×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

ফলের রাজা ‘আমের’ বৃত্তান্ত

Icon

বাবুল রবিদাস

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তাপদগ্ধ গ্রীষ্মকাল শুধু দহনের কাল বা জ্বালাসৃষ্টির কাল নয়, ফুল ও ফলের মৌসুম এই গ্রীষ্মকাল। আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, আনারস বা লিচু- সবই গ্রীষ্মকালের ফল। এতসব ফলের সমারোহের মধ্যে যে ফলটির কথা সর্বাগ্রে মনে আসে, সেটি হলো আম। যত রকমের ফল মানুষের খাওয়ার উপযুক্ত, তার মধ্যে আমই সেরা ফল হিসেবে বিবেচিত। এজন্য আমকে ফলের রাজা বা ‘অমৃত ফল’ বলা হয়। আরো অনেক নাম আছে এই আমের। আম্র, রসাল, ম্যাঙ্গো, সহকার, চ্যুত বা যে কোনো নামেই আমকে ডাকা হোক না কেন, আমের কোনো তুলনা নেই। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ সনে আলেকজান্ডার প্রথম সিন্ধু উপত্যকা অঞ্চলে আমবাগান লক্ষ করেন। পরবর্তীকালে চীনা পর্যটক হিউয়েন-সাং ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে আমের পরিচিতি পেয়ে, সেটিকে বিদেশে রপ্তানি করার ব্যবস্থা করেন। এছাড়াও ইংরেজি, ফরাসি ও পর্তুগিজরা এই দেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আম রপ্তানি করার কার্যে রত থাকেন।

যার ফলে পৃথিবীর নানা দেশে আম চাষের সুযোগ ঘটে। বাংলাদেশ ও ভারতবর্ষ ব্যতীত বর্তমানে মেক্সিকো, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, মায়াম্মার, মিসর ও ফিলিপাইন প্রভৃতি বিভিন্ন দেশে আম উৎপন্ন হয়। তবে বাংলাদেশে যে ধরনের সুস্বাদু ও উৎকৃষ্ট জাতের আম পাওয়া যায়, পৃথিবীর অন্যত্র কোথাও সেইরকম পাওয়া যায় না। এ জন্যই বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে আম রপ্তানি হয় ও বিদেশি মুদ্রা অর্জিত হয়।

আম সে কাঁচা বা পাকা- যাই হোক না কেন, আমাদের শরীরের পক্ষে বিশেষ উপকারী। কাঁচা আমে থাকে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও জলীয় পদার্থ। তা ব্যতীত আমে লৌহ ও খনিজ পদার্থও থাকে। পক্ষান্তরে পাকা আমে প্রোটিন ও জলীয় পদার্থের উপস্থিতি অনেক বেশি। লৌহ ও ক্যালসিয়ামও থাকে বেশি পরিমাণে পাকা আমে। ভিটামিন এ ও সি যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায় আমের ভেতর। তুলনামূলকভাবে কাঁচা আম অপেক্ষা পাকা আম শরীরের পক্ষে উপকারী ও সুস্বাদুও বটে। রক্তের নানা অসুখের ক্ষেত্রে আম বিশেষ উপকারী যদিও কাঁচা আমের গ্রীষ্মকালে এক বিশেষ উপকারিতা আছে। প্রচণ্ড রৌদ্রতাপে কাঁচা আমের শরবত বা প্রলেপ বিশেষ স্বস্তি প্রদান করে। মধু সংমিশ্রণে আম গ্রহণ করলে প্লিহা, বাত বা ক্ষয়রোগের উপশম হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে আমাশয় রোগে শুষ্ক পুরনো কাঁচা আম বিশেষ ফলপ্রসূ এবং বমি বন্ধ করার ক্ষেত্রেও আমের আঁটির শাঁসের সঙ্গে মধুমিশ্রিত করে গ্রহণ করলে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।

আম শুধু একটি ফলই নয়- একটি সংস্কৃতির সংজ্ঞা বিশেষও। আমাদের দেশে আম নিয়ে সাধনায় লিপ্ত বিশেষজ্ঞরা। বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে কত নতুন নতুন ধরনের আম উপহার দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। ‘বোম্বাই’ নামক আমটির সঙ্গে মহারাষ্ট্র রাজ্যের বা বোম্বাই শহরের কোনো সম্পর্কই নেই, আসলে এই আমটি গোপালভোগ ও গঙ্গাসাগর বা গোপালভোগ ও কালুয়া নামক আমের অসবর্ণ বন্ধনের ফল। একসময়ে ভাগলপুর অঞ্চলে যে আমকে বলা হতো ‘কালুয়া’, এখন চব্বিশ পরগনায় সেই আমকেই ডাকা হয় ‘বোম্বাই’ নামে। আম্রচর্চা ঠিক কাব্যচর্চারই অনুরূপ। আম্রপর্ব এখন একটি অনুষ্ঠানও বটে। ‘আমবাগান তৈয়ারী করা হইতে শুরু করিয়া, মঞ্জরি হইতে ফল পাকানো, পাকা ফল সযতেœ সংগ্রহ, তুলার শয্যায় তাহার লালনপালন, ঠাণ্ডা জলে ডুবাইয়া ছুরির সাহায্যে কাটিয়া, তাহার পরিবেশন পাথর বা চিনামাটির পাত্রে- এই সবই জাপানিদের চা-উৎসবের মতোই ভারতের আম-পরব বা উৎসব। ইতিহাস বলে যে, প্রাচীনকালে কানাইলাল শীল নামে এক ধনী ব্যক্তি তার ইচ্ছাপত্রে পাঁচশ টাকা বরাদ্দ করিয়া গিয়েছিলেন, আপামর জনতার মধ্যে আম্র বিতরণের জন্য।’ এখন অবশ্য আমজনতার ভরসা আমের জন্য নিজ নিজ পকেট। আমের মৌসুমে, বৃত্তান্ত জেনেই সবার উচিত আমের সন্ধানে উদ্যোগী হওয়ার, যদিও বর্তমানে হাতের মুঠির অর্থ অপেক্ষা অনেক বেশি দামি আম্রকুল।

বাবুল রবিদাস : জজকোর্ট, জয়পুরহাট।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App