×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

বর্জ্যকে অর্ঘ্যরে অভিযাত্রায় বাংলাদেশ

Icon

মোস্তফা কামাল

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বর্জ্যকে অর্ঘ্যরে অভিযাত্রায় বাংলাদেশ

রাজনীতিতে অনেকটা বীতশ্রদ্ধ মানুষ। আবার রাজনীতির খবরেই টান বেশি। এতে রাজনীতির বাইরের বিষয়াদির খবর বেখবরে থেকে যাচ্ছে অনায়াসেই। ধুলাবালি, ময়লা-আবর্জনার খবর পানসে লাগে। নাক ছিটকানোর বিষয়। এর মাঝেও রয়েছে সম্ভাবনার অনেক খবর। বর্জ্য থেকেও অনেক কিছু হতে পারে শোনা গেলেও বাস্তবে করে দেখানোর পর্বটা উহ্য থাকছে। নইলে পড়ে থাকছে বেখবরে। শোণা কথা বাস্তবে ফলাতে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি প্রক্রিয়া চলছে বেশ জোরেশোরে। তবে নীরবে। এরই মধ্যে বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। বেস্ট প্রকল্পের অধীনে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট নির্মাণের কাজও এগোচ্ছে। তা করতে হলে জ্বালানির ব্যবহার করতে হবে পরিমিত। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে আসবে সম্প্রসারণ। ব্যবহার কমাতে হবে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের। একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়তে সরকারি পর্যায়ে কাজ চলছে পুরোদমে।

দৃম্যমান না হলেও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যুগে প্রবেশ করেছে আরো আগেই। কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি পাইলট প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। পরিমাণে যা-ই হোক উৎপাদনে আসার ফলে এটি বিশ্বের তৃতীয় দেশ হিসেবে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাতারে অভিষেক ঘটাল বাংলাদেশকে। সেখানে প্রতিদিন সাড়ে ১১ টন বর্জ্য ব্যবহার হচ্ছে। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৪০-৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ, ১২শ লিটার ডিস্ট্রিল্ড ওয়াটার এবং ১৫০০ কেজি অ্যাস (ছাই)। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয় প্রায় সাড়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গা। তাদের জন্য ধ্বংস করা হয় প্রায় ৮ হাজার হেক্টর বনভূমি। বিশাল এ জনগোষ্ঠীর পয়ঃজৈব এবং রোহিঙ্গাদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে বরবাদ হতে থাকে পরিবেশের। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবির সহায়তায় ২০২১ সালে ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ‘ওমনি প্রসেসর’ নামের প্রকল্পটি উদ্বোধন হয় গেল বছরের ১০ নভেম্বর।

এ অভিযাত্রায় সেনেগাল এবং ভারতের পর তৃতীয় দেশ বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কিছু বিধিনিষেধের কারণে প্রকল্পটিতে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করা সম্ভব হয়। ৬০-৭০ কিলোওয়ার্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও এখন প্রতিদিন ৪০-৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ, এক হাজার থেকে ১২শ লিটার পানি এবং ১২শ থেকে ১৫শ কেজি অ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। পুরোপুরি প্রকল্পটি চালু হলে সেখানকার উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাইরে সরবরাহ করার পাশাপাশি উৎপাদিত পানি বিক্রি করেই মাসিক ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। সেইসঙ্গে পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনাও। উন্নত দেশে বাড়ির সামনের দিকে খাল বা জলাশয় থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। জলাশয় পেছনে রেখে বাড়ি বানানোর সংস্কৃতি এখানে। জলাশয় বা খালগুলোকে সবাই ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করে। এতে স্বাভাবিকভাবেই পানিপ্রবাহ নষ্ট হয়, দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। নগরীর খাল, ড্রেন ও লেকে বাসাবাড়ির বর্জ্য না ফেলতে নাগরিকদের সচেতন করার চেষ্টায় সাফল্য পাচ্ছে না সিটি কর্পোরেশন। ফেলে দেয়া লেপ-তোশক, সোফা, কমোড, বেসিন, টায়ার, রিকশার অংশবিশেষ, প্লাস্টিকের বোতল, শো-পিস প্রদর্শন করে পেরেছে কেবল এক্সিবিশনের বিনোদন দিতে।

ভৌগোলিক, প্রাকৃতিক এবং ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশ জলবায়ু সহনশীল দেশ। কিন্তু এ সহনশীলতা অসীম নয়। দূষণ বা বর্জ্যও এখন আর সীমিত নয়, বরং বহুমুখী। বর্তমান সময়ে এমন মানুষ মেলা দুষ্কর যে কোনো ইকেলট্রনিক্স যন্ত্র ব্যবহার করে না। এই যন্ত্রপাতি মানুষের জীবনের অংশ হয়ে গছে। এসব যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ যে নষ্ট বা বিকল হয়ে যাওয়ার পর বর্জ্য হয়ে যাচ্ছে, এখনো তা অনেকের ভাবনার বাইরে। তাও যেনতেন বর্জ্য নয়, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় ভয়ংকর। এগুলোর নাম ই-বর্জ্য। এর ৫ শতাংশ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বা রিসাইক্লিং শিল্পে ব্যবহার করা হয়। বাকি পুরোটাই যায় ভাগাড়ে। বছর বছর ই-বর্জ্য বাড়বাড়ন্ত। এক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর চার লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। ২০৩৫ সাল নাগাদ যার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৪৬ লাখ ২০ হাজার টন। এগুলোতে কী পরিমাণ বিষাক্ত পদার্থ থাকে তা অনেকের ভাবনাতীত। সঠিক পদ্ধতিতে ই-বর্জ্য বিচ্ছিন্ন করা না হলে বা টুকরো টুকরো না করলে বা গলিয়ে না ফেললে সেখান থেকে ডাইঅক্সিনের মতো বিষাক্ত ধূলি বা টক্সিন মারাত্মক বায়ুদূষণ ঘটায়। ই-বর্জ্যে থাকা পারদ, লিথিয়াম, দস্তা এবং বেরিয়ামের মতো বিভিন্ন ভারী ধাতু ভূগর্ভের গভীরেও পৌঁছে যায়। এতে ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হয়। একবার ভূগর্ভস্থ পানিতে পৌঁছে গেলে এসব দূষিত পদার্থ পুকুর, ঝর্ণা, নদী এবং সাগরেও ছড়িয়ে যায়। তাই যেনতেনভাবে ই-বর্জ্য ফেলে দেয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। ই-বর্জ্য কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি করতে থাকে। সঠিকভাবে ই-বর্জ্য নিষ্কাশন করা না হলে এর থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাস, পানি, মাটি এবং সর্বোপরি মানবস্বাস্থ্যের ভয়ংকর ক্ষতি ডেকে আনছে। এ অবস্থায় সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।

মানবসভ্যতা এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির উৎকর্ষ এসেছে। তা মানুষকে আরাম-আয়েশ দিচ্ছে। পীড়নেও ফেলছে। আবার মানুষের সামনে নতুন নতুন সমাধানের পথও তৈরি করেছে। ই-পণ্যের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে এগুলো কাউকে দিয়ে দেয়া যায় যারা তা কাজে লাগাতে পারেন। ইদানীং পুরনো ইলেকট্রনিক্স পণ্য জমা দিয়ে নতুন পণ্য কম দামে পাওয়া যায়। দোকানিরা পুরনো যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ দিয়ে সেগুলোকে মেরামত করে বিক্রি করে। বিজনেস আইডিয়া হিসেবে এটি নতুন। উন্নত দেশগুলো তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজে লাগিয়ে বর্জ্য থেকে রিসাইকেলের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো তা পারছে না। বাংলাদেশের বিষয়টিকে অ্যাড্রেস করা অবশ্যই ভালো খবর। পানসে হলেও এ খবরটি বিস্তারের দাবি রাখে। মন্দের মাঝে লুকানো ভালো অংশ গ্রহণ করা আধুনিক বিশ্ব বা বিশ্বসভ্যতার শিক্ষা।

ই-বর্জ্যে লুকানো থাকা সিসা, ক্যাডমিয়াম, প্লাটিনাম, নিকেল, টিন, দস্তা, সালফার, ফসফরাস আইটেম হিসেবে মূল্যবান। মূল্যবান উপাদানগুলো আলাদা করে তা প্রক্রিয়াজাত করার পদ্ধতি দেশে দেশে নতুন সম্ভাবনা। এমনকি বাণিজ্যও। বিশ্বে মোট ইলেকট্রনিক্স বর্জ্য সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় এশিয়ায়। এর জন্য দায়ী সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব। কোনো কোনো দেশ আইন মেনে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে। ই-বর্জ্য যেভাবে সমস্যার বিষয়, বিপরীতে বড় ধরনের আয়েরও উৎস। সমস্যাকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে গেলে কিছু এক্সপেরিমেন্ট স্বাভাবিক। বাংলাদেশ সেইপথের অভিযাত্রী হয়ে ওঠা অবশ্যই মোটা দাগের ঘটনা। বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশন-ইএসডিওর গবেষণায় প্রতি বছর দেশে প্রায় চার লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপাদনের তথ্য রয়েছে। আরেক গবেষণায় দেখা যায়- প্রতি বছর বাংলাদেশে টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, বাল্ব, থার্মোমিটার, চিকিৎসা ও ডেন্টাল বর্জ্য থেকে ১২৪ মিলিয়ন টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়। বুয়েট ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালিত যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, এক টন প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড ও র‌্যাম থেকে পাওয়া যেতে পারে ২৮ হাজার ডলার বা ২৪ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণ, রুপা, তামা ও টিন। অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, নিকেলসহ মূল্যবান অন্যান্য ধাতবও থাকছে। ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান উপাদানগুলো আহরণ করে তা বাজারে কাজে লাগাতে পারলে তা হবে ব্যাপক সাফল্যের বিষয়।

দেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে ই-বর্জ্য রিসাইকেলের উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের বেশিরভাগেরই এখন পর্যন্ত মূল্যবান ধাতব তুলে আনার সক্ষমতা নেই। এ ব্যবসায় সফল হতে চাইলে তাদের সক্ষমতা বাড়াতেই হবে। নইলে এটি ভাঙারিদের ব্যবসা হয়েই থাকবে। নারায়ণগঞ্জের দেলপাড়ায় বড় পরিসরে গড়ে উঠতে থাকা ই-বর্জ্য প্লান্ট সেইক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এ সংক্রান্ত ভালো খবর আরো আছে। পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন-বেস্ট নামে একটি প্রকল্পের কাজ চলমান। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পের চতুর্থ কম্পোনেন্টের অধীনে নির্মাণ হবে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট। এজন্য প্রাথমিকভাবে ব্যয় হবে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি হতে পারে গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে। সঠিকভাবে ই-বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবেশসম্মত উপায়ে রিসাইকেল করতে পারলে তা সম্পদে রূপান্তর নিশ্চয়ই আশাজাগানিয়া খবর। এতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও ব্যাপক।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App