ এক শাশ্বত নিয়ামক হিসেবে সূ² থেকে সূ²তর কৌশলে এই সংকটটি মানবদেহে রক্ত প্রবাহের মতো সমাজশরীরের ভেতর থেকেই যায়! তাই রাম-রাবণের পৌরাণিককালের গর্ভ ভেদ করে তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান বিকাশের কালকেও পুরাণের আবহে আচ্ছন্ন করে তোলে। বর্তমানে চারপাশজুড়ে সভ্যতার পোশাকে আবৃত রাবণদের পদচারণা আর দশমুখী (রাবণকে দশানন বলা হয়) আগ্রাসের সামনে সবকিছুরই আজ ত্রাহি অবস্থা! নব্যকালের দানবরূপী রাবণদের হা-করা গ্রাসের সম্মুখে রাষ্ট্রীয় রীতিনীতি, আইন-কানুন, রাজনীতি ও অর্থনীতি একেবারে সংকটাপন্ন অবস্থার শিকার!

উপরে এত কথা বলার কারণ সাম্প্রতিককালে আবিষ্কৃত হওয়া একজন পুলিশ কর্মকর্তার ‘ধনকুবের’ হিসেবে পরিচয় প্রকাশিত হওয়া! অথচ কী আশ্চর্যের বিষয়! ৩১ মার্চ ২০২৪-এর পূর্বে এই মানুষটি সম্পর্কে দেশবাসী অনেকেরই মতো ব্যক্তিগতভাবে আমারও ধারণা ছিল তিনি একজন সৎ, স্বচ্ছ, শুভ্র, কর্মঠ, চৌকস, শুদ্ধাচারী এবং আদর্শবান সরকারি কর্মকর্তা! মনে মনে এও ভাবতাম, বাংলাদেশের সর্বস্তরে এমন চৌকস ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কর্মকর্তা সৃষ্টি সম্ভব হলে বর্তমান সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ভিশন-মিশন দ্রুততার সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করবে। কিন্তু দৈনিক কালের কণ্ঠের ৩১ মার্চ প্রকাশিত সংবাদে আমাদের নানা রকমের স্বপ্নে ফোলানো চকচকে রঙিন বেলুনটি হঠাৎই যেন ফুটো হয়ে যায়! গত ২৩ মে ঢাকার একটি আদালত সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার সম্পত্তি ক্রোক এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনে ওই দিন ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন এ আদেশ দেন বলে গণমাধ্যম সূত্রে আমরা অবগত হই। একই সূত্রে আমরা জানতে পারি, আদালত ওই কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ এবং গোপালগঞ্জের জমির ৮৩টি দলিল ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে আততায়ীদের হাতে নিহত ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারের লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যের মধ্যেও বর্ণিত পুলিশ কর্মকর্তার সম্পত্তি ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের সংবাদটি ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’তে পরিণত হয়েছে!

মূলধারার গণমাধ্যম তো বটেই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মেও ঘটনাটি ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। এত দ্রুত এই ঘটনার এরূপ ভাইরাল হওয়ার পেছনে যে কারণগুলো বিদ্যমান তার মধ্যে কর্মজীবনে বিভিন্ন সময়ে নানা ঘটনায় তিনি আলোচিত ও সমালোচিত ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি সমালোচিত ছিলেন তার বাড়ি গোপালগঞ্জ বলে। ঈর্ষা হোক কিংবা বাস্তবতা- গোপালগঞ্জে তার বাড়ি হওয়ায় কর্মজীবনে তার দ্রুত উত্থান এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুবার উঠেছে। একই কারণে নির্বিঘœ পদোন্নতিও পেয়েছেন কর্মজীবনে। পেয়েছেন শুদ্ধাচার পুরস্কারও। এসব কারণসহ র‌্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালে বিভিন্ন ঘটনায় মার্কিন ভিসা নীতির আওতায় তার নাম আসায় তার প্রতি সাধারণের একটা আগ্রহ সব সময়ই সক্রিয় ছিল। আবার বস্তুনিষ্ঠতা না থাকলেও তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক আপত্তিকর ভিডিও চিত্র সম্প্রচারিত হলেও সেসব বিষয়ে আইনি কোনো প্রতিকারে আগ্রহ প্রকাশের খবর আমাদের নজরে পড়েনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানাভাবে ট্রল হতে হতে তার নামটি মানুষের মুখে মুখে। তাই সাম্প্রতিককালে দুদকের আর্জির পরিপ্রেক্ষিতে তার সম্পর্কে যে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাতে সপরিবারে তিনি মুখরোচক বিষয়ে পরিণত হয়েছেন।

প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে নামে-বেনামে কিংবা স্ত্রী-কন্যাদের নামে যে সম্পত্তির মালিক তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা হয়েছেন, তার ফিরিস্তি পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। ‘আলাদীনের চেরাগ’ বলে কালের কণ্ঠ যে শিরোনাম করেছে, তা যেন তার অর্জিত সম্পত্তির পরিমাণদৃষ্টে একেবারেই অকিঞ্চিৎকর মনে হয়! আমরা হতাশ বোধ করি এই ভেবে, সরকার কাকে বিশ্বাস করবে! কাদের কাছেই বা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুদায়িত্ব অর্পণ করবে! এর আগে আমরা কয়েকজন মন্ত্রী ও সাংসদের এরূপ সীমাহীন অর্থবিত্ত ও প্রতিপত্তির সংবাদ গণমাধ্যমে অবগত হয়েছি! তাদের অনেকেই আবার বিদেশে অর্থ পাচারের মাধ্যমে রেকর্ড সৃষ্টিও করেছেন! ওপরে-ওপরে নানা পেশা ও ব্যক্তিগতভাবে আমরা নানা লেবাস ধারণ করলেও সমাজের কেউই আর্থিক লোভকে সংবরণ করতে পারছি না! তিনি রাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি হোক কিংবা হোক পুলিশের প্রধান! কোথাও কোথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও নিজেদের পরিচ্ছন্ন ও শিক্ষিত হাতটি আর্থিক লোভ থেকে সংবরণ করতে পারছেন না বলে ইতোপূর্বে পত্রিকান্তরে একাধিক খবরও প্রকাশিত হয়েছে! জানা গেছে, তাদেরও কেউ কেউ স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে স্বনামে ধন্য হয়ে উঠেছেন! অর্থাৎ রাষ্ট্র যাকে বিশ্বাস করে যার ওপরে আস্থা স্থাপন ও ভরসা করে কোনো না কোনো স্থানে গুরুদায়িত্বে বসিয়েছে, তাদের অনেকেই রাষ্ট্রের সমুদয় বিশ্বাস ভঙ্গ ও আস্থা বিনষ্ট করে একেকজন হয়ে উঠেছেন সেখানকারই একেকজন রাবণ-বিশেষ দৈত্য-দানব! যেখানে যা পেয়েছেন তাই দশমুখে ভক্ষণ করে চলেছেন! একা না পারলে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজ প্রতিষ্ঠানে আত্মীয়-পরিজনকে চাকরি প্রদানের মাধ্যমে একেবারে রাবণের মতোই দশমুখে হাপুস হুপুস করে খেয়েছেন সরকারের এবং এ দেশের সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা-পয়সা! ‘সর্ষের ভেতর ভূত’-এর যে প্রবাদ-প্রবচন চালু আছে এরাই হলো সেই ভূত! এদের উদ্দেশ্যে কী বললে উপযুক্ত ধিক্কার জানানো হবে, তা আমরা জানি না।

একটানা সরকারে থাকার সুবাদে এবং শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টির কল্যাণে দেশে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, উন্নয়ন ঘটেছে সাধারণের জীবনমানেরও। সাধারণের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বেড়েছে সক্ষমতা। দ্রব্যমূল্যের ক্রমবৃদ্ধি ঘটলেও তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু। উন্নয়নের সামগ্রিক সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতির কল্যাণে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের তালিকায়ও অভিষিক্ত হয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে এশিয়ার টাইগার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে একাধিকবার। কিন্তু এই উন্নয়ন ও অগ্রগতি আজ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যেত, যদি কথিত ‘সর্ষের ভেতর ভূত’ প্রায় সর্বত্র বিরাজ না করত! কাদের বিশ্বাস করবেন জননেত্রী শেখ হাসিনা? কাদের ওপর রাখবেন অবিচল আস্থা? কারা জননেত্রী শেখ হাসিনার ভিশন ও মিশনকে পূর্ণতা দানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার সিংহদ্বারে পৌঁছে দেবেন? বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা এবং শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে আস্থাভাজন, বিশ্বাসী ও নির্লোভ মানুষ আমাদের রাষ্ট্রে আজ বেশি দরকার।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App