×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

গান্ধী ও জিন্নাহর মিল ও অমিল

Icon

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গান্ধী ও জিন্নাহর মিল ও অমিল
(প্রথম কিস্তি) সাতচল্লিশের দেশভাগে জিন্নাহর ভূমিকাকে খাটো করে দেখার উপায় নেই, তবে এ কথা বলা সম্পূর্ণ ইতিহাসবিরুদ্ধ হবে যে, তিনিই ছিলেন একমাত্র হোতা। হ্যাঁ, দেশভাগের ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে একগুঁয়ে ছিলেন এটা ঠিক, কিন্তু কাজটা তার একার পক্ষে করা সম্ভব ছিল না। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মূল হোতা ছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক; এ ব্যাপারে আসল কৃতিত্ব ও সাফল্য তাদেরই। অপরদিকে কংগ্রেসের ভেতরে ও বাইরে ছিল হিন্দু মহাসভাপন্থিরা। হিন্দু মহাসভা সাধারণ নির্বাচনে একটিও আসন পেত না, পাওয়া যে অত্যাবশ্যক ছিল তাও না, কেননা কংগ্রেসের ভেতরেই তাদের লোক ছিল। এবং হিন্দু মহাসভাপন্থিরা যে নির্বাচনে জিতত না তার কারণ মহাসভাপন্থিদের অনেকেই মনে করত যে কংগ্রেসই তাদের উদ্দেশ্য অধিকতর সাফল্যের সঙ্গে সিদ্ধ করতে সক্ষম হবে; তাই মহাসভাকে সমর্থন করলেও তার পক্ষে ভোট দিয়ে নির্বাচনী যুদ্ধে কংগ্রেসকে দুর্বল করাটা ঠিক হবে না বলে তারা ধারণা করত। দেশভাগের ব্যাপারে প্রকাশ্য এবং ছদ্মবেশী মহাসভাপন্থিদের চাপটা মোটেই কম ছিল না। হিন্দু পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ীদের ভূমিকাটাও সামান্য ছিল না, দেশভাগ হলে ভারতের অর্থনৈতিক জীবনে তারা অপ্রতিদ্ব›দ্বী কর্তৃত্বের অধিকারী হবে এই ভরসা তাদের ছিল; ঠিক একই আশা বুকে নিয়ে তাদের বিপরীতে উঠতি মুসলমান শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা চেয়েছে পাকিস্তান কায়েম হোক এবং যত শিগগির হয় ততই মঙ্গল। মানবিক বিবেচনায় গান্ধী বড় ছিলেন জিন্নাহর তুলনায়। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গান্ধী দেশভাগের বিপক্ষে ছিলেন, জিন্নাহ ছিলেন পুরোপুরি পক্ষে; কিন্তু দেশভাগের পর মুসলমানদের শতকরা চল্লিশজনকে ভারতে ফেলে রেখে এবং সংখ্যালঘু হিসেবে আগের তুলনায় আরো বেশি বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে জিন্নাহ যখন নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব নিতে ব্যস্ত তখনই গান্ধী তার জীবনের মহত্তম কাজটি সম্পন্ন করেছেন। যে মুসলিম সম্প্রদায় তাকে তাদের পহেলা নম্বরের শত্রæ মনে করত তাদের রক্ষা করতে গিয়েই শেষ পর্যন্ত তিনি প্রাণ দিলেন। জিন্নাহর কাছ থেকে এমন উষ্ণহৃদয় প্রত্যাশা করা যেত না। বড়লাট মাউন্টব্যাটেন যে তার সম্পর্কে বিরূপ ধারণা নিয়ে ভারতবর্ষে এসেছিলেন তা নয়, কিন্তু জিন্নাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার পর জিন্নাহ সম্পর্কে তার প্রাথমিক যে ধারণা হয়েছিল তা হলো, জিন্নাহ হচ্ছেন শীতল, উদ্ধত ও উন্নাসিক এবং মনে হয়েছিল যে, তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি ‘পধৎবফ সঁপয ভড়ৎ ঃযব ৎবংঁষঃ ড়নঃধরহবফ ঃযধহ ভড়ৎ ঃযব রসঢ়ৎবংংরড়হ সধফব’ এর কয়েক দিন পরে ১০ এপ্রিল ১৯৪৭-এ মাউন্টব্যাটেন তার ব্যক্তিগত স্টাফকে জানাচ্ছেন, জিন্নাহর সঙ্গে দেখা না হলে তিনি ভাবতেই পারতেন না প্রশাসনিক জ্ঞান বা দায়িত্ববোধের অতটা অভাবগ্রস্ত একজন ব্যক্তি কী করে অমন একটি ক্ষমতাশীল অবস্থানে থাকতে পারেন। ব্রিটিশ আমলাদের পক্ষে জিন্নাহকে অপছন্দ করার কোনো রাজনৈতিক কারণ ছিল না; বিশেষ করে ১৯৩৯ সালের পরে কংগ্রেস যখন সরকারের যুদ্ধতৎপরতার সঙ্গে অসহযোগিতা করছিল সেই জরুরি সময়টাতে; কিন্তু এমনকি তারাও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি জিন্নাহর সঙ্গে তাল রাখতে পারেননি। মাউন্টব্যাটেনের আগের বড়লাট ওয়াভেলও লক্ষ করেছেন যে জিন্নাহর অনমনীয়তাকে মেনে নেয়া কঠিন। সিমলায় ডাকা ওয়াভেলের সম্মেলনে একজিকিউটিভ কাউন্সিলে সদস্য মনোনয়নের ব্যাপারে জিন্নাহর অবস্থান ছিল এই রকমের যে, মুসলিম লীগই যেহেতু মুসলমানদের ‘একমাত্র সংগঠন’, তাই কাউন্সিলের মুসলিম সদস্যরা সবাই লীগ দ্বারা মনোনীত হবেন। পাঞ্জাব মুসলিমপ্রধান প্রদেশ, কিন্তু সেখানে তখন মুসলিম লীগের মন্ত্রিসভা ছিল না; ওয়াভেল চাইছিলেন পাঞ্জাব থেকে মুসলিম লীগের বাইরের একজন প্রতিনিধি নেবেন; কিন্তু জিন্নাহ তাতে মোটেই সম্মত হননি। ওয়াভেল দেখলেন যে, জিন্নাহকে কোনো যুক্তি দিয়েই টলানো যাবে না, তাই আলোচনা চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন মনে করে তিনি ওই সম্মেলন ব্যর্থ হয়েছে বলে ঘোষণা করেছিলেন। এক চিঠিতে ওয়াভেল ভারত সচিবকে এই রকমের ধারণা দেন যে, জিন্নাহর সমর্থকদের মধ্যে যারা চিন্তাভাবনা করেন তারা যদিও পাকিস্তানের অসুবিধা সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল, তবুও জিন্নাহ যতদিন লীগের নীতিনির্ধারণ করবেন ততদিন পাকিস্তানের ব্যাপারে লীগ অনড় থাকবে। পরবর্তীতে মাউন্টব্যাটেনের ধারণা হয়েছে যে, জিন্নাহ যুক্তির দিকে যেতে চান না। যে দ্বিজাতিতত্ত্বের যুক্তিতে তিনি ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত করতে চাইছিলেন, ঠিক সেই একই যুক্তিতে বাংলা ও পাঞ্জাবকেও দুভাগ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এটা তিনি মানতেই রাজি ছিলেন না। বস্তুত মাউন্টব্যাটেনের মনে হয়েছে যে, পাকিস্তানের পক্ষে জিন্নাহ গ্রহণযোগ্য একটি যুক্তিও উপস্থিত করতে সক্ষম হননি। এক পর্যায়ে জিন্নাহ নাকি মাউন্টব্যাটেনকে এমনও বলেছেন যে, মাউন্টব্যাটেন যদি তার নির্দয় যুক্তি নিয়ে তাড়া করতে থাকেন তবে কোনো সমাধানেই পৌঁছানো সম্ভব হবে না। কংগ্রেস কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করলে গান্ধী বড়লাটকে পূর্বাহ্নে তা জানিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন; ওদিকে জিন্নাহকে দেখি তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে-সিদ্ধান্ত, লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন, সেটি নেয়ার আগে বড়লাট লিনলিথগোর সঙ্গে রীতিমতো সলাপরামর্শ করছেন, তবে কোনো দার্শনিক বিবেচনায় নয়, সরকারকে নিজের পক্ষে রাখার অভিপ্রায়ে। ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, অসুস্থতা সত্ত্বেও ১৩ তারিখে জিন্নাহ দিল্লিতে গিয়ে বড়লাট লিনলিথগোর সঙ্গে দেখা করেন এবং বলেন যে, লীগের সম্মতি না নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে না এই মর্মে প্রতিশ্রæতি দিলে ব্রিটিশের যুদ্ধকালীন কাজে মুসলিমদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হবে না। শুনে বড়লাট বেশ খুশি হয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে, জিন্নাহর প্রস্তাব তিনি ভারতসচিবের দপ্তরে পৌঁছে দেবেন। কয়েক দিন পরে লিনলিথগো চিঠি লিখে জিন্নাহকে আশ্বস্ত করেছেন যে, সরকার মুসলিম প্রদেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুসুলভ ও সহানুভূতিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। এতসব সৌহার্দ্যপূর্ণ আদানপ্রদানের ভেতরও কিন্তু একটা সন্দেহ বড়লাটের মনে চকিতে হলেও দেখা দিয়েছে যে, জিন্নাহর অনমনীয়তার পেছনে হয়তোবা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাসনা কার্যকর রয়েছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে জিন্নাহ ও গান্ধী পরস্পরকে ‘বড়’ হতে সাহায্য করেছেন। তবে এটাও সত্য যে, জিন্নাহর বৃদ্ধিতে গান্ধীর যে অবদান সে-তুলনায় গান্ধীর বৃদ্ধিতে জিন্নাহর ভূমিকা অল্প। জিন্নাহ অত্যন্ত বড় মাপের আইনজীবী ছিলেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেন তার বিশেষ দক্ষতা আইনের ব্যাখ্যা দানে ছিল না, ছিল ওকালতিতে, যে-কাজে তাকে সর্বদা লড়তে ও জব্দ করতে হতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে। গান্ধীকে তিনি প্রতিপক্ষ মনে করতেন, তার পক্ষে আরেকজন জওহরলাল নেহরু হওয়া সম্ভব ছিল না, যে নেহেরুকে তিনি বৃদ্ধিলাভে অপারগ বালক বলে অভিহিত করে গেছেন। বিলেতে থেকে জিন্নাহ যে দেশে ফিরে এলেন সেটা অনেকটা এই ভরসাতে যে কংগ্রেসের বিকল্প একটি মঞ্চ গড়ে তোলা তার পক্ষে সম্ভব হবে। তবু গান্ধীকে তিনি ভোলেননি, লাহোর প্রস্তাব পাস করানোর পর থেকে গান্ধীকে আক্রমণ করার কোনো সুযোগই জিন্নাহ হাতছাড়া করতেন না এবং গান্ধীকে সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায়ের পরিবর্তে বর্ণহিন্দুদের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করতে তার আগ্রহও দেখা গেছে। যুদ্ধের সময় কংগ্রেস-বিরোধিতার দরুন সরকারের দৃষ্টিতে জিন্নাহর মূল্য বৃদ্ধি পায়। তিনি নিজেই বলেছেন, দেখলাম আমার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। ‘ও ধিং ঃৎবধঃবফ ড়হ ঃযব ংধসব নধংরং ধং গৎ এধহফযর. ও ধিং ড়িহফবৎংঃৎঁপশ যিু ধষষ ড়ভ ধ ংঁফফবহ ও ধিং ঢ়ৎড়সড়ঃবফ ধহফ মরাবহ ধ ঢ়ষধপব ংরফব নু ংরফব রিঃয গৎ এধহফযর.’ এই উন্নতিতে তিনি যে অসন্তুষ্ট হননি তাতো বোঝাই যাচ্ছে। আর ওই যে বলছেন হঠাৎ করে কেন এমনটা ঘটল তা তিনি বোঝেননি, এই বক্তব্য মান্য করা কঠিন; কারণটা যে ব্রিটিশের সঙ্গে তার সহযোগিতা সেটা তো খুবই পরিষ্কার, তার মতো প্রখর বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে ব্যাপারটির কার্য-কারণ না-বোঝার কোনো কারণই ছিল না। কিন্তু সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ যা সেটা হলো গান্ধীর পাশাপাশি তাকে স্থান দেয়া হয়েছে এই আত্মসন্তুষ্ট উপলব্ধি। গান্ধীকে যতটা খাটো করা যাবে তিনি নিজে ততটা বড় হবেন এই দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও গান্ধীর সমান সমান হতে পারাটা তার জন্য কম পাওয়া ছিল না। গান্ধীর সঙ্গে জিন্নাহর যে মিল ছিল না তা নয়; বিশেষ মিল ছিল এখানে যে, দুজনই ছিলেন পুঁজিবাদের সমর্থক; জিন্নাহ একেবারেই প্রকাশ্যে, গান্ধী প্রচ্ছন্নভাবে। ব্রিটিশের সঙ্গে দুজনেরই এক ধরনের সম্পর্ক তো ছিলই, চিন্তাভাবনায় ইংরেজদের দ্বারা তারা উভয়েই প্রভাবিত হয়েছেন; জিন্নাহ অনেক বেশি, গান্ধীও যে খুব কম তা নয়। নেতা হিসেবে তারা দুজনেই ছিলেন একচ্ছত্র, সিদ্ধান্ত এককভাবেই নিতেন এবং দলের ভেতরে ভিন্নতর অবস্থানকারীদের অসহ্য বলে বিবেচনা করতেন। এটাও বলা অসঙ্গত হবে না যে, এরা কেউই জানতেন না যে দেশকে তারা কোন বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। (চলবে) সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App