×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

অবৈধ কীভাবে বৈধ হয়?

Icon

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অবৈধ কীভাবে বৈধ হয়?
অবৈধ কি কখনো বৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে? আইনের খেলাই কেবল নয়, আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যারা অবৈধভাবে ভূমি উন্নয়ন করছেন এবং করেছেন, বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন, তারা আইনের তোয়াক্কা করেননি। কেন তারা আইনের তোয়াক্কা করেননি? কারণ আইনে অবৈধ বিবেচিত হলেও মোটা অঙ্কের জরিমানা এবং সবার অলক্ষ্যে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তারা বৈধ হবেন। ইতোপূর্বে তারা দেখেছেন যে বসুন্ধরাকে এই অবৈধ কাজ করতে। বসুন্ধরা রাজউকের কোনো অনুমোদন না নিয়েই তাদের জমি ভরাটসহ, প্লট তৈরি, বিক্রি এবং বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে। আর কে না জানে বসুন্ধরা পরে রাজউকের অনুমোদনও নিয়েছে। সেই অনুমোদনও যে অবৈধ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো রাজউক এলাকায় ভূমি উন্নয়ন করে প্লট তৈরি ও বিক্রি, ভবন নির্মাণও করা যায় না। কিন্তু সেই অবৈধ কাজটা করে বসুন্ধরা পার পেয়ে গেছে, অর্থাৎ রাজউকের অনুমোদন পেয়েছে ও বহালতবিয়তে ব্যবসা করে যাচ্ছে, তখন অন্য ভূমি ব্যবসায়ী ও হাউজিং কোম্পানিগুলো সেই পথে গেলে কি তাদের দোষ দেয়া যাবে? সমকালে যে রিপোর্ট বেরিয়েছে ঢাকার বছিলা এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের, যাদের কারোরই কোনো অনুমোদন নেই। এবং তারাই বলেছেন, রাজউককে বড় অঙ্কের জরিমানা দিয়ে অনুমোদন নেবেন তারা। এবং তারা বিশ্বাসী রাজউকের অনুমোদন তারা পাবেনই। কেননা রাজধানীর অনগ্রসর ও পতিত এলাকাটিতে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগা ছিল অত্যন্ত জরুরি। এলাকাটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সীমানার মধ্যে। এমনকি ড্যাপের যে নকশা ও এলাকা, তার ভেতরেই রয়েছে বছিলা। বছিলা বোধহয় ঢাকা উত্তর সিটির অধীন এলাকা। যদি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন হয়, তাহলে সেখানে অনুমোদনহীনভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণ ও বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে কীভাবে? রাজউকের কি দৃষ্টি নেই? চোখ নেই? তার কি লোকবলের অভাব? তারা কেন দেখল না যে কতিপয় হাউজিং কোম্পানি বহুতল বাড়ি বানিয়ে বিক্রি করছে? এবং তুলনামূলকভাবে বছিলার বাসার বা প্লটের দাম কম, তাই ঠাঁই পাওয়ার আশায় অনেকেই ফ্ল্যাট তৈরি করছেন, কিনেছেন এবং বসবাস করছেন। এই প্রশ্নে নগর পরিকল্পনাবিদরা ও রাজউক চেয়ারম্যান কী বলেন, জেনে নিই। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, চোখের সামনে বিশাল জলাধারপ্রবণ এলাকা ভরাট করে হাজারো বহুতল ভবন হলেও রাজউক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। এটি ছোটখাটো বিষয় নয়, এখানে সম্পূর্ণ ব্যর্থতা রাজউকের। যেসব চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্যের আমলে এ ঘটনা ঘটেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা দরকার। কারণ দায়িত্বে থেকেও তারা না দেখার ভান করেছেন। এখন মানুষ ভাবতে শুরু করেছে, নকশা ছাড়া ভবন করলে কিছুই হয় না। তিনি বলেন, বেড়িবাঁধের বাইরে নকশাবিহীন ভবন নির্মাণ, এরপর সেখানে বিশাল জনপদ হলেও নেই খেলার মাঠ, পার্ক কিংবা বাজার। এখান থেকে ভবিষ্যতে একটি ‘বিকলাঙ্গ প্রজন্ম’ তৈরি হবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, রাজউক ভাঙতে না পেরে হাজার হাজার ভবনের বৈধতা দেবে। এতে প্রতিষ্ঠানটির লোকজনের বাণিজ্য করার সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন বলেন, বছিলা এলাকার ১৫টি হাউজিং কোম্পানিকে বৈধতা না দিতে আমরা দাবি করেছিলাম। রাজউকও নিষেধাজ্ঞা দেয়। সব ভবনই যেখানে অবৈধ, সেখানে নাগরিক সুবিধা আসবে কীভাবে? যারা জমির মালিক কিংবা প্লট কিনেছেন, তারা কেবলই মুনাফা খুঁজছেন। তারা ধরেই নিয়েছেন, এখানে কেবল মানুষই থাকবে। এসব প্লট ও ফ্ল্যাটের মালিকরা প্রকারান্তে ভূমিদস্যু। এখনো ফাঁকা জায়গাগুলো ড্রেজিংয়ের সাহায্যে নিয়মিত ভরাট করা হচ্ছে। রাজউক তাদের কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করছে না। জানতে চাইলে রাজউকের মুখপাত্র ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীর অদূরদর্শিতার কারণে এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে। খাল ও হালট দখল করে গড়া ভবন অপসারণ করার চিন্তা চলছে। ল্যান্ড রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট টেকনিক পদ্ধতির মাধ্যমে পুরো এলাকা পরিকল্পনার মধ্যে আনা হবে। জরিমানা করে ইমারত নির্মাণ আইনের আওতায় কিছু ভবনের বৈধতা এবং বাকিগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। (সমকাল/ ১১ মে, ২৪) রাজউক মুখপাত্র ও প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলামের ল্যান্ড রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট টেকনিক পদ্ধতির মাধ্যমে অনুমোদনের যে পরিকল্পনার আভাস দিয়েছেন, তাতেই তার ও রাজউকের আইনি মানসিকতা যদি ধরি, তাহলে গোটা দোষটাই গিয়ে পড়ে তাদেরই ওপরে। যারা নগর পরিকল্পনা ও রাজউকের সম্প্রসারণের জন্য আইন প্রণয়ন করেছেন, তারা আইনি ফাঁক রেখেই করেছেন, যাতে টু-পাইস কামানোর পথ খোলা থাকে। এই রি-অ্যাডজাস্টমেন্টের পদ্ধতির নামেও সেটাই আমরা লক্ষ্য করেছি। এ কারণেই আশরাফুল ইসলাম বলতে পেরেছেন যে, কিছু ভবনকে তারা অনুমোদন দেবেন, আর কিছু ভবন গুঁড়িয়ে দেবেন। এই যে অ্যাকশনের কথা বললেন, তাকে বাহবা দেব না নিন্দা জানাব বুঝতে পারছি না। কারণ যারা অবৈধ ভবন নির্মাণ করেছেন, তারা বা তাদের কিছু ভবন অনুমোদন দিয়ে বাকি ভবনগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। যারা রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই রাস্তাঘাটের জায়গা ছেড়ে ভবন নির্মাণ করেছেন, তারা অনুমোদন পাবেন বলেই অনুমান করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারা বাকিগুলো গুঁড়িয়ে দেবেন কোন আইনের বলে? যদি রাজউকের অনুমোদনের তোয়াক্কা কোনো হাউজিং কোম্পানিই না করে থাকে, তাহলে এ ক্ষেত্রে সবাই অন্যায়কারী আইনের চোখে। তাদের অপরাধকে কেন জরিমানার বিনিময়ে অনুমোদন দেবে রাজউক? দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে রাজউকের চোখের সামনে, কর্মকর্তাদের নাগালের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে বহুতল ভবন নির্মাণের উৎসব চললেও, তারা সজাগ হয়নি, বাধা দেয়নি বা উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে ওই বিষয়টি তুলে ধরেনি। এটা ডাইরেক্ট রাজউকের বর্তমান ও অতীতের দায়িত্বপ্রাপ্তদের দোষ বা তাদের কাঁধে চাপে। তাদেরই গাফিলতি বা তাদেরই গোপন প্ররোচনায় অবৈধ দখলদার, ভূমিদস্যুরা রাজধানী শহরের সুন্দর পরিকল্পনা ও সৌন্দর্যকে নস্যাৎ করে দিয়ে চলেছে। মহানগর ঢাকার নালা-ডোবা, খাল ও হালট, রাস্তা ইত্যাদি ভরাট করে দিয়ে বহু সরকারি ও বেসরকারি ভবন উঠেছে। তার মধ্যে সেতু কর্তৃপক্ষের সেতু ভবনটি অন্যতম, যা একটি খালকে বন্ধ করে দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। আমি জানি বর্তমান ক্ষমতাসীনরা বলবেন ওই ভবন আমাদের সময় হয়নি। যদি তাই সত্য হয়, তাহলে যারা সে সময় ক্ষমতায় ছিলেন, যারা রাজউকের দায়িত্বে ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা কেন নেয়া হয়নি? সরকারি তরফের কাজ যদি ভূমিদস্যুদের মতো হয়, তাহলে প্রকৃত ভূমিদস্যুরা তো উদ্বায়ু নাচে শামিল হবে আরো ভূমি দখলে এবং সেটাই তো হয়েছে। এই শহরের পাইওনিয়ার হাউজিং ব্যবসায়ী হিসেবে ইস্টার্ন হাউজিং বেসরকারি ও সরকার উভয় রকম ভূমি দখল করেই তাদের বিশাল বিশাল হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। যমুনা হাউজিং ব্যক্তিজমি কিনে ও কিছু দখল করে, খাস নদী ও নালা দখলে নিয়েও সেই প্রকল্প আজো বাস্তবায়ন করতে পারেনি আইনি হস্তক্ষেপের কারণে। কিন্তু একই কাজ করে বসুন্ধরা পার পেয়ে গেছে। কারণ তার সহায় হিসেবে ছিল গত শতকের আশির দশকের একজন সেনাশাসক ও পরে রাষ্ট্রপতির অবাধ আনুকূল্য। এখন সেই বসুন্ধরা বর্তমান সরকারের আনুকূল্য পেয়ে বিভিন্ন প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করেছে, কিন্তু আইনের ফাঁকগুলোর কারণে রাজউক বা আরো বড় কোনো আইন প্রতিষ্ঠান তাদের ধরতে পারছে না। এই দুই জায়ান্ট হাউজিং কোম্পানির জবরদখল ও তা অনুমোদনের ফলে পরবর্তীতে গজিয়ে উঠেছে অনেক হাউজিং কোম্পানি। তারা সংখ্যায় অনেক বলে তাদের সম্মিলিত আকার কিন্তু ইস্টার্ন হাইজিং বা বসুন্ধরার চেয়ে কোনোভাবেই ছোট নয়। বুড়িগঙ্গার পাড়ে কিংবা ওপাড়ে এই বছিলা। নগর ম্যাপ দেখে মনে হয় এটি বুড়িগঙ্গারই একটি চরের বসতি। গ্রাম হিস্যে ছিল বছিলার পরিচিতি। কিন্তু সেই পশ্চাৎপদ গ্রামটি মুহম্মদপুরের সন্নিকটে হওয়ায় চোখ পড়ে ডেভেলপারদের, যারা সরকারি ও বেসরকারি ভূমি দখল বা লিজ নিয়ে ব্যবসার ফাঁদ পাতেন। এখন যারা বছিলাকে বসবাসের উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন, তাদের শক্তির উৎস কী? তা আমরা জানি না। কিন্তু আমরা জানি সরকারি দলের প্রভাবশালীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া ওই অননুমোদিত ভবন তোলা সম্ভব নয়। যারা সেখানে কোটি কোটি টাকা ইনভেস্টমেন্ট করেছেন, যারা অনেক টাকা দিয়ে ফ্ল্যাট কিনেছেন, তারা মনে করছেন একদিন না একদিন রাজউক তাদের অনুমোদন দেবেই। অতীত রেকর্ড সেটাই বলছে। এবং প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের কথাও এটা স্পষ্ট যে, তারা অনুমোদন দেবেন কিছু ভবন। কিন্তু আমরা জানি একটি বিল্ডিংও রাজউক ভাঙতে পারবে না। এর কারণ তারা ঘুষ দিয়ে ভবনগুলো পাস করিয়ে নেবেন। এমনকি জাতীয় সংসদে এই এলাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে যে- ভবন নির্মাণের পর কেন ভাঙা হবে? ভবন নির্মাণের আগে রাজউকের পরিকল্পক ও ক্ষমতাবানরা কি ঘুমিয়ে ছিলেন? বাস্তবে তারা জেগেই ঘুমিয়েছিলেন। এটা কেবল রাজউকের বেলায়ই সত্য নয়, দুটি সিটি করপোরেশনের মন্ত্রীর পদমর্যাদায় আসীন মেয়রদ্বয় যেসব উদ্ভূত সমস্যা-সংকটের সমাধান করতে পারেননি বা পারছেন না অদক্ষ, অযোগ্য ও কর্মবিমুখ কর্মকর্তাদের (তবে রাজনীতিতে তারা ভীষণ রকম কর্মযোগী, বিশেষ করে সরকারি দলের তল্পিবাহক হতে পেরে তারা বর্তে যায়) কারণে, ঠিক সেই রকমই কাজ চলছে সরকারি দপ্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অদক্ষ আমলাতন্ত্রেই মূলত অন্যায় আর অবৈধ কাজ করতে উৎসাহ দেয়। তাদের অবৈধ চর্চা ঢাকা দেয়ার জন্য নিচের স্তরের কর্মকর্তাদেরও অবৈধ অন্যায় করতে সহায়তা দেয়। এসব অন্যায়ই মূলত আমাদের পৌঁছাতে দেয় না কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে। ড. মাহবুব হাসান : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App