×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

ইসরায়েলের আগ্রাসন ও ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ

Icon

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ইসরায়েলের আগ্রাসন ও ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ

১৯১৭ সাল। পুরো বিশ্ব তখন ১ম বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই সময় ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতা লিওনেল ওয়াল্টার রথসচাইল্ডের কাছে তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফো একটি চিঠি পাঠান। যার মূল কথা ছিল ফিলিস্তিন ভূমিতে ইহুদিদের জন্য একটি জাতি রাষ্ট্র গঠন। উল্লেখ্য, এডমন্ড রথসচাইল্ড ছিলেন ইহুদিবাদ বা জায়নিজমের একজন একনিষ্ঠ বিশ্বাসী। এটি সেই সময়কার কথা, যখন ফিলিস্তিন অঞ্চলটির প্রশাসনিক ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের হাতে।

ব্রিটিশ সরকার আশা করেছিল যে, এই নথির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ইহুদিরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৮) মিত্র শক্তির (ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি) পাশে থাকতে রাজি হবে। ব্রিটিশ সরকার এবং কতিপয় নেতারা মনে করতেন, ইহুদি সম্প্রদায়ের যথেষ্ট পরিমাণ অর্থনৈতিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ছিল, যা তাদের যুদ্ধজয়ী হতে সাহায্য করবে। সাতষট্টি শব্দে লেখা এক টুকরো কাগজ ১০৬ বছর পূর্বের বিশ্বে এমন এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দিয়ে গেছে, যা এই সময়ে এসেও সমাধান করা সম্ভব হয়নি। এই ঘোষণা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ পরিষ্কার করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়।

১৯১৭ সালে তৎকালীন ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ১০ শতাংশ ছিল ইহুদি আর ৯০ শতাংশ আরব। মাত্র ২ শতাংশ ভূমির মালিকানা ছিল ইহুদিদের।

১৯৪৭ সালে নবগঠিত জাতিসংঘ ঘোষণা করে ফিলিস্তিনকে ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দুই ভাগ করে দুটি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা। তারই ধারাবাহিকতায় আজ থেকে ৭৫ বছর আগে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনিদের ওপর অনিঃশেষ এক বিপর্যয় নেমে আসে তাদের মাতৃভূমিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র স্থাপনের ঘোষণার মাধ্যমে। এর পরপরই ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে উদ্বাস্তু ও রাষ্ট্রহীন হওয়ার বিপর্যয় শুরু হয়। ফিলিস্তিনিরা আরবিতে বিপর্যয়কে বলে ‘নাকবা’।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক আভি শ্লেইম কিছুদিন আগে এক গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন-

যে যা-ই বলুক না কেন, ১৯৪৮ সালের আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফিলিস্তিনিদের প্রতি করা বিশাল এক অবিচার। ১০ লাখ ফিলিস্তিনির মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই শরণার্থী হয়ে পড়ে, মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিনের নাম মুছে দেয়া হয়। ইহুদিদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহতম ঘটনা হলো হলোকাস্ট। আর ফিলিস্তিনি জনগণেরটা হলো নাকবা। আর এই নাকবা শুধু একটি ঘটনা নয়, বরং তা হলো আজ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের নিজভূমি থেকে ক্রমাগত বিতাড়ন ও অপসারণ করার নির্মম চলমান প্রক্রিয়া।

ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ হিব্রু বাইবেল বা তানাখ অনুসারে তারা তিনটি বয়ানে বিশ্বাস করে, যার ওপর ভিত্তি করে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে জোরপূর্বক ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপনকে বৈধতা দেয়া হয়েছে। প্রথমত, ‘ঈশ্বর তাদের একটি ভূখণ্ড নির্দিষ্ট দিয়েছিলেন, যা তাদের পুণ্যভূমি হিসেবেই থাকবে এবং ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের ভূখণ্ড হলো সেই পুণ্যভূমি। যদিও বাইবেলের আরেক বিবরণ অনুসারে এটি মিসর থেকে ইউফ্রেতিস নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয়ত, তারা ঈশ্বর মনোনীত সম্প্রদায় (চুজেন পিপল), সে কারণেই তারা জগতের শ্রেষ্ঠতম জাতি, তাই তারা বাকি সব অ-ইহুদিকে নিম্ন জাতের বলে মনে করে।

তৃতীয়টি হলো ভূমিহীন মানুষের জন্য মনুষ্যহীন ভূমি। এটি জায়নবাদীদের খুব প্রিয় বয়ান। এ দিয়ে বোঝানো হয়, ইহুদিরা হলো ভূমিহীন জনগোষ্ঠী, যদিও একসময় তারা তাই ছিল বটে। একই সঙ্গে যে বলা হয়, ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে তখন কোনো বসতি ছিল না, যা পুরোপুরি ডাহা মিথ্যা কথা। ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায়, যুগের পর যুগ ধরে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে একটি সুগঠিত আরব সমাজ ছিল।

ইসরায়েল ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড দখল করে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, তা হলো ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও নৃশংস সামরিক দখলদারিত্ব ও হত্যাকাণ্ড। ইসরায়েলকে নিঃশর্তভাবে মদদ দিয়ে যাওয়ার জন্য পশ্চিমা বিশ্বও দায় এড়াতে পারে না। পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নির্লজ্জ সমর্থনের মাধ্যমে বারবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনীত বিভিন্ন প্রস্তাবে ভেটো প্রদান করে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে। এরাই কিনা আবার মানবাধিকারের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে, যেখানে ফিলিস্তিনে চলা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে এরা সমর্থন দিয়ে ডাবল স্ট্যান্ড প্লে করছে।

তানজদিা আক্তার লন্থিা, শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App