×
Icon ব্রেকিং
রংপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

ইন্দিরা-মুজিব দ্বিপক্ষীয় বৈঠক : প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

Icon

ইন্দিরা-মুজিব দ্বিপক্ষীয় বৈঠক : প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 ইন্দিরা-মুজিব দ্বিপক্ষীয় বৈঠক : প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

যার জীবনের কিছুটা অংশ কেটেছে ১৯৪৭ পূর্ববর্তী কলকাতায়, কলকাতায় তার যাওয়ার আগ্রহ থাকারই কথা। তাও যদি হয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম বিদেশ সফর, তাহলে তো কথাই নেই।

জীবিত বিশিষ্ট আমলাদের মধ্যে সর্বাধিক বয়োজ্যেষ্ঠ নিঃসন্দেহে মোহাম্মদ মতিউল ইসলাম, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থ সচিব। জন্ম ১৯৩০ সালে, ১৯৪৬-এ কলকাতা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন; তিনি ডেন্টিস্ট হতে চেয়েছিলেন; কিন্তু তার সরকারি চাকুরে বাবার চাওয়া ভিন্ন- তাকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে হবে। ভর্তি হলেন কমার্স কলেজে, কিন্তু ১৯৪৭-এর ভারত ভাগ, কলেজটাকেও ভাগ করল, একাংশ এসে সৃষ্টি হলো চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হতে পড়াশোনা ও আর্টিকেলশিপ শুরু করলেন। বড় ভাই নুরুল ইসলাম ১৯৫০ সালে সিএসপি হলেন (পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর); মতিউল ইসলামও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসলেন এবং ১৯৫২ সালে সিএসপি উত্তীর্ণ হয়ে কর্মজীবন শুরু করলেন।

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তার স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশে বিজয়ীর দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় ব্রিটিশ কমেট জেট প্লেন যখন কলকাতার ওপর দিয়ে উড়ে এলো, সে সময় লাখো মানুষ মহান নেতাকে এক নজর দেখার জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন- তারা হতাশ হলেন। সে কারণেই ভারত-বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের প্রথম বৈঠক কলকাতায় হওয়ার জন্যই নির্ধারিত হলো।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে আমার অন্তর্ভুক্তিকরণ ছিল শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত। নির্ধারিত সফরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগের কয়েক ঘণ্টা আগে অর্থসচিব মতিউল ইসলামকে টেলিফোনে এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয়। তাকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদই প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন। কারণ প্রতিপক্ষের সঙ্গে তার আলোচনার সময় জ্যেষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য কাউকে রাখতে হবে। মাত্র দুসপ্তাহ হয়েছে অর্থমন্ত্রী তাকে অর্থসচিব হিসেবে পেয়েছেন এবং এর মধ্যেই তিনি তার ওপর যে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন তা একজন সিভিল সার্ভেন্টের জন্য বিশেষ আত্মতৃপ্তির ব্যাপার। ইংরেজিতে লিখিত তার স্মৃতিকথা রিকালেকশনস অব অ্যা সিভিল সার্ভেন্ট টার্নড ব্যাংকার-এর একটি অধ্যায়ে ‘অ্যান আই-উইটনেস অ্যাকাউন্ট অব ইন্দিরা-মুজিব টকস অন বাইলেটারাল ইস্যুস’-এর অনুসৃতি এই রচনাটি :

ভারতীয় বিমানবাহিনীর উড়োজাহাজে কলকাতার স্বল্পদৈর্ঘ্য ফ্লাইটে তেমন ঘটনাবহুল কিছু ঘটেনি। ক’বছর পর আমি যখন ইউনিডো প্রধান হিসেবে দিল্লিতে যোগ দিই, আমার সঙ্গে এয়ার ভাইস মার্শাল মালহোত্রার দেখা হয়। তিনি আমাকে বলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সেই ফ্লাইটের পাইলট হিসেবে বহন করার দুর্লভ গৌরবের অধিকারী তিনি হয়েছেন। তিনি তখনো বহন করেছেন সে ফ্লাইটের প্যাসেঞ্জার মেনিফেস্ট এবং তাতে আমার নাম শনাক্ত করলেন।

কলকাতা বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানালেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর। আমাদের জানানো হলো যে প্রধানমন্ত্রী মুজিব এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল সামাদ আজাদ সরকারি হেলিকপ্টারে যাবেন এবং অন্যরা যাবেন গাড়িতে। কলকাতা গভর্নমেন্ট হাউসে সফরসঙ্গীরা যাবেন, গাড়িতে গেলে প্রধানমন্ত্রীকে ধরতে আমাদের ২-৩ ঘণ্টা লেগে যাবে। সে ক্ষেত্রে আমি পরামর্শ দিলাম পররাষ্ট্র সচিব এসএ করিমকে হেলিকপ্টারে একটি আসন পেতে হবে। যদি কোনো কারণে আমরা পৌঁছার আগেই দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কোনো অনির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সে ক্ষেত্রে শেখ মুজিবের পাশে একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার থাকা উচিত। অপর একটি হেলিকপ্টারে করিমের জন্য একটি আসনের বন্দোবস্ত করা হলো, আমরা অবশিষ্ট ক’জন গাড়িতে রওনা হলাম।

আমি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে এক গাড়িতে চড়লাম। সম্ভবত নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারত সরকারের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীকে হেলিকপ্টারে গভর্নমেন্ট হাউসে নেয়া হয়। কলকাতা গভর্নমেন্ট হাউস পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে বিভিন্ন বয়সি মানুষের চার-পাঁচটি করে সারি বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। কলকাতার রাস্তায় আমাদের গাড়ি যখন এগোচ্ছে সেøাগান ও করতালি দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে, তাদের মনে হয়েছে কোনো একটা গাড়িতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই রয়েছেন। আমি তোফায়েল আহমেদকে বললাম, তার উচিত হাত নেড়ে এই অভ্যর্থনার জবাব দেয়া। শেষ পর্যন্ত রাস্তার উভয়পাশের জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়তে নাড়তে আমরা গভর্নমেন্ট হাউসে পৌঁছলাম।

গভর্নমেন্ট হাউসে চিফ অব প্রটোকল ক্ষমা প্রার্থনার স্বরে জানালেন আমার জন্য পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ভারত সরকার সফরসঙ্গী হিসেবে আমার নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে রুম শেয়ার করার আয়োজন করতে পেরেছেন। এটা আমার জন্য সমস্যা নয়, নিশ্চয়ই তোফায়েল আহমেদের জন্য বিব্রতকর। তিনি আমার কাছে খুব সম্মানীয়, আমিও তার বড় ভাইয়ের মতো। দেখা গেল তিনি ঠিক করে নিয়েছেন আমি ঘুমিয়ে না পরা পর্যন্ত তিনি ভেতরে ঢুকবেন না, আর আমি জেগে ওঠার আগেই রুম থেকে বেরিয়ে যাবেন।

প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির মধ্যে ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, কলকাতা ময়দানে গণসংবর্ধনা, প্রধানমন্ত্রীর বাঙ্কোয়েটে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ।

কলকাতা ময়দানে গণসংবর্ধনায় ছিল অতিকায় জনসমাবেশ। সকাল থেকেই সব রাস্তার গন্তব্য কলকাতা ময়দান এবং দুপুর নাগাদ তা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। যথারীতি কলকাতার মেয়রের স্বাগত সম্ভাষণের পর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভাষণ দিলেন। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বললেন দুমাস আগে এই ময়দানে তিনি তিনটি প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন, প্রথমত বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, দ্বিতীয়ত শরণার্থীরা তাদের দেশে ফিরে যাবে এবং তৃতীয়ত শেখ মুজিব তাদের কাছে ফিরে আসবেন এবং এই যে শেখ মুজিব- তিনি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বজ্র করতালিতে উল্লসিত জনতা ফেটে পড়ে।

মিসেস ইন্দিরা গন্ধী যে সূত্রে এ কথা বলেছেন তা হচ্ছে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ এই কলকাতা ময়দানে তার ভাষণ। পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের পশ্চিমাংশের কয়েকটি অঞ্চলে চোরাই আক্রমণ চালায়। মিসেস গান্ধী এক ঘণ্টারও বেশি সময় পর সেদিন সভায় হাজির হয়েছিলেন এবং সংক্ষিপ্ত ভাষণে এই প্রতিশ্রæতিগুলো ব্যক্ত করেন। তিনি কলকাতার মানুষের কাছে তার প্রতিশ্রæতির কথা পুনরায় তুলে ধরেন।

ইন্দিরা গান্ধীর পরপরই শেখ মুজিব ভাষণ দেন। তিনি মাত্র ১০ মিনিট বলেন এবং উল্লেখ করেন :

লাখো লাখো জনতার লাখো রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা।...হানাদার বাহিনী আমার দেশের এক কোটি মানুষকে তাদের ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত করেছে। এই নিরাশ্রয় মানুষের আশ্রয় দিয়ে অন্ন দিয়ে বস্ত্র দিয়ে সর্বোপরি সান্ত¡না দিয়ে আপনারা যে উপকার করেছেন তা অতুলনীয়। আপনাদের এই দান পরিশোধের সাধ্য আমাদের নাই। কবিগুরুর ভাষায় বলতে পারি :

নিঃস্ব আমি রিক্ত আমি

দেবার কিছু নাই

আছে শুধু ভালোবাসা

দিলাম আমি তাই।

তার বক্তব্যে তড়িৎ-সঞ্চারক প্রভাব পড়ে জনতার ওপর, আমাদের ওপরও সে প্রভাব কম নয়। বঙ্গবন্ধু ফটোগ্রাফিক স্মৃতির অধিকারী ছিলেন এটা আমার জানা ছিল; কিন্তু তিনি যে এত সহজ ও সাবলীলভাবে পঙ্ক্তিমালা আবৃত্তি করে যেতে পারেন তা আমাদের অনেকেরই জানা ছিল না।

গভর্নমেন্ট হাউসের আরামদায়ক লাউঞ্জে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয়, উভয় প্রধানমন্ত্রী এখানেই অবস্থান করছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করছিলেন, আমি বসেছিলাম প্রধানমন্ত্রীর ঠিক পাশেই। পররাষ্ট্র সচিব আলোচনায় অংশগ্রহণ করেননি। এই বৈঠকে যেসব বিষয়ে আলোচনা হয় তার মধ্যে ছিল বাংলাদেশের শরণার্থীদের দ্রুত ও সুশৃঙ্খল প্রত্যাবর্তন, পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনের আওতায় তাদের যে সম্পত্তি সরকারের কাছে অর্পিত তা পূর্বাবস্থায় আনয়ন, ভারতীয় সৈন্যবাহিনী প্রত্যাহার। সে বৈঠকের আমি কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি দেখিনি, তবু বর্ণিত বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে অন্যান্যের মধ্যে সহায়তা করেছেন শরণ সিং এবং ডিপি ধর।

স্বাধীনতাযুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত শরণার্থীদের প্রশ্নে শেখ মুজিব তার সরকারের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা ঘোষণা করলেন, দ্রুত তাদের প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করা হবে, যারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিযানের পর বাড়িঘর ছেড়েছেন তাদের বাড়িঘর সুশৃঙ্খলভাবে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হবে। একটি প্রশ্ন উঠে আসে সেনাবাহিনীর অভিযানের আগেই যেসব বাঙালি পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে অভিবাসী হয়েছেন তাদের কি প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দেয়া হবে? বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন, সেনা অভিযানের আগে ভারতে অভিবাসী হয়েছেন তাদের গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না। শেখ মুজিব তাঁর অবস্থানে অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

পাকিস্তানে সেনা অভিযানের কারণে যারা শরণার্থী তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন।

বিরক্তিকর প্রশ্নটি ছিল ১৯৬৫-তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস অনুযায়ী যে সম্পত্তি সরকারের কাছে অর্পিত হয়েছে তা পূর্বতন মালিকের কাছে প্রত্যাবর্তন। এখানে শেখ মুজিবের অভিমত অত্যন্ত স্পষ্ট : তখনকার সরকার তখনকার প্রচলিত বিধিবিধান মেনেই তা করেছে, তা মূল মালিকের কাছে ফেরত দেয়ার সুযোগ নেই এবং তার সরকার এ ধরনের সম্পত্তি প্রত্যর্পণের বিষয় পুনরায় চালু করতে প্রস্তুত নয়। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অবস্থানের কারণে মিসেস গান্ধী মনে করলেন এ বিষয়ে তাকে আর চাপ দেয়া ঠিক হবে না, বিষয়টি সেখানেই নিষ্পত্তি হয়েছে বলে মনে করা হলো।

তারপর এলো ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়ার প্রশ্ন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অভিমত- তখনই বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এ কথায় মিসেস গান্ধী বললেন, বাংলাদেশ সরকারের প্রথম কাজ হবে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের কথা বলার আগে নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সমস্যা মোকাবিলার সামর্থ্য আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা। তবুও তাদের সরকার যদি তাদের সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে যে কোনো ধরনের নিরাপত্তা বিপর্যয় সন্তোষজনকভাবে সামলাতে সক্ষম হয়, তাহলে উভয় দেশের সম্মত একটি তারিখ হতে আমরা সানন্দে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেব। বাংলাদেশ যে কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম- প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নিশ্চয়তা অবগত করানোর পর সিদ্ধান্ত হয় ৩১ মার্চ ১৯৭২-এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সব ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হবে। সে সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা ডিপি ধর বঙ্গবন্ধুর কাছে এগিয়ে এলেন এবং বললেন, স্বাধীনতা যুদ্ধকালে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের মেরামত ও পুনর্বাসনের জন্য ভারতীয় রেলওয়ে একটি মাস্টারপ্লান প্রণয়ন করেছে। পাশের রুমে ভারতীয় রেলওয়ের একটি টিম পুনর্বাসন পরিকল্পনাটি তার কাছে ব্যাখ্যা করার জন্য অপেক্ষা করছে। ডিপি ধর প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করলেন, তিনি যেন তার সঙ্গে পাশের রুমে এসে পরিকল্পনা দেখেন এবং এই মাস্টারপ্লান অনুমোদন করেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ বেশ আনুষ্ঠানিক ভূমিকায় ফিরে এলেন। তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং ডিপি ধরকে বললেন, তাঁর পক্ষে বরং তাঁর অর্থসচিব পরিকল্পনাটি পরীক্ষা করে দেখবেন। ধর সাহেব ধাক্কা খেলেন। তিনি পুনরায় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করলেন; কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত পাল্টালেন না। বরং তিনি আমাকে ধর সাহেবের সঙ্গে গিয়ে রেলওয়ে পুনর্বাসন পরিকল্পনাটি দেখতে বললেন। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বিস্তারিতভাবে তা আমার কাছে ব্যাখ্যা করলেন। আমি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তাদের ধন্যবাদ জানালাম এবং প্রধানমন্ত্রীকে আমার বিবরণ দিলাম।

আমি কখনো বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করিনি তিনি কেন ডিপি ধরের সঙ্গে মাস্টারপ্লান দেখতে যাননি। আমার অনুমান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তে তার উপদেষ্টার কাছ থেকে এই অনুরোধ আসাটাকে তিনি ভালোভাবে নেননি। খসড়া ইশতেহার প্রস্তুতিতে আমি অংশগ্রহণ করিনি, আমি ধরে নিই পররাষ্ট্র সচিব এস এ করিম, দিল্লিতে আমাদের হাইকমিশনার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী তা করেছেন। আমি এয়ারপোর্ট রওনা হওয়ার সময় একটি কপি পাই এবং উড়োজাহাজে উঠে তা পড়ায় সুযোগ পাই। আমি পড়া শেষ করতেই প্রধানমন্ত্রী ইকোনমি ক্লাস কেবিনে প্রবেশ করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন এতে যা লেখা হয়েছে তাতে আমি সন্তুষ্ট তো? আমি জবাব দিলাম, হ্যাঁ।

বঙ্গবন্ধুর কলকাতা সফর পর্বতপ্রমাণ সাফল্য বয়ে এনেছে। তিনি আগাগোড়া প্রাধান্য বজায় রেখেছেন। তিনি কী চাচ্ছেন তা তিনি জানতেন এবং তা পেয়েছেন। আমরা মাথা উঁচু করে কলকাতা থেকে ফিরে আসি।

পুনশ্চ ঃ ১৯৭২-এর মার্চে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সরকারি সফরে বাংলাদেশে আসেন, সে সময়ই আমার মনে হয় কুড়ি বছর মেয়াদি ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে নৈশ বিহারের সময় যদিও আমি শেখ মুজিবের সঙ্গে ছিলাম, ফ্রেন্ডশিপ ট্রিটি মৈত্র চুক্তির ব্যাপারে কিছু জানার সুযোগ আমার হয়নি।

ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App